
আরিফ আহমেদ,
শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন বরিশাল বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা। বাদ যায়নি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে এই তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছে আগামী বরিশাল সিটি করপোরেশন (বসিক) নির্বাচন এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী জনসংযোগ। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো নির্বাচনের কোনো তফসিল ঘোষণা করা হয়নি, তবুও নগরজুড়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে নির্বাচনী প্রস্তুতির ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রশাসক নির্ভর নগর পরিচালনায় নাগরিক ভোগান্তি এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালনার দাবি ঘিরে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে বরিশালেও মেয়র পদে প্রার্থী বাছাই ও জনসংযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। এই তৎপরতায় বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সংখ্যা অন্তত ১১ বলে সাম্প্রতিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের মেয়র পদে নিজেদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। বাসদের পক্ষ থেকেও ডা. মনীষা চক্রবর্তীর নামও চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে, বিভিন্ন ব্যানার পোস্টার ও শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপির একাধিক নেতার তৎপরতা চোখে পড়েছে। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়দুল হক চান ও আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহকে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে দেখা গেছে। বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সেন্টুর নামেও ব্যানার-পোস্টার দেখা গেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনও বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সেখানে অনুদানও দিয়েছেন।
সাধারণ মানুষের অনেকে এসব কর্মকাণ্ডকে সম্ভাব্য সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকে সরাসরি নির্বাচনী প্রচার হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। কেননা দলীয় নির্দেশনা মেনে ধর্মীয় উৎসবে নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্যও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তৎপরতা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৬ মার্চ বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক সংস্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ও ফুটপাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আসেন তনি। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বহুল আলোচিত হচ্ছে শিরীনের নাম।
তবে নগর পরিচালনায় সব উদ্যোগ নিয়েই যে সন্তুষ্টি রয়েছে, তা নয়। হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ অংশের অসন্তোষ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বসিক ভবনের পেছনে হকারদের জন্য দোকান তৈরি করা হলেও সেখানে হকারদের বসতে দেখা যায়নি; জায়গাটি মোটরসাইকেল রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেডিসি সড়কে দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবাই সুযোগ পেয়েছেন কি না, তা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। দোকানের জামানত ও মাসিক ভাড়া নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন কয়েকজন হকার। অন্যদিকে বগুড়া রোডে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ এবং কাঞ্চন পার্ক ঘিরেও আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। বিএনপি নেত্রী আফরোজা খানম নাসরীন এসব উদ্যোগের পরিমাপ ও পরামর্শদাতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে নগর উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও পুনর্বাসনের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
শিরীনের পাশাপাশি বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সংসদ সদস্য এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সেন্টু, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ ও এবায়দুল হক চান, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীনসহ আরও কয়েকজন। কারও কারও পক্ষে ব্যানার-পোস্টার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও দেখা যাচ্ছে।
মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তৎপরতার পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপিতে সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কিছু স্থানীয় নেতার মধ্যে প্রয়োজনে একজন পুরুষ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার সুপারিশ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ছবি প্রকাশ ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ঘটনাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিএনপির মহানগর আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক বলেন, “সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আমিও মনোনয়ন প্রত্যাশী। তবে এ সিদ্ধান্ত আমি-আপনি নিলেই হবে না। দলীয় কার্যনির্বাহী কমিটি এবং দলীয় প্রধান রয়েছেন। তাদের সিদ্ধান্ত যা হবে, তা মেনে নিয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষাই আমাদের কাজ হওয়া উচিত।”
দলীয় নেতা ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রচারণা না চালানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তার বক্তব্য, কেন্দ্র থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সবাইকে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। এর আগে কাউকে প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচারণা দলের জন্য ভালো নয় বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেছেন, এখনই নির্বাচন নিয়ে ভাবছেন না; দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেওয়া দায়িত্ব যথাসাধ্য পালন করতে চান। নির্বাচনের ঘোষণা এলে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করবেন।
বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দলের চেয়ারম্যান যা ভালো মনে করবেন, তা মেনে নেবো।” দল থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হলে চেয়ারম্যানের নির্দেশ পালন করবেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী মেয়র পদে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলালকে সামনে রেখে গণসংযোগ চালাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণাও চালাচ্ছেন তিনি। সোস্যাল মিডিয়ায় তার স্পষ্ট প্রমাণও রয়েছে। এনসিপি এম. আনোয়ার সিকদারকে বরিশালে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আইনজীবী শেখ আবদুল্লাহ নাসিরের নাম সামনে এনেছে। দলটির নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম নিজে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না বলে জানিয়েছেন। বাসদের ডা. মনীষা চক্রবর্তীর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তফসিল না এলেও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি ও জনসংযোগ বাড়ছে। বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিযোগিতা, জামায়াতের প্রার্থীকে ঘিরে গণসংযোগ এবং অন্য দলগুলোর প্রার্থী ঘোষণা সেই তৎপরতাকে দৃশ্যমান করেছে। তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, নির্বাচনী প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, হকার পুনর্বাসন, সড়ক উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার মতো বাস্তব সমস্যাগুলোও প্রার্থীদের অগ্রাধিকারে থাকবে।

























