Dhaka , Monday, 18 May 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
রামুতে শতশত বনভূমির মাঝে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো অসহায় মুফিজের একমাত্র ঘর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের বিবৃতি অকাল ঝড়ে কৃষক-ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, তবুও গাজীপুরের লিচু ঘিরে সম্ভাবনার স্বপ্ন সুন্দরবনে করিম শরীফ বাহিনীর দুই সদস্য আটক, জিম্মি ৪ জেলে উদ্ধার মেঘনা ভাঙনে উপকূল, জরুরি কাজের আশ্বাস পানিসম্পদ মন্ত্রীর কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কোন অরাজকতা চলবেনা:- মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকার ১২টা বাজিয়ে গেছে: আবদুস সালাম দুই দিনের সফরে ঢাকায় কাতারের শ্রমমন্ত্রী মালয়েশিয়ায় ঈদুল আজহা ২৭ মে আহত খেলোয়াড়কে আর্থিক সহায়তা দিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মাদক প্রতিরোধে সবার সহযোগিতা চাইলেন মধুপুরের ওসি ফজলুল হক রূপগঞ্জ টেলিভিশন মিডিয়া ক্লাবের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা পাইকগাছায় ভ্রাম্যমান আদালতে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা ৭টি পাসপোর্টসহ সীমান্তে আটক সাবেক পররাষ্ট্র ডিজি সাব্বির কারাগারে, হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে দিল্লিতে তাপমাত্রা উঠতে পারে ৪৫ ডিগ্রিতে আবুধাবির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ড্রোন হামলা রাশিয়ায় ইউক্রেনের পালটা ড্রোন হামলা, নিহত ৪ ঈদুল আজহা কবে জানাল আফগানিস্তান ইসলামের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করছে জামায়াত: রাশেদ খান এবার অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের সব ঘটনার তদন্ত চেয়ে রিট উন্নয়নের মহাযজ্ঞে পাল্টে যাচ্ছে পাইকগাছা পৌরসভার যোগাযোগ ব্যবস্থা হরমুজ ইস্যুতে চীনের অবস্থানকে সমর্থন করবে রাশিয়া ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা যাবে? মোটরসাইকেল মালিক-চালকদের ওপর কর চান না বিরোধী দলীয় নেতা চট্টগ্রামে র‌্যাবের পৃথক অভিযান, জাল নোটসহ গ্রেফতার ৩ ফুলবাড়ী সীমান্তে বিজিবির ঝটিকা অভিযান: বিপুল পরিমাণ গাঁজা জব্দ গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে নবাগত পুলিশ সুপারের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত দড়ি ছাড়াই ঘুরে বেড়ায় ১৩শ কেজির ‘নেইমার’ ড. ইউনূসহ সব উপদেষ্টার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট জামায়াত নেতার বাড়িতে ৯৯ বস্তা সরকারি চাল উদ্ধার

দুই যুগের সন্ত্রাসী অভয়ারণ্যে ঢুকেছে যৌথ বাহিনী, আলীনগর কেন্দ্র করে অপরাধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 01:10:34 pm, Monday, 9 March 2026
  • 44 বার পড়া হয়েছে

ইসমাইল ইমন চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে শুরু হয়েছে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাঁড়াশি অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক কারবারি ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশাল যৌথ অভিযান চলছে।

সোমবার (৯ মার্চ) ফজরের নামাজের পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে যৌথ বাহিনী। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখে অভিযান পরিচালনা করছেন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন সদস্য, ৪০০ র‍্যাব সদস্য এবং ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। এছাড়া অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫টি সাঁজোয়া এপিসি যান, তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং তিনটি হেলিকপ্টার রিজার্ভ রাখা হয়েছে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় বিশেষ কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, প্রায় দুই যুগ ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এখানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ছিল। এই সুযোগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখানে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্র তৈরির কারখানা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, জুয়া ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এসব অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে আলীনগর ও ছিন্নমূল নামের কয়েকটি এলাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে জীবিকার সন্ধানে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন ইয়াসিন নামের এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই ফারুক। প্রথম দিকে ইয়াসিন চট্টগ্রাম শহরে সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন এবং নগরের একটি বস্তিতে বসবাস করতেন। পরে কিছুদিন একটি জুট মিলে চাকরিও করেন তিনি।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে ভাড়া নেন একটি ঘর। এরপর নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসী ও দাগী আসামিদের এনে সেখানে আশ্রয় দিতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে তার নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী।

পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী পাহাড় কেটে মাটি ও জমি বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে থাকেন ইয়াসিন ও তার ভাই ফারুক। পাহাড় কেটে একদিকে মাটি বিক্রি এবং অন্যদিকে দখল করা জায়গা বিক্রি করে অল্প সময়েই তারা কোটিপতি বনে যান।

এইভাবে বিশাল একটি এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা ওই জায়গার নাম দেন ‘আলীনগর’। স্থানীয়দের দাবি, কার্যত এটি হয়ে ওঠে একটি আলাদা রাজ্য, যেখানে দেশের প্রচলিত আইন কার্যকর ছিল না।

আলীনগরে প্রবেশের জন্য ছিল তিনটি নির্দিষ্ট পথ। এই তিনটি পথেই সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকত ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। তাদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারত না। একইভাবে ভেতরে থাকা কেউও অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারত না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে বসবাসকারীদের ওপর কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছিল। কেউ অতিথি নিয়ে এলে অতিথির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দিতে হতো নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
যারা স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করতেন, তাদের ইয়াসিনের স্বাক্ষর করা বিশেষ পাস দেওয়া হতো। সেই পাস দেখিয়ে তারা বাইরে যাতায়াত করতে পারতেন।
কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও কেউ থানায় অভিযোগ করতে পারতেন না। বরং ইয়াসিন ও ফারুকের কথিত আদালতেই বিচার হতো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে এক ধরনের অঘোষিত শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি সরকার জঙ্গল সলিমপুরের খাস জমিতে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তথ্যমন্ত্রী, কয়েকজন সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি মেয়রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেন।
এই পরিদর্শনের সময় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ জুলাই সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যকে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে মারধর করে ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা।

এই ঘটনার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। পরে এই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলে ১৮ জুলাই ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর জেলা প্রশাসন আলীনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি মাটি কাটার স্ক্যাভেটর, ছয়টি ড্রাম ট্রাক এবং একটি বড় ট্রাক জব্দ করে। এসব যন্ত্রপাতি পাহাড় কাটা ও অবৈধ মাটি বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় রোকন মেম্বার নামে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটেছে। তার নেতৃত্বে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এলাকার সচেতন মহলের মতে, ইয়াসিন ও রোকন মেম্বারের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটাই কমে আসবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, চট্টগ্রাম শহরে যেসব ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে, তার অনেক অপরাধীই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস করে। তারা মূলত গ্রেপ্তার এড়াতে এই দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। সম্প্রতি এই এলাকায় অভিযানে গিয়ে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে।

এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এবং সমন্বিত অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের তথ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ইউএভির মাধ্যমে প্রাপ্ত ফুটেজের ভিত্তিতে পুরো অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এই অভিযানের সার্বিক নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ করছে।

আজ ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে যৌথ বাহিনী সমন্বিতভাবে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান শুরু করে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় চারদিক থেকে এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অভিযানের সময় সাঁজোয়া যান, ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রয়োজনে সহায়তার জন্য।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ধ্বংস করা এবং এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করা।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযান চলমান রয়েছে এবং পুরো এলাকা কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

রামুতে শতশত বনভূমির মাঝে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো অসহায় মুফিজের একমাত্র ঘর

দুই যুগের সন্ত্রাসী অভয়ারণ্যে ঢুকেছে যৌথ বাহিনী, আলীনগর কেন্দ্র করে অপরাধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান

আপডেট সময় : 01:10:34 pm, Monday, 9 March 2026

ইসমাইল ইমন চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে শুরু হয়েছে দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাঁড়াশি অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, মাদক কারবারি ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশাল যৌথ অভিযান চলছে।

