Dhaka , Thursday, 5 November 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগে ফায়সালের ভুয়া এনআইডি-পাসপোর্ট, রাঙ্গুনিয়ায় আটক মাদক সেবনের দায়ে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আলী আহম্মেদকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও বহিষ্কার কুড়িগ্রামে ১১৭০ ইয়াবাসহ তিনজন গ্রেপ্তার, একজনের বিরুদ্ধে ২০টি মাদক মামলা ‘এই পৃথিবীর জন্য বড্ড নরম মনের মানুষ আমি’: মেঘনা আলম পাইকগাছায় নাশকতা, জুয়াসহ বিভিন্ন মামলায় আটক- ১৪ বি‌লে‌তের মা‌টি‌তে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘চট্টগ্রাম উৎসব ২০২৬’ ও গুণীজন সম্মাননা ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষককে বিদায় সংবর্ধনা:: সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত, পুলিশের গাড়িতে আগুন, ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সিলেট টেস্টে ব্যাটিং অর্ডারে রদবদলের ইঙ্গিত, তিনে নামতে পারেন অধিনায়ক ১৯ বছরেই এমবাপ্পেকে টপকে ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল অস্ত্রের মুখে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ‘মিথ্যা’: সংবাদ সম্মেলনে সেলিম উদ্দিন খাগড়াছড়িতে ৫৫তম পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত, ‘গিরিস্বপ্ন ২০২৬’-এর মোড়ক উন্মোচন রূপগঞ্জ পূর্বাচলের ৩০০ ফুটে প্রবাসীর গাড়িতে ডাকাতি \ চালকসহ তিন জন গ্রেফতার সীতাকুণ্ডে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণে সচিবকে ডিসির চিঠি, ২৪ ঘণ্টায় নানা পদক্ষেপ আসামে উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহীন ৪ হাজার বাঙালি মুসলিম ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের আহ্বান জিএম কাদেরের জয়পুরহাটে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি পাইকগাছা পৌরসভায় পরিচ্ছন্নতা ক্যাম্পেইন, নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার আহ্বান একনেক সভায় বিসিসির জন্য ৭০১ কোটি টাকা অনুমোদন : অবহেলিত থেকে গেল দক্ষিণাঞ্চল মধুপুরে সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদনের দাবিতে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানববন্ধন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১২০ কোটি টাকার সম্ভাব্য অনুদান দিচ্ছে জাইকা, চট্টগ্রামে নির্মিত হবে নতুন স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সাভারে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, আহত ৫০ ফতুল্লায় পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, পুলিশের টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ নারায়ণগঞ্জে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক সমাবেশ কালিয়াকৈরে শ্রমিকের আন্দোলন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ১৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন নেত্রকোনার পূর্বধলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত কাউখালীতে নবাগত জেলা প্রশাসকের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

দুই যুগের সন্ত্রাসী অভয়ারণ্যে ঢুকেছে যৌথ বাহিনী, আলীনগর কেন্দ্র করে অপরাধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 01:10:34 pm, Monday, 9 March 2026
  • 138 বার পড়া হয়েছে

ইসমাইল ইমন চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে শুরু হয়েছে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাঁড়াশি অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক কারবারি ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশাল যৌথ অভিযান চলছে।

সোমবার (৯ মার্চ) ফজরের নামাজের পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে যৌথ বাহিনী। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখে অভিযান পরিচালনা করছেন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন সদস্য, ৪০০ র‍্যাব সদস্য এবং ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। এছাড়া অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫টি সাঁজোয়া এপিসি যান, তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং তিনটি হেলিকপ্টার রিজার্ভ রাখা হয়েছে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় বিশেষ কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, প্রায় দুই যুগ ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এখানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ছিল। এই সুযোগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখানে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্র তৈরির কারখানা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, জুয়া ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এসব অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে আলীনগর ও ছিন্নমূল নামের কয়েকটি এলাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে জীবিকার সন্ধানে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন ইয়াসিন নামের এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই ফারুক। প্রথম দিকে ইয়াসিন চট্টগ্রাম শহরে সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন এবং নগরের একটি বস্তিতে বসবাস করতেন। পরে কিছুদিন একটি জুট মিলে চাকরিও করেন তিনি।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে ভাড়া নেন একটি ঘর। এরপর নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসী ও দাগী আসামিদের এনে সেখানে আশ্রয় দিতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে তার নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী।

পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী পাহাড় কেটে মাটি ও জমি বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে থাকেন ইয়াসিন ও তার ভাই ফারুক। পাহাড় কেটে একদিকে মাটি বিক্রি এবং অন্যদিকে দখল করা জায়গা বিক্রি করে অল্প সময়েই তারা কোটিপতি বনে যান।

এইভাবে বিশাল একটি এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা ওই জায়গার নাম দেন ‘আলীনগর’। স্থানীয়দের দাবি, কার্যত এটি হয়ে ওঠে একটি আলাদা রাজ্য, যেখানে দেশের প্রচলিত আইন কার্যকর ছিল না।

আলীনগরে প্রবেশের জন্য ছিল তিনটি নির্দিষ্ট পথ। এই তিনটি পথেই সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকত ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। তাদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারত না। একইভাবে ভেতরে থাকা কেউও অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারত না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে বসবাসকারীদের ওপর কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছিল। কেউ অতিথি নিয়ে এলে অতিথির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দিতে হতো নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
যারা স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করতেন, তাদের ইয়াসিনের স্বাক্ষর করা বিশেষ পাস দেওয়া হতো। সেই পাস দেখিয়ে তারা বাইরে যাতায়াত করতে পারতেন।
কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও কেউ থানায় অভিযোগ করতে পারতেন না। বরং ইয়াসিন ও ফারুকের কথিত আদালতেই বিচার হতো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে এক ধরনের অঘোষিত শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি সরকার জঙ্গল সলিমপুরের খাস জমিতে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তথ্যমন্ত্রী, কয়েকজন সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি মেয়রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেন।
এই পরিদর্শনের সময় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ জুলাই সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যকে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে মারধর করে ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা।

এই ঘটনার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। পরে এই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলে ১৮ জুলাই ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর জেলা প্রশাসন আলীনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি মাটি কাটার স্ক্যাভেটর, ছয়টি ড্রাম ট্রাক এবং একটি বড় ট্রাক জব্দ করে। এসব যন্ত্রপাতি পাহাড় কাটা ও অবৈধ মাটি বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় রোকন মেম্বার নামে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটেছে। তার নেতৃত্বে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এলাকার সচেতন মহলের মতে, ইয়াসিন ও রোকন মেম্বারের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটাই কমে আসবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, চট্টগ্রাম শহরে যেসব ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে, তার অনেক অপরাধীই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস করে। তারা মূলত গ্রেপ্তার এড়াতে এই দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। সম্প্রতি এই এলাকায় অভিযানে গিয়ে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে।

এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এবং সমন্বিত অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের তথ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ইউএভির মাধ্যমে প্রাপ্ত ফুটেজের ভিত্তিতে পুরো অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এই অভিযানের সার্বিক নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ করছে।

আজ ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে যৌথ বাহিনী সমন্বিতভাবে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান শুরু করে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় চারদিক থেকে এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অভিযানের সময় সাঁজোয়া যান, ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রয়োজনে সহায়তার জন্য।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ধ্বংস করা এবং এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করা।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযান চলমান রয়েছে এবং পুরো এলাকা কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগে ফায়সালের ভুয়া এনআইডি-পাসপোর্ট, রাঙ্গুনিয়ায় আটক

দুই যুগের সন্ত্রাসী অভয়ারণ্যে ঢুকেছে যৌথ বাহিনী, আলীনগর কেন্দ্র করে অপরাধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান

আপডেট সময় : 01:10:34 pm, Monday, 9 March 2026

ইসমাইল ইমন চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে শুরু হয়েছে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাঁড়াশি অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক কারবারি ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশাল যৌথ অভিযান চলছে।

