
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি:
ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান নদীর পাড়ে প্রায় দুই হাজার গাছ কাটার উদ্যোগ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।পরিবেশকর্মীদের প্রতিবাদ এবং উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বিষয় সামনে আসার পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়। তবে এর আগে গত এক সপ্তাহে অন্তত ১৬০টি মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাবখান বাজার থেকে বারুহাট পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় পুরাতন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো কাটার পরিকল্পনা নেয় বন বিভাগ। দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে গাছ কাটার কাজ শুরু করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট ৪৭টি লটে ১ হাজার ৮১৫টি গাছ কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে বন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাস্তবে একেকটি লটে প্রায় ৫০টি করে গাছ কাটার পরিকল্পনা থাকায় মোট গাছের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ হাজার ৩৫০টি।
গাছ কাটার বিষয়টি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামনে আনেন পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক ইসমাঈল মুসাফির। পরে তিনি জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে গাছ কাটা বন্ধের অনুরোধ জানান। তার এই উদ্যোগে সহমত প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ। তিনি উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বিষয়টি ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিনকে অবহিত করেন। এরপর বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জেলা প্রশাসক গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকার কাজটি বন্ধ করে দেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাবখান নদীর পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। নদীর পাশে পাশাপাশি একটি নতুন এবং একটি পুরাতন রাস্তা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পুরাতন রাস্তা থেকে নদীর পানির দিকে গড়ে ২০ ফুটের বেশি শুকনো পাড় রয়েছে, অনেক স্থানে যা আরও বেশি। কোথাও কোথাও জিও ব্যাগ থেকে পাড় পর্যন্ত দূরত্ব ৫০ ফুটেরও বেশি। এত জায়গা থাকার পরও পুরাতন রাস্তার অংশেও ব্লক ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার অংশ হিসেবে রাস্তার দুই পাশে থাকা গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড গাছ কাটার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিল। কয়েক দফা বৈঠকের পর একটি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসক গাছ কাটার অনুমতি দেন। সেই অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজটি শুরু করা হয়। ৪৭টি লটের মধ্যে ৩৭টি লটের ঠিকাদারি পান ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নজরুল মেম্বারসহ চারজন ঠিকাদার। বাকি ১০টি লট পান ঝালকাঠি সদর ও কাঠালিয়া উপজেলার তিনজন ঠিকাদার। ১ হাজার ৮১৫টি গাছের বিপরীতে দরপত্রে মূল্য ওঠে প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
বন বিভাগের নথিতে দেখা যায়, মোট গাছের মধ্যে মাত্র ৮০০টির বিশ্লেষণেই পাওয়া গেছে অন্তত ২৬ প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে রয়েছে রাজ কড়ই, কাঞ্চন, তুলা, অর্জুন, শিশু, বাবলা, তেঁতুল, জারুল, কড়ই, জাম, নিম, কাঁঠাল, গামার, সেগুন ও আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। পরিবেশকর্মীদের মতে, এলাকায় অন্তত ১০০ প্রজাতির পাখি এবং বিরল আকারের অসংখ্য গুইসাপসহ বিভিন্ন সরীসৃপের আবাসস্থল রয়েছে।
ঝালকাঠির সিনিয়র আইনজীবী নাসির উদ্দীন কবীর বলেন, “সংখ্যা দুই হাজার হোক বা তার বেশি—এত গাছ কাটার পরিকল্পনা কীভাবে নেওয়া হলো, সেটিই বড় প্রশ্ন। এখানে সামাজিক বনায়নের পাশাপাশি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য রয়েছে। কোনোভাবেই এই গাছ কাটতে দেওয়া যাবে না।”
এদিকে ইতোমধ্যে চারটি স্থানে চারটি লটের মোট ১৬০টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এসব গাছের মধ্যে ছিল রাজ কড়ই, অর্জুন, শিশু, তুলা, নিম ও বাবলাসহ অন্তত ১৫ প্রজাতির গাছ।
ঝালকাঠি জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকার বলেন, “জেলা প্রশাসকের নির্দেশ পাওয়ার পর গাছ কাটা বন্ধ করা হয়েছে। আমি বলা ছাড়া কেউ একটি ডালও কাটতে পারবে না। গাছের প্রতি বন বিভাগের মায়া সবচেয়ে বেশি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে বলার পর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা এই প্রক্রিয়ায় গিয়েছিলাম।”
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, “উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। গাছ কাটার সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হয়েছিল তখন সেই রায়টি ছিল না। এখন গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, “উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ একটি কমিটির সুপারিশ ছাড়া এভাবে গাছ কাটা যাবে না। পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে টেকসই নয়।”
























