
ইসমাইল ইমন, চট্টগ্রাম,
চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর থানাধীন রঙ্গিপাড়া রমনা আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ভয়ঙ্কর মাদক সাম্রাজ্যের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী পাখি আক্তার অবশেষে র্যাব-৭, চট্টগ্রামের জালে ধরা পড়েছে। বহু বছর ধরে এলাকায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট গঠন, যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্ত এই পাখিকে গ্রেফতারের পর এলাকাজুড়ে স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, কোথাও কোথাও মিষ্টি বিতরণ করেও আনন্দ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। দীর্ঘদিনের আতঙ্ক, ভয় আর অসহায়ত্বের পর সাধারণ মানুষ বলছেন “অবশেষে হালিশহর একটু হলেও শান্তি পেল।”
র্যাব-৭ সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, হালিশহর থানাধীন রঙ্গিপাড়া রমনা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে বিপুল পরিমাণ গাঁজা মজুদ করে খুচরা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৪ মে ২০২৬ ইং তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৩০ মিনিটে র্যাব-৭, চট্টগ্রামের একটি বিশেষ আভিযানিক দল অভিযান পরিচালনা করে। স্থানীয়দের উপস্থিতিতে জাহাঙ্গীর আলমের তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার পূর্ব পাশের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। ফ্ল্যাটের দরজায় নক করলে এক নারী দরজা খুলে দেয়। পরে র্যাব সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পান, কয়েকজন নারী-পুরুষ মিলে রুমের মেঝেতে বসে বড় বড় গাঁজার প্যাকেট খুলে ডিজিটাল ওজন মেশিনের সাহায্যে মেপে ছোট ছোট পুরিয়া তৈরি করছে।
ঘটনাস্থল থেকেই র্যাব সদস্যরা কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী পাখি আক্তারসহ মোট ৬ জনকে আটক করতে সক্ষম হন। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, পাখি আক্তার (৩৫), মোঃ ফারুক (২৬), ফারজানা বেগম (২৬), মোঃ হানিফ মিয়া (২৭), শেখ ফরিদ (৩০) ও শাহানা বেগম (৫০)। এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ১১ কেজি ৯০০ গ্রাম গাঁজা, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্য জব্দ করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হালিশহর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাখি আক্তার শুধু একজন সাধারণ মাদক ব্যবসায়ী নয়, বরং সে ছিল পুরো এলাকার একটি ভয়ঙ্কর মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক। তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা, অভিযোগ এবং দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা পরিচালনার তথ্য। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, রঙ্গিপাড়া, রমনা আবাসিক এলাকা ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি চলতো। সন্ধ্যার পর এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল পর্যন্ত কমে যেত। তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে মাদকের ভয়াল থাবায় জড়িয়ে পড়ে। অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটাতেন।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, পাখির এই মাদক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে নেপথ্যে কাজ করেছে একটি শক্তিশালী আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা চক্র। স্থানীয়দের দাবি, কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা, কথিত রাজনৈতিক নেতা, সুবিধাভোগী কোটাবাজ এবং নামধারী সাংবাদিক নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে পাখিকে রক্ষা করতো। অভিযোগ রয়েছে, মাস শেষে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এসব অসাধু চক্র পাখির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ধামাচাপা দিতো। ফলে বছরের পর বছর ধরেই পাখি এলাকাজুড়ে মাদকের নেটওয়ার্ক বিস্তার করতে সক্ষম হয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, শুধু পাখিকে গ্রেফতার করলেই হবে না, যারা তাকে পেছন থেকে শক্তি যুগিয়েছে এবং সমাজ ধ্বংসের এই খেলায় সহযোগিতা করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
পাখি আক্তার গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রঙ্গিপাড়া এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় যুবক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ আনন্দ প্রকাশ করে মিষ্টি বিতরণ করেন। কেউ কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে র্যাব সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। একাধিক বাসিন্দা বলেন, “বহু বছর ধরে আমরা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করেছি। এলাকার পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেরা মাদকে জড়িয়ে পড়ছিল। আজ মনে হচ্ছে, অবশেষে অন্ধকারের বিরুদ্ধে একটা বড় আঘাত এসেছে।”
আরেকজন বাসিন্দা বলেন, “পাখির কারণে পুরো এলাকা বদনামের কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হতো, কিন্তু কেউ কিছু বলার সাহস পেত না। আজ এলাকাবাসী স্বস্তি পেয়েছে। তবে যারা এতদিন তাকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।”
সচেতন মহল বলছে, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়, বরং পুরো সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ মাঠপর্যায়ের কারবারিদের পেছনে থেকে যারা অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাবের জোরে এসব অপরাধ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা কঠিন হবে।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত আরও ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও জানা গেছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র্যাব-৭, চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) ও সহকারী পুলিশ সুপার এ. আর. এম. মোজাফ্ফর হোসেন। তিনি বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে র্যাবের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো মাদক কারবারি কিংবা তাদের আশ্রয়দাতাদের ছাড় দেওয়া হবে না। আইন অনুযায়ী সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

