সোমবার (৯ মার্চ) ফজরের নামাজের পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে যৌথ বাহিনী। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখে অভিযান পরিচালনা করছেন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন সদস্য, ৪০০ র‍্যাব সদস্য এবং ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। এছাড়া অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫টি সাঁজোয়া এপিসি যান, তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং তিনটি হেলিকপ্টার রিজার্ভ রাখা হয়েছে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় বিশেষ কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, প্রায় দুই যুগ ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এখানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ছিল। এই সুযোগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখানে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্র তৈরির কারখানা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, জুয়া ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এসব অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে আলীনগর ও ছিন্নমূল নামের কয়েকটি এলাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে জীবিকার সন্ধানে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন ইয়াসিন নামের এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই ফারুক। প্রথম দিকে ইয়াসিন চট্টগ্রাম শহরে সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন এবং নগরের একটি বস্তিতে বসবাস করতেন। পরে কিছুদিন একটি জুট মিলে চাকরিও করেন তিনি।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে ভাড়া নেন একটি ঘর। এরপর নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসী ও দাগী আসামিদের এনে সেখানে আশ্রয় দিতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে তার নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী।

পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী পাহাড় কেটে মাটি ও জমি বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে থাকেন ইয়াসিন ও তার ভাই ফারুক। পাহাড় কেটে একদিকে মাটি বিক্রি এবং অন্যদিকে দখল করা জায়গা বিক্রি করে অল্প সময়েই তারা কোটিপতি বনে যান।

এইভাবে বিশাল একটি এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা ওই জায়গার নাম দেন ‘আলীনগর’। স্থানীয়দের দাবি, কার্যত এটি হয়ে ওঠে একটি আলাদা রাজ্য, যেখানে দেশের প্রচলিত আইন কার্যকর ছিল না।

আলীনগরে প্রবেশের জন্য ছিল তিনটি নির্দিষ্ট পথ। এই তিনটি পথেই সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকত ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। তাদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারত না। একইভাবে ভেতরে থাকা কেউও অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারত না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে বসবাসকারীদের ওপর কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছিল। কেউ অতিথি নিয়ে এলে অতিথির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দিতে হতো নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
যারা স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করতেন, তাদের ইয়াসিনের স্বাক্ষর করা বিশেষ পাস দেওয়া হতো। সেই পাস দেখিয়ে তারা বাইরে যাতায়াত করতে পারতেন।
কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও কেউ থানায় অভিযোগ করতে পারতেন না। বরং ইয়াসিন ও ফারুকের কথিত আদালতেই বিচার হতো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে এক ধরনের অঘোষিত শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি সরকার জঙ্গল সলিমপুরের খাস জমিতে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তথ্যমন্ত্রী, কয়েকজন সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি মেয়রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেন।
এই পরিদর্শনের সময় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ জুলাই সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যকে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে মারধর করে ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা।

এই ঘটনার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। পরে এই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলে ১৮ জুলাই ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর জেলা প্রশাসন আলীনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি মাটি কাটার স্ক্যাভেটর, ছয়টি ড্রাম ট্রাক এবং একটি বড় ট্রাক জব্দ করে। এসব যন্ত্রপাতি পাহাড় কাটা ও অবৈধ মাটি বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় রোকন মেম্বার নামে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটেছে। তার নেতৃত্বে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এলাকার সচেতন মহলের মতে, ইয়াসিন ও রোকন মেম্বারের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটাই কমে আসবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, চট্টগ্রাম শহরে যেসব ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে, তার অনেক অপরাধীই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস করে। তারা মূলত গ্রেপ্তার এড়াতে এই দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। সম্প্রতি এই এলাকায় অভিযানে গিয়ে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে।

এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এবং সমন্বিত অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের তথ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ইউএভির মাধ্যমে প্রাপ্ত ফুটেজের ভিত্তিতে পুরো অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এই অভিযানের সার্বিক নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ করছে।

আজ ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে যৌথ বাহিনী সমন্বিতভাবে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান শুরু করে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় চারদিক থেকে এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অভিযানের সময় সাঁজোয়া যান, ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রয়োজনে সহায়তার জন্য।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ধ্বংস করা এবং এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করা।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযান চলমান রয়েছে এবং পুরো এলাকা কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।