
মো: আব্দুর রহিম, শরীয়তপুর প্রতিনিধি:
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুই হত্যাকাণ্ডে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে তীব্র আতঙ্ক। বিএনপি নেতা ও স্থানীয় মসজিদ কমিটির সদস্য খবির সরদার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি আলমাছ সরদারের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার হওয়ার পর ঘটনাটি আরও রহস্যে ঘেরা হয়ে উঠেছে। একপক্ষ বলছে আলমাছ ছিলেন খবির সরদারের খুনি, অন্যপক্ষ বলছে আলমাছকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে দায় চাপানো হয়েছে তার ওপর। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কে আসলে খুনি, আর কে বা কারা নেপথ্যের শক্তি?
গত মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) রাতে উপজেলার উমর উদ্দিন মাদবর কান্দি এলাকায় ছুরিকাঘাতে খুন হন বিএনপি নেতা ও মসজিদ কমিটির সদস্য খবির সরদার (৫৫)। এ ঘটনায় আলমাছ সরদারসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের হয়। মামলার পর থেকেই আলমাস পলাতক রয়েছে বলে জানায় নিহত বিএনপি নেতার স্বজনরা।
মামলার মাত্র দুই দিন পর, বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে একই ইউনিয়নের জব্বর মাস্টারের পরিত্যক্ত ভিটা থেকে আলমাছ সরদারের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশটি মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিলো। এই ঘটনা সামনে আসতেই জনমনে দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা। হত্যাকাণ্ডের দায়ী কে, তা নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।
মসজিদ কমিটির সভাপতি দানেস সরদারসহ কয়েকজন স্থানীয় বলেন, আলমাছ সরদার মসজিদের মাইকে আজান ও বয়ানে বিরক্ত হয়ে ইমামকে হুমকি দেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে মসজিদ কমিটির সদস্য খবির সরদারকে কুপিয়ে হত্যা করেন আলমাছ। তাদের দাবি, খবির সরদারের খুনের নেপথ্যে ছিলেন আলমাছ নিজেই।
অন্যদিকে আলমাছ সরদারের পরিবার পুরোপুরি ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। তাদের দাবি, আলমাছ খবির সরদারকে খুন করেননি, বরং তাকেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তারা বলেন, “ঘটনাস্থল দিয়ে যাওয়ার পথে আলমাছকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধাওয়া করে দানেস মাদবর, খবির সরদারসহ কয়েকজন। তখনই আলমাছকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেয় তারা। পরদিন সকালে লাশ ভেসে উঠলে সুযোগ বুঝে মাটিতে পুঁতে রাখে। আর খবির সরদার হত্যার দায় চাপায় আলমাছের ঘাড়ে।”
পরিবারের আরও দাবি, আলমাছ ইমামকে হুমকি দিয়েছিলো—এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
হংকং প্রবাসী আলমাছ সরদারের ভাই ইলিয়াস সরদার বলেন— “দানেস সরদারের নেতৃত্বে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমার ভাই আমাদের বাড়ির মেহমান এগিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলো। তখন দানেস সরদার, তার ছেলে ও বাহিনী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করে। খবির সরদারকেও দানেস সরদাররা খুন করেছে। এখন তারা ঘটনা ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতে আমার ভাইয়ের নামে দায় চাপাচ্ছে।”
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম বলেন, “খবির সরদার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি আলমাছ সরদারের বস্তাবন্দি লাশ জব্বর মাস্টারের পরিত্যক্ত ভিটা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাকেও হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “খবির সরদার হত্যাকাণ্ড এবং আলমাছ সরদারের মৃত্যু—দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।”
একই এলাকায় মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে খুন হন দুই ব্যক্তি—একজন বিএনপি নেতা ও মসজিদ কমিটির সদস্য খবির সরদার, আরেকজন ছিলেন সেই হত্যার মামলার অন্যতম আসামি আলমাছ সরদার। ফলে এখনো স্পষ্ট নয়—খবির সরদারকে আসলে কে হত্যা করেছে? আলমাছ কি সত্যিই খুনি, নাকি তাকেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে দায় চাপানো হলো তার ওপর?
গ্রামে এখন বিভক্ত জনমত। একদল বলছে আলমাছ ছিলেন খুনি, আবার অন্যদল বলছে আলমাছ নির্দোষ—বরং তাকেই খুন করে দায় চাপানো হয়েছে। একজন প্রবীণ গ্রামবাসী বলেন— “দুই দিনে দুই খুন, দু’জনেই একই এলাকার মানুষ। আসল সত্য না বের হলে এলাকায় শান্তি ফিরবে না।”
বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চরম আতঙ্ক আর সন্দেহে সাধারণ মানুষ দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়রা বলছে, নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন সম্ভব নয়।
সবাই এখন একটাই দাবি তুলছে—‘দ্রুত তদন্ত হোক, আর সত্য প্রকাশ পাক।’