Dhaka , Wednesday, 4 March 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
দুর্গাপুরে ২য় বারের মতো শুরু হচ্ছে হিফজুল কুরআন হামদ-নাত ও আজান প্রতিযোগিতা রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উচ্ছেদ অভিযান চট্টগ্রামকে ক্লিন-গ্রিন সিটি হিসেবে গড়তে একযোগে কাজ করতে হবে: মেয়র ডা. শাহাদাত সাংবাদিক নেতা মো. আইয়ুব আলীর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের শোক আগামী দিনে কাজের মধ্য দিয়ে প্রমান করব, মেয়র মজিবুর রহমান বেনাপোল দিয়ে দেশে ফিরল সাবেক এমপি জোয়াহেরুল ইসলামের মরদেহ আদ্-দ্বীন হাসপাতালে অত্যাধুনিক সিটি স্ক্যান মেশিন উদ্বোধন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সুন্দরগঞ্জ  পৌর এলাকায় ডাষ্টবিন বিতরণ  আমতলীতে সাংবাদিকের চাঁদা দাবী। গণধোলাইয়ের পর পুলিশে সোপর্দ। এমপির নির্দেশ অমান্য করে ছেড়ে দিলেন পুলিশ সংরক্ষিত মহিলা আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চান টাঙ্গাইলের নাজমা পারভীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০৮ কেজি গাঁজাসহ মাইক্রোবাস আটক সাঘাটায় মাদক সেবনকারীকে ৬ মাসের  কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমান আদালত    নোয়াখালীতে ৫ মাদকসেবীকে কারাদণ্ড নোয়াখালীতে ৫ মাদকসেবীকে কারাদণ্ড চবিতে ফ্যাসিস্টের দোসর সাইদ হোসেন এর বিতর্কিত পদোন্নতি : প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন বেতাগী মেয়ার হাট বাজারে পাবলিক টয়লেট দখল করে ছাগলের ঘর-প্রশাসনের অভিযানে উদ্ধার  কোস্ট গার্ডের অভিযানে অস্ত্রসহ বনদস্যু আটক বেতাগীতে (বিএনপি) দুই দফা আনন্দ মিছিল:-চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আদিতমারীতে পলাশী ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিতআদিতমারীতে পলাশী ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উচ্ছেদ অভিযান  রায়পুরে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান: ২৪ হাজার টাকা জরিমানা। দুর্গাপুর সাংবাদিক সমিতির আহবায়ক কমিটি গঠন পাইকগাছা পৌরসভা বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে পৌর প্রশাসক পাইকগাছায় মৎস্য লীজ ঘের নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে উত্তেজনা গাজীপুরে ইয়াবাসহ ৯ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লুটপাটের শিকার কারখানা মালিকের সংবাদ সম্মেলন পতাকা বিধিমালার তোয়াক্কা নেই লালমনিরহাট খামারবাড়িতে; নিয়ম জানেন না খোদ উপ-পরিচালক! ভঙ্গুর সংযোগ সড়কে মরণফাঁদ: মোগলহাটে ৬৯ লাখ টাকার সেতুতে জনভোগান্তি চরমে রামগঞ্জে সন্ধ্যার পর কোন শিক্ষার্থী বাহিরে থাকতে পারবে না শাহাদাত হোসেন সেলিম এমপি ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে আকাশপথে অচলাবস্থা, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ আটকা কয়েক হাজার যাত্রী

স্মৃতির আয়নায় দেশমাতা: অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর বয়ানে এক মানবিক নেত্রী

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 01:08:06 pm, Monday, 5 January 2026
  • 75 বার পড়া হয়েছে

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল,
কলামিস্ট, মানব ও শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞ,

“বলার মতো, গুছিয়ে কথা বলার শক্তি বা ভাষা আজ অবশিষ্ট নেই। তবুও স্মৃতির পাতা উল্টালে ভেসে ওঠে এক মহীয়সী নারীর অবয়ব।” এভাবেই অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে প্রিয় নেত্রীর স্মৃতিচারণ শুরু করেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর যাপিত জীবনের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর ভাষায়, অভিভাবক হিসেবে তাঁর মা দুজন—একজন জন্মদাত্রী মাতা, আর রাজনৈতিক মা হলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আজ সেই রাজনৈতিক মাতাকে হারিয়ে গোটা দেশ যেমন শোকাতুর, অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর ব্যক্তিগত জগতও তেমনি এক বিশাল শূন্যতায় নিমজ্জিত। তাঁর মতে, এটি একটি মহাকালের প্রস্থান।

