
তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল,
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় এক পাথরবাহী ট্রাকচালককে প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম এবং রুপি ছিনতাইয়ের বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলায় তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে একই সাথে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২ এর বিচারক এস. এম. শফিকুল ইসলাম দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা শেষে জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—পাটগ্রাম উপজেলার উফারমারা সোনারভিটা এলাকার মো. শফিকুল ইসলামের ছেলে মোঃ সবুজ মিয়া (পলাতক), একই উপজেলার হাদীসপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলী ওরফে বুলুর ছেলে মোঃ রমজান আলী এবং ভাটিয়াবাড়ি এলাকার শামছুল হক ওরফে সামছুর রহমানের ছেলে মোঃ আরিফুল ইসলাম ওরফে তানজিদ।
দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রধান আসামি সবুজ মিয়া মামলার সূচনালগ্ন থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন।
মামলার এজাহার ও ইতিহাসের বিবরণ সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২১ আগস্ট দুপুরে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর হয়ে পাথর বহনকারী একটি ভারতীয় ট্রাক বুড়িমারী সড়কে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ে। ওই দিন গভীর রাতে (রাত আনুমানিক ১টার দিকে) আসামিরা পরিকল্পিতভাবে পে-লোডার বা ক্রেন এনে ট্রাকটি উদ্ধার করে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। তাদের মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করে ভারতীয় ট্রাকচালক লক্ষ্মীনন্দর সিং (৩৭) একটি মোটরসাইকেলে ওঠেন। আসামিরা তাকে কোনো গ্যারেজে না নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাতের আঁধারে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়।
পরদিন ২২ আগস্ট রাত ৩টার দিকে পাটগ্রামের শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর ভোটবাড়ী এলাকার একটি নির্জন পয়েন্টে নিয়ে চালক লক্ষ্মীনন্দর সিংকে ধারালো চাকু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত ভাবার পর তার কাছে থাকা ৮ হাজার ভারতীয় রুপি ছিনিয়ে নিয়ে রক্তঝরা অবস্থায় তাকে রাস্তার পাশে ফেলে আসামিরা চম্পট দেয়।
পরবর্তীতে বিজিবি, টহল পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে দেশের ভাবমূর্তি ও একজন আন্তর্জাতিক নাগরিকের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ মো. মতিয়ার রহমান বাদী হয়ে পাটগ্রাম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত দণ্ডবিধির ৩৬৫ (অপহরণ) ধারায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩৯৪ (দস্যুতা ও মারাত্মক আঘাত) ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, আসামিদের উভয় সাজা একই সাথে কার্যকর হবে।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট সামসুল আলম মিলন বলেন, “বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ যে রায় দিয়েছেন, তাতে আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। একজন বিদেশি নাগরিককে অপহরণ ও বর্বরোচিত আক্রমণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার এই রায় সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

























