
তৌহিদ বেলাল, কক্সবাজার:
‘আতঙ্কের অনুষঙ্গ’ হয়ে উঠছে ভ্রমণপিয়াসীদের অতি প্রিয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের উত্তাল ঢেউ। নীল জলরাশির উপচে পড়া ঢেউ দেখে উচ্ছ্বাসে নিয়ম ভেঙে যেখানে-সেখানে গোসল করতে গিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অবকাঠামোগত যথেষ্ট উন্নয়ন হলেও নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা নেই। এতে দারুণ হতাশ দেশবিদেশ পর্যটকরা।
গেল কুরবানির ঈদে বেড়াতে এসে পিতা-পুত্রসহ ছয়জনের মৃত্যুর মাস না পেরোতেই মঙ্গলবার (৮ জুলাই) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন হিমছড়ি সৈকতে গোসলে নেমে স্রোতে ভেসে যান। তাৎক্ষণিক একজন এবং পরদিন বুধবার সকালে আরেকজনের মরদেহ উদ্ধার হয়। অন্যজনের হদিস মেলেনি আজও।
১২০ কিলোমিটারের পৃথিবী বিখ্যাত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঢেউয়ে একাধিক স্থানে ভাঙন ও গুপ্তখালের সৃষ্টি হওয়ায় পানিতে নামার আগে বিপদ টের পাচ্ছেন না পর্যটকেরা। আর বিপদাপন্ন হলে উদ্ধারের আয়োজনও অপ্রতুল। ফলে নোনাজলের ছোঁয়া নিতে যাওয়া পর্যটকদের মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে পর্যটক মারা গেলে সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। মরদেহ পৌঁছাতেও টাকা খরচ হয় পর্যটকের। অথচ সৈকতের কিটকট চেয়ার, বিচ বাইক, ঘোড়া, দোকানপাটসহ নানা ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বাধীন বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি প্রতি অর্থবছরে মোটা অঙ্কের টাকা পেয়ে থাকে।
কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত দৈনিক দৈনন্দিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গেল কুরবানির ঈদ মৌসুমে কক্সবাজারে কয়েক লাখ পর্যটক বেড়াতে আসেন। ভ্রমণে আসা পর্যটকদের মধ্যে ৮০-৯০ শতাংশ পর্যটক সাগরের জলে গোসলে নামেন। কিন্তু গত তিন দশকেও সমুদ্রের নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। পর্যটন খাত থেকে হোটেল-মোটেল মালিক এবং সরকার বিপুল আয় করলেও নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সবাই উদাসীন’।
বিচ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত মাত্র ৫ কিলোমিটারে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য বেসরকারি সি-সেইফ লাইফগার্ড নামে একটি সংস্থার ২৬ জন কর্মী রয়েছে। বাকি ১১৫ কিলোমিটার সৈকত অরক্ষিতই বলা যায়। বিশেষ করে ইনানী, হিমছড়ি, দরিয়ানগর, টেকনাফ, বাহারছড়া, পাটুয়ারটেক পয়েন্টে কেউ গোসলে নেমে নিখোঁজ হলে উদ্ধার তৎপরতা চালানো তৎক্ষণাৎ সম্ভব হয়ে ওঠে না।
ট্যুরিস্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজারের হিমছড়ি সমুদ্র সৈকতে পানিতে নেমে নিখোঁজ হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের তিন শিক্ষার্থী কেএম সাদমান রহমান শাবাব, অরিত্র হাসান ও আসিফ আহমদ। এদের মাঝে নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর শাবাবের মরদেহ উদ্ধার হয়। নিখোঁজ ছিলেন বাকি দু’জন। পরদিন বুধবার সকালে আসিফের মরদেহ ভেসে ওঠে শহরের অদূরে, সমিতিপাড়া সংলগ্ন সৈকতে। এখনো নিখোঁজ অরিত্র হাসান। তাদের সঙ্গে থাকলেও পানিতে না নামায় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যান তাদের দুই সহপাঠী ফারহান ও রিয়াদ। শাবাবের মরদেহ মঙ্গলবার রাতেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার বাড়ি ঢাকার মিরপুরে। আসিফ ও অরিত্র দুজনেরই বাড়ি বগুড়ায়।