সোমবার (৯ মার্চ) ফজরের নামাজের পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে যৌথ বাহিনী। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখে অভিযান পরিচালনা করছেন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনাসদস্য, ১৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন সদস্য, ৪০০ র‍্যাব সদস্য এবং ১২০ বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। এছাড়া অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৫টি সাঁজোয়া এপিসি যান, তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং তিনটি হেলিকপ্টার রিজার্ভ রাখা হয়েছে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় বিশেষ কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, প্রায় দুই যুগ ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এখানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ছিল। এই সুযোগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখানে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্র তৈরির কারখানা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, জুয়া ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এসব অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে আলীনগর ও ছিন্নমূল নামের কয়েকটি এলাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে জীবিকার সন্ধানে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন ইয়াসিন নামের এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই ফারুক। প্রথম দিকে ইয়াসিন চট্টগ্রাম শহরে সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন এবং নগরের একটি বস্তিতে বসবাস করতেন। পরে কিছুদিন একটি জুট মিলে চাকরিও করেন তিনি।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে ভাড়া নেন একটি ঘর। এরপর নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসী ও দাগী আসামিদের এনে সেখানে আশ্রয় দিতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে তার নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী।

পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী পাহাড় কেটে মাটি ও জমি বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে থাকেন ইয়াসিন ও তার ভাই ফারুক। পাহাড় কেটে একদিকে মাটি বিক্রি এবং অন্যদিকে দখল করা জায়গা বিক্রি করে অল্প সময়েই তারা কোটিপতি বনে যান।

এইভাবে বিশাল একটি এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা ওই জায়গার নাম দেন ‘আলীনগর’। স্থানীয়দের দাবি, কার্যত এটি হয়ে ওঠে একটি আলাদা রাজ্য, যেখানে দেশের প্রচলিত আইন কার্যকর ছিল না।

আলীনগরে প্রবেশের জন্য ছিল তিনটি নির্দিষ্ট পথ। এই তিনটি পথেই সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকত ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। তাদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারত না। একইভাবে ভেতরে থাকা কেউও অনুমতি ছাড়া বাইরে যেতে পারত না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে বসবাসকারীদের ওপর কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছিল। কেউ অতিথি নিয়ে এলে অতিথির জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দিতে হতো নিয়ন্ত্রণ কক্ষে। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
যারা স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করতেন, তাদের ইয়াসিনের স্বাক্ষর করা বিশেষ পাস দেওয়া হতো। সেই পাস দেখিয়ে তারা বাইরে যাতায়াত করতে পারতেন।
কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও কেউ থানায় অভিযোগ করতে পারতেন না। বরং ইয়াসিন ও ফারুকের কথিত আদালতেই বিচার হতো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে এক ধরনের অঘোষিত শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি সরকার জঙ্গল সলিমপুরের খাস জমিতে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তথ্যমন্ত্রী, কয়েকজন সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি মেয়রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেন।
এই পরিদর্শনের সময় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ জুলাই সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যকে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে মারধর করে ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা।

এই ঘটনার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। পরে এই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলে ১৮ জুলাই ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর জেলা প্রশাসন আলীনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনটি মাটি কাটার স্ক্যাভেটর, ছয়টি ড্রাম ট্রাক এবং একটি বড় ট্রাক জব্দ করে। এসব যন্ত্রপাতি পাহাড় কাটা ও অবৈধ মাটি বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় রোকন মেম্বার নামে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটেছে। তার নেতৃত্বে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এলাকার সচেতন মহলের মতে, ইয়াসিন ও রোকন মেম্বারের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটাই কমে আসবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, চট্টগ্রাম শহরে যেসব ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটে, তার অনেক অপরাধীই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বসবাস করে। তারা মূলত গ্রেপ্তার এড়াতে এই দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। সম্প্রতি এই এলাকায় অভিযানে গিয়ে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং তিনজন আহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে।

এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এবং সমন্বিত অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের তথ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ইউএভির মাধ্যমে প্রাপ্ত ফুটেজের ভিত্তিতে পুরো অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এই অভিযানের সার্বিক নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ করছে।

আজ ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে যৌথ বাহিনী সমন্বিতভাবে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান শুরু করে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় চারদিক থেকে এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অভিযানের সময় সাঁজোয়া যান, ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রয়োজনে সহায়তার জন্য।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ধ্বংস করা এবং এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করা।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযান চলমান রয়েছে এবং পুরো এলাকা কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।