
পলাশ সাহা, নেত্রকোণা প্রতিনিধি,
ভোরের কুয়াশা কেটে সকালের রোদ তখন সবেমাত্র ডানা মেলতে শুরু করেছে। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার পশ্চিম তালদিঘী গ্রামের লাল মিয়ার চায়ের দোকানের সামনের পাকা রাস্তাটিও নিত্যদিনের মতোই স্বাভাবিক ও কোলাহলমুক্ত ছিল। সাধারণ পথচারীদের চোখে আর দশটা সাধারণ পণ্যবাহী মিনি পিকআপের মতোই মনে হয়েছিল ‘টাটা এইস’ গাড়িটিকে। সেই সাধারণ পিকআপের আড়ালেই যে পাচার হচ্ছিল প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকার সর্বনাশা মাদকের বিশাল চালান, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি স্থানীয়রা। শেষ পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) চৌকস তৎপরতায় ভেস্তে গেছে মাদক কারবারিদের সেই চতুর কৌশল।বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, নেত্রকোণা জেলা কার্যালয়ের বিশেষ ও ঝটিকা অভিযানে ৪৯২ বোতল ভারতীয় তৈরি নতুন ব্র্যান্ডের ফেনসিডিলসহ আল-আমিন (৩৩) নামের এক কুখ্যাত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। এ সময় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত পিকআপ ও মোবাইল ফোনসহ জব্দকৃত আলামতের অবৈধ বাজারমূল্য ধরা হয়েছে আনুমানিক ২০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদকের চালান পিকআপযোগে পাচারের গোপন সংবাদ আগে থেকেই ছিল নেত্রকোণা জেলা কার্যালয়ের কাছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অধিদপ্তরের নেত্রকোনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হকের সার্বিক নেতৃত্বে গঠন করা হয় বিশেষ রেইডিং টিম।সকাল ৮টা ৫০ মিনিট থেকে ১০টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা থানাধীন পশ্চিম তালদিঘী গ্রামের লাল মিয়ার চায়ের দোকান সংলগ্ন পশ্চিম পাশের পাকা রাস্তার ওপর কৌশলগত অবস্থান নেয় আভিযানিক দলটি। সন্দেহভাজন মিনি পিকআপটি ঘটনাস্থলে পৌঁছালে গতিরোধ করে তল্লাশি চালানো হয়।পিকআপটি তল্লাশি করতেই বেরিয়ে আসে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা মাদকের চালানটি। আভিযানিক দলের সদস্যরা দেখতে পান, গাড়ির ভেতর অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো রয়েছে দশটি প্লাস্টিকের সিনথেটিক ব্যাগ। এর মধ্যে নয়টি ব্যাগের প্রতিটিতে ৫০ বোতল করে ৪৫০ বোতল এবং অপর একটি ব্যাগে আরও ৪২ বোতলসহ ৪৯২ বোতল ভারতীয় ‘ফেয়ারডিল নিউ’ সিরাপ পাওয়া যায়।প্রতিটি ১০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিকের বোতলের কর্কের ওপর স্পষ্ট করে ‘Dynamic’ শব্দটি লেখা রয়েছে। ভারতীয় তৈরি সিরাপগুলোতে মূল উপাদান হিসেবে রয়েছে কোডিন ফসফেট ও ক্লোরফেনিরামিন ম্যালিয়েট, যা মূলত ফেনসিডিলেরই নতুন একটি বাণিজ্যিক সংস্করণ। জব্দকৃত ৪৯২টি বোতলে তরল মাদকের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ২০০ মিলিলিটার বা ৪৯ দশমিক ২ লিটার।মাদকের পাশাপাশি পাচারকাজে ব্যবহৃত দুটি চাবিসহ টাটা এইস ইএক্স-২ মডেলের মিনি পিকআপটিও জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া মাদক কারবারে যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত ভি-ম্যাক্স মডেলের একটি বাটন মোবাইল সেটও উদ্ধার করা হয়।আটককৃত মাদক কারবারি আল-আমিন নেত্রকোণা জেলারই দুর্গাপুর থানার গাওঁকান্দিয়া ইউনিয়নের হাতিয়ারাকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতার নাম মো. মনির উদ্দিন এবং মাতা রোকেয়া খাতুন। সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলার বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলে বিভিন্ন রুটে মাদক পাচারের সাথে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।দিনদুপুরে গ্রামীণ পাকা সড়কে এমন সফল অভিযানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, আটককৃত আসামি আল-আমিনের বিরুদ্ধে অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হুদা বাদী হয়ে ময়মনসিংহের তারাকান্দা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই চালানের নেপথ্যে আর কারা জড়িত এবং চালানটি কোথায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।

























