
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা পশ্চিম বিভাগের বিশেষ অভিযানে ৮ কেজি হেরোইন, ১৪ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি যাত্রীবাহী বাস জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকারও বেশি বলে জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জব্দকৃত মাদক কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সম্মানিত পুলিশ কমিশনারের দিকনির্দেশনায় মহানগর গোয়েন্দা পশ্চিম বিভাগের একটি চৌকস টিম বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ২টা ৫৫ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে, কক্সবাজার থেকে একটি হানিফ পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য বহন করে চট্টগ্রামের দিকে আনা হচ্ছে। সংবাদের গুরুত্ব বিবেচনায় গোয়েন্দা দল দ্রুত কর্ণফুলী থানাধীন পটিয়া ক্রসিং এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পের সামনে অবস্থান নেয় এবং সন্দেহভাজন বাসটির গতিবিধি নজরদারিতে রাখে।
এক পর্যায়ে বর্ণিত বাসটি সেখানে পৌঁছালে আভিযানিক টিম সেটিকে থামার সংকেত দেয়। কিন্তু বাসটি থামানোর পরিবর্তে দ্রুতগতিতে শহরের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে গোয়েন্দা দল ধাওয়া দিয়ে বাসটি আটক করতে সক্ষম হয়। এ সময় বাসে থাকা ড্রাইভার, সুপারভাইজার ও হেলপারকে আটক করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটকের পর থামার সংকেত অমান্য করে পালানোর কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, গাড়িতে অবৈধ মাদকদ্রব্য থাকায় তারা বাসটি না থামিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
পরবর্তীতে উপস্থিত যাত্রীদের সামনে বাসটি তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশিকালে বাসের পেছনের অংশে বডির নিচে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেফতার ১ নম্বর আসামি মো. আলী হোসাইন প্রকাশ আলী হোসেন, ৪২, ২ নম্বর আসামি মো. আজিম, ৪০, এবং ৩ নম্বর আসামি মুহাম্মদ রাশেল, ৪৯, তাদের দেখানো মতে এবং নিজ হাতে বের করে দেওয়া মতে মাদকগুলো উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে হলুদ রঙের কসটেপে মোড়ানো ৮টি প্যাকেট, যার প্রতিটি প্যাকেটে ১ কেজি করে মোট ৮ কেজি হেরোইন। জব্দ হওয়া এই হেরোইনের আনুমানিক মূল্য ৮ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া হলুদ কসটেপে মোড়ানো ৭০টি নীল রঙের জিপার প্যাকেটের ভেতরে প্রতিটিতে ২০০ পিস করে মোট ১৪ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। জব্দ হওয়া ইয়াবার মোট ওজন ১ কেজি ৪০০ গ্রাম এবং এর আনুমানিক মূল্য ৩৫ লাখ টাকা। একই সঙ্গে মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হানিফ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসও জব্দ করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে, কক্সবাজারে অজ্ঞাতনামা ২ থেকে ৩ জন ব্যক্তির কাছ থেকে তারা এসব হেরোইন ও ইয়াবা সংগ্রহ করে। পরে অত্যন্ত গোপন কৌশলে সেগুলো বাসের বডির ভেতরে লুকিয়ে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় অজ্ঞাতনামা আরও ২ জন ব্যক্তির কাছে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পুলিশের দাবি, গ্রেফতাররা পেশাদার মাদক কারবারি এবং এর পেছনে একটি বড় নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। সীমান্তঘেঁষা এলাকা, উপকূলীয় রুট, মহাসড়ক এবং পরিবহন খাত ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো বিভিন্ন কৌশলে মাদক দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরিয়ে নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একের পর এক অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধার ও কারবারিদের গ্রেফতার করলেও চক্রগুলো নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী যানবাহন, কুরিয়ার ব্যবস্থা এবং গোপন চেম্বার ব্যবহার করে মাদক পরিবহনের প্রবণতা উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট। মাদকের বিস্তারের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে যুবসমাজের ওপর। একটি বড় অংশের তরুণ ধীরে ধীরে মাদকের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে, নষ্ট হচ্ছে তাদের শিক্ষা, নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষমতা, ধ্বংস হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে ভবিষ্যৎ। পরিবারগুলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। একসময় যে তরুণদের ঘিরে পরিবারের স্বপ্ন থাকে, মাদকের কারণে তাদের অনেকে অপরাধ, সহিংসতা, চুরি, ছিনতাই এবং নানা অবক্ষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধুই আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক প্রতিরোধও জোরদার করার দাবি উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকদ্রব্যের অবৈধ বাণিজ্য এখন শুধু কিছু ব্যক্তির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন এলাকা থেকে সংগ্রহ, পরিবহন, মজুদ, খুচরা সরবরাহ এবং বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে একাধিক স্তরের লোকজন। ফলে মাদকের একটি চালান ধরা পড়লেও পেছনের বড় নেটওয়ার্ক অনেক সময় অধরাই থেকে যায়।
এই কারণে কেবল মাঠপর্যায়ের বাহক বা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করলেই হবে না, বরং কারা অর্থায়ন করছে, কারা রুট ঠিক করছে, কারা গন্তব্যে গ্রহণ করছে এবং কারা খুচরা বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেই পুরো চক্র উদঘাটনে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই বন্দরনগরী, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং মহাসড়ক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ হাব হওয়ায় মাদক চক্রের জন্য এটি একটি কৌশলগত রুট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকা রুটকে ঘিরে বারবার মাদক উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করছে, এই রুটে নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে গভীর রাত ও ভোরের সময় যাত্রীবাহী পরিবহনকে ব্যবহার করে মাদক পরিবহনের প্রবণতা থাকায় পরিবহন খাতে প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং চেকপোস্ট ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার তাগিদ দিয়েছেন সচেতন মহল।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারদের মধ্যে মো. আলী হোসাইন প্রকাশ আলী হোসেনের বিরুদ্ধে ঢাকার হাতিরঝিল থানায় ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখের একটি মাদক মামলা রয়েছে। ওই মামলাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় দায়ের করা হয়েছিল। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, গ্রেফতার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে তাদের অপরাধ নেটওয়ার্ক, পূর্বের কার্যক্রম এবং সহযোগীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এদিকে সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও কঠোর, ধারাবাহিক ও ফলপ্রসূ করতে হলে শুধু অভিযান নয়, সমাজজুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, কর্মসংস্থান এবং মানসিক সহায়তার সুযোগ বাড়াতে না পারলে মাদকচক্র তাদের টার্গেট করতেই থাকবে। একই সঙ্গে সীমান্ত, মহাসড়ক, পরিবহন এবং নগরভিত্তিক সরবরাহ চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা অভিযান আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
সিএমপি ডিবি পশ্চিমের এই অভিযানকে সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন। কারণ এত বড় পরিমাণ হেরোইন ও ইয়াবা উদ্ধার হওয়া প্রমাণ করে, চক্রটি বড় ধরনের চালান সরবরাহের প্রস্তুতিতে ছিল। সময়মতো অভিযান না হলে এসব মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারত। আর তার ভয়াবহ প্রভাব পড়ত তরুণ সমাজ, পরিবার এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতনামা অন্যদের শনাক্তে অভিযান ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

