নিহতদের সহপাঠী ফারহান জানান, সেদিন শুরুতে তাদের কারোরই সৈকতে গোসলে নামার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু শাবাব নেমে পড়লে তার দেখাদেখি আসিফ, অরিত্রও নেমে যান। শুরুতে ঢেউ বেশি ছিলোনা, কিন্তু হঠাৎ বড় ঢেউ আসতে শুরু করলে তারা উঠে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু পারেন নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী প্রক্টর সাঈদ বিন কামাল চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘মঙ্গলবার শাবাবের মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছে। বুধবার সকালে আসিফের মরদেহ ভেসে এসেছে। তার মরদেহও সন্ধ্যার পরিবারকে হস্তান্তর করা হয়, কিন্তু অরিত্রকে এর পরদিনও খোঁজে পাওয়া যায়নি।
সি-সেইফ লাইফগার্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মী মুহাম্মদ ওসমান বলেন, ‘টানাবর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টের বালিয়াড়িতে নদীর মতো বিভাজন ও গুপ্তখালের সৃষ্টি হয়। এসব এলাকায় গোসলে নামতে নিষেধ করা থাকে, পাশাপাশি মাইকিংও করা হয়। কিন্তু আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বিধিনিষেধ মেনে চলেন না অনেকে। একসঙ্গে হাজার হাজার পর্যটককে সামাল দিতে ২০-২৫ জন লাইফগার্ড সদস্য, ১৫-২০ জন বিচকর্মী ও অর্ধশতাধিক টুরিস্ট পুলিশের দারুণ হিমশিম খেতে হয়।
সি-সেইফ প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, স্রোতের টানে ভেসে গত বছর আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে মারা গেছেন ৫ পর্যটক। এর আগের ৬ বছরে ভেসে গিয়ে মারা গেছেন ৪৯ পর্যটক। গেল কুরবানির ঈদে কলাতলী সৈকতে গোসলে নেমে রাজশাহীর শাহিনুর রহমান (৫৮) ও সিফাত রহমান (২০) নামের পর্যটক পিতা-পুত্রের মৃত্যু হয়। তারাসহ এ সময় সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ৬ জনের মৃত্যু হয়। এদের মাঝে তিনজন পর্যটক ও একজন কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা। অপর দু’জনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সংগঠন ‘সেভ কক্সবাজার’র পরিচালক আসমাউল হোসনা সামিয়া বলেন, ‘সৈকতের তীরে এলে সমুদ্রের ঢেউ পর্যটককে আকর্ষিত করে। নানান বয়সী পর্যটকরা নোনাজলের সান্নিধ্য নেয়। সাগরতীর ঘিরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে পর্যটন জোনে। কিন্তু কয়েক লাখ টাকা খরচ করে সমুদ্রের পানিতে সি-নেটিং সিস্টেম গড়ে তুলে পর্যটকের নিরাপদ গোসলের ব্যবস্থায় কেউ আগ্রহী বলে মনে হয় না’।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের প্রধান, অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ায় সাগর বেশ উত্তাল। বড় ঢেউয়ে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে বেলাভূমি গুপ্তখালে রূপ নেয় বলে জেনেছি। এসব এলাকায় না নামতে সতর্কতামূলক লাল নিশানা ওড়ানো থাকে। কিন্তু নির্দেশনা অমান্য করে বা না বুঝে এসব এলাকায় গোসলে নামলে পর্যটকরা স্রোতের টানে পড়ে বিপদাপন্ন হন। ফলে আনন্দ ভ্রমণটা অনেক পর্যটকের পরিবারে বিষাদে রূপ নিচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

























