
চঞ্চল,
লালমনিরহাট জেলার জন্য এক মহাকাব্যিক বিজয়ের দিন ৬ ডিসেম্বর। মুক্তিকামী মানুষের প্রাণপণ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অদম্য বীরত্বের মধ্য দিয়ে অর্জিত মুক্তির এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলমুক্ত হয়েছিল উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ জেলা। আকাশপানে উত্তোলিত হয় বিজয়ের লাল-সবুজের পতাকা।
হাসর উদ্দিন স্কুলে হেডকোয়ার্টার: ৬ নং সেক্টরের স্বতন্ত্র ইতিহাস
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র দেশে সংগঠিত ১১টি সেক্টরের মধ্যে ৬ নং সেক্টরের স্থান ছিল অনন্য। এই সেক্টরের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়েছিল লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার হাসরউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম শফিকুল ইসলাম কানু (গেরিলা লিডার ’৭১) স্মরণ করেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধে লালমনিরহাট বিশেষ করে ৬ নম্বর সেক্টর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে। এটিই একমাত্র সেক্টর ছিল যেটি সম্পূর্ণ মুক্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়।” এটি ছিল শুধু একটি দপ্তর নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ সমর পরিকল্পনা ও অভিযানের মূল কেন্দ্র।
রক্তস্নাত প্রতিরোধ: শহীদদের আত্মাহুতি
মুক্তির এই পথ ছিল রক্তে ভেজা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নিরীহ বাঙালির ওপর চালিয়েছে পৈশাচিক গণহত্যা।
• প্রথম প্রতিরোধ ও শাহাদাত: ২৭ মার্চ মুক্তিকামী জনতার মিছিলে গুলিতে শহীদ হন শাহজাহান, যিনি লালমনিরহাটের প্রথম শহীদ হিসেবে পরিচিত। এরপর ১ এপ্রিল লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিতে বাঙালিরা ওসি মীর মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
• চিকিৎসকসহ গণহত্যা: এই প্রতিরোধের জের ধরে ৪ ও ৫ এপ্রিল হানাদার বাহিনী শহরে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালায়। ৪ এপ্রিল রেলওয়ে হাসপাতালে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ওসি মীর মোশাররফসহ চারজন বিশিষ্ট চিকিৎসককে—ডা. এ. রহমান, ডা. এ. মোকতাদির, ডা. এম. রাহমান ও ডা. এ.জি. আহমেদ।
• গণকবর: ৫ ও ৬ এপ্রিল শত শত রেলকর্মী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করে তাদের লাশ পুঁতে রাখা হয় ওয়্যারলেস কলোনিতে অবস্থিত রেলওয়ে গণকবরের পাশে।
চূড়ান্ত পতন ও তিস্তা সেতুতে নাশকতার ঘটনা
৬ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড অভিযান এবং মিত্রবাহিনীর ত্রিমুখী আক্রমণে হানাদার বাহিনীর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গেরিলা লিডার কানু জানান, “মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরেরা রংপুর ও অন্যান্য স্থানে পালিয়ে যায়।” অবশেষে, ৫ ডিসেম্বর ভোর ৫টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজয় মেনে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালানো শুরু করে। পলায়নের সময় তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে তিস্তা রেল সেতুর একাংশ উড়িয়ে দেয়/ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দীর্ঘ সংগ্রাম আর বহু প্রাণের আত্মত্যাগের পর অবশেষে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল—এই দিনে লালমনিরহাট সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয়।
স্বাধীনতার লক্ষ্য আজও অধরা: আক্ষেপ বীর মুক্তিযোদ্ধার
বিজয় অর্জনের পরেও স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম শফিকুল ইসলাম কানু বলেন, “যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই রক্তস্নাত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে আজও সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। উদ্দেশ্য ছিল সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু কোনোটাতেই আমরা অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে পারিনি।”
এই মুক্ত দিবসটি লালমনিরহাটবাসীর জন্য চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে রবে।
























