
চঞ্চল,
“সুস্থ মানুষ, সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ দেশ গঠনের জন্য ক্রীড়ার কোনো বিকল্প নেই। একটি সমাজকে যদি আমরা ‘হেলদি’ করতে চাই, তবে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছাড়া এর কোনো বিকল্প নেই।”— এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় লালমনিরহাট জেলা শহরের মিশনমোড়ে অবস্থিত”হামার বাড়ি” কার্যালয়ে সাংস্কৃতিক কর্মী ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি লালমনিরহাটের উন্নয়নে খেলাধুলা ও সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমান সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
সামাজিক অস্থিরতা ও বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা-
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সমাজ গঠনে এই দুটি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সাংস্কৃতিক অঙ্গনটা যদি আমরা সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারি, তাহলে সমাজ গোমরা হয়ে যায়।” বর্তমান সময়ের সামাজিক অস্থিরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সুস্থ মানুষ কোনোদিন অস্থির হবে না, সুস্থ মানুষ কোনোদিন বিদ্বেষ ছড়াবে না, সুস্থ মানুষ কোনো সময় হিংসাপরায়ণ হবে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “আলোকিত লালমনিরহাট, শান্তির লালমনিরহাট যদি আমরা করতে চাই, শান্তির নীড় যদি করতে চাই, তাহলে আমাকে সবচেয়ে বেশি কাজ করতে হবে আপনাদেরকে নিয়ে।”
ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বর্তমান সংকট এবং মাদকের প্রভাব-
বিগত বছরগুলোতে এই খাতের অবহেলা নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “দুর্ভাগ্য আমাদের লালমনিরহাটে, বিগত ১৫-১৬ বছর সবচেয়ে অবহেলিত ছিল এই দুটি জগত।” বর্তমান সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, “এখন সমাজে যে অসঙ্গতি, অসামাজিক কার্যকলাপের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, এর পিছনেই সাংস্কৃতিক অঙ্গন, খেলাধুলাটা তেমনভাবে আমরা করতে পারছি না। যুবসমাজ আক্রান্ত হয়েছে মাদকে, ক্যাসিনোতে।” তিনি মনে করেন, “মানুষকে হাস্যোজ্জ্বল করতে হবে, আনন্দ দিতে হবে। যিনি বেশি হাসবেন, যিনি বেশি আনন্দের মধ্যে থাকবেন, তার স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে যায়।”
অবকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা-
লালমনিরহাটের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমলাতন্ত্রের ওপর যদি রাজনীতিবিদরা না থাকে, জনগণের প্রতিনিধি না থাকে, আমলাতন্ত্র শুধু ফাইল সই করে, খালি বিলম্ব করতেই চেষ্টা করে তারা। প্রায় ১৩ কোটি টাকা ফেরত চলে গেল।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও খেলোয়াড় তৈরির অঙ্গীকার-
খেলোয়াড়দের মান উন্নয়নে তাঁর বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ফুটবলে, ক্রিকেটে, ভলিবলে যে কোনো ব্যাডমিন্টনে ভালো ভালো জাতীয় পর্যায়ে যারা কোচ আছে, তাদেরকে এখানে নিয়ে মাসের পর মাস প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এভাবে খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে।” সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও স্বনির্ভর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা এখানে শিল্পী খেলোয়াড় তৈরি করবো, নিজেরাই বাইরে গিয়ে গান গাইবে, নিজেরাই বাইরে গিয়ে খেলবে। আমাদের শিল্পী হবে না কেন? আমাদের খেলোয়াড় তৈরি হবে না কেন?”
ঐতিহ্য ও কৃষ্টির সুরক্ষা-
হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুলু বলেন, “পহেলা বৈশাখে আমি ঘোড়দৌড়, খেলাধুলা যেগুলো খেলা হারিয়ে গেছে, হাড়িভাঙা থেকে শুরু করে সব খেলার আয়োজন করি।” বর্তমান প্রজন্মের আসক্তি নিয়ে তিনি বলেন, “গুড্ডি এখন চেনে না। এখন যার কারণে মোবাইলে আসক্ত হয়েছে আমাদের এই প্রজন্মের ছেলেরা। মোবাইল ভালো কিন্তু খারাপ দিকও তো আছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা ফাস্টফুডে আসক্ত হয়েছি, স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছি। আমাদের শিকড়কে আমরা হারিয়ে ফেলছি। নিজেকে নিজেই অপরিচিত করে তুলতেছি আমরা।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি-
বৃহত্তর রংপুরের উন্নয়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এই দুই কোটি মানুষের জীবন পরিবর্তন হয়ে যাবে, শুধু লালমনিরহাট না, বৃহত্তর রংপুরে।” আগামী নির্বাচনে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “ভোট প্রয়োগ করে আমার হাত শক্তিশালী হওয়া মানে লালমনিরহাট শক্তিশালী হওয়া। তারেক রহমান ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী হবে। উনি বলেছেন যে আগামী দিনে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা বাস্তবায়ন করবো।”
বক্তব্য শেষে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু উপস্থিত সাংস্কৃতিক কর্মী ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের অভাব-অভিযোগ এবং লালমনিরহাটের উন্নয়নে নানা সৃজনশীল প্রস্তাবনা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে শোনেন। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সুধীজন লালমনিরহাটের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য রক্ষায় একটি ‘কালচারাল ভিলেজ’ স্থাপন, নিয়মিত ‘ভাওয়াইয়া উৎসবের’ আয়োজন এবং স্থবির হয়ে পড়া শিল্পকলা একাডেমির মানোন্নয়নের জোরালো দাবি জানান।
পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় পুতুল নাচ ও যাত্রা শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, দুস্থ ও অসহায় শিল্পীদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করা এবং রোলার স্কেটিং-এর জন্য আধুনিক গ্রাউন্ড তৈরির প্রস্তাবনা সভায় উঠে আসে। ক্রীড়াঙ্গনের মান বাড়াতে ভালো মানের ক্রিকেট ও ফুটবল কোচের স্থায়ী ব্যবস্থার দাবিও জানান ক্রীড়া সংগঠকরা।
উপস্থিত সকলের এসব দাবির প্রেক্ষিতে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আমি ইতোমধ্যেই আপনাদের অনেক সমস্যার বিষয়ে অবগত আছি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেলে লালমনিরহাটের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এসব প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে আমি প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।” তিনি উপস্থিত সকলের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

