মুগ্ধতার সেই প্রথম প্রহর:
অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর স্মৃতিতে আজও অম্লান ১৯৮৩ বা ৮৫ সালের সেই দিনটি, যখন তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। শহরে মাইকিং হচ্ছিল—কালেক্টরেট মাঠে খালেদা জিয়া আসবেন। সেই জনসভায় যোগ দেওয়ার জন্য তৎকালীন ছাত্রনেতা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছিল। মাঠের অনেক দূর থেকে প্রথমবার সেই ব্যক্তিত্বময়ী নেত্রীকে দেখে এবং তাঁর দৃঢ়চেতা মনোভাব উপলব্ধি করে তিনি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। এর ঠিক কয়েক বছর পর, ১৯৮৬ সালে লালমনিরহাট চার্চ অব গড মিশনের গেস্ট হাউসে নেত্রী যখন এক রাত যাপন করেন, তখনই তাঁর সঙ্গে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর প্রথম সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়। নেত্রীর সেই দিনের আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে সরকার পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে বিভিন্ন পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে পাশে ছিলেন।

মানবিকতার দুই অনন্য উপাখ্যান:
অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু তাঁর বক্তব্যে দুটি পরম মানবিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যা বেগম জিয়ার অতুলনীয় কোমল হৃদয়কে ফুটিয়ে তোলে:
* *পাগল রফিকের প্রতি মমতা ও সহায়তা-*একবার লালমনিরহাটের বড়বাড়ী কলেজ মাঠের এক জনসভায় ‘রফিক’ নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক সারা শরীরে ধানের শীষ নিয়ে লাফাচ্ছিল। নেত্রী তাকে দেখে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুকে বলেছিলেন, “দুলু, এই ছেলেটা তো পাগল হয়ে যাবে”। নিরাপত্তারক্ষীরা বা সিএসএফ সদস্যরা তাকে সরিয়ে দিলেও নেত্রীর নির্দেশে তাকে কাছে আনা হলে তিনি নিজ হাতে তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে সেই পাগলের হাতে তুলে দেন। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির প্রতি দেশের শীর্ষ নেত্রীর এই মমতা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর মনে চিরস্থায়ী রেখাপাত করে।
* তৃণমূলের খোঁজ রাখা- ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চরম ব্যস্ততার মাঝেও বেগম খালেদা জিয়া লালমনিরহাটের সেই সাধারণ নারী কর্মীদের কথা ভোলেননি, যারা একসময় অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর মনোনয়নের দাবিতে তাঁর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। নেত্রী স্বয়ং অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুকে তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, “দুলু, ওই মহিলাগুলোর খোঁজ রাখিও, ওদের সহযোগিতা করিও।” তিনি প্রকৃতপক্ষেই ছিলেন এক মমতাময়ী মানবতার নেত্রী।

উন্নয়ন ও লালমনিরহাটের প্রতি মমত্ববোধ:
সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু তুলে ধরেন নেত্রী লালমনিরহাটকে কতটা ভালোবাসতেন এবং তাঁর বিভিন্ন প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে এই অঞ্চলের উন্নয়নে যা করেছেন:
* *লালমনি এক্সপ্রেস- *অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর বিশেষ অনুরোধে সাড়া দিয়ে নেত্রী লালমনিরহাটবাসীর যাতায়াতের সুবিধার্থে ‘লালমনি এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি চালু করেন ও রেলওয়ে স্টেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেন।
* *তিস্তা সেতু- *তিস্তা ব্রিজের ফান্ডিং যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন নেত্রী স্বয়ং কুয়েত সফর করে পুনরায় ফান্ডের ব্যবস্থা করেন এবং নিজে হেলিকপ্টারে করে এসে সেতুটির উদ্বোধন করেন।
* অন্যান্য প্রকল্প- কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC), এতিমখানা এবং যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পেছনে নেত্রীর বিশেষ ভূমিকা ছিল।
* কূটনৈতিক সাফল্য- দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা করিডোর খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা তিনি ভারতের সাথে চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন।

রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আপসহীন সংগ্রাম:
অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু জানান, বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ছিল শালীনতা আর ধৈর্যের। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করেননি। তাঁর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস এক অদম্য সাহসের মহাকাব্য; ১৯৮২ সাল থেকে দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি যে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল। ১/১১-এর কঠিন সময়ে যখন তাঁকে দেশত্যাগের জন্য প্রবল চাপ ও নানা লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন—”এদেশই আমার ঠিকানা”।
গত ১৭ বছরের বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘ অবরুদ্ধ জীবন, কারাবরণ এবং সুচিকিৎসা বঞ্চিত হওয়ার কঠিন ত্যাগ তিনি কেবল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য স্বীকার করেছেন। এমনকি ৫ই আগস্টের ভাষণে অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন—“পরাজিতের ওপর যদি কেউ প্রতিশোধ নেয়, তবে বিজয়ের আনন্দ থাকে না”। অথচ তাঁকে যারা অশ্লীলভাবে, নানাভাবে অপমানিত করার চেষ্টা করেছে, আক্রমণ করেছে—তিনি ঘুণাক্ষরেও তাঁদের একজনের নামও উল্লেখ করেননি। কত বড় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানবিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলে এটি সম্ভব! এত নির্যাতনের পরেও তিনি কারও বিরুদ্ধে একটিও উসকানিমূলক কথা বলেননি।

নিভৃত মুহূর্তের সেই মধুর স্মৃতি মৃতিচারণে উঠে এসেছে অত্যন্ত ঘরোয়া কিছু মায়াবী মুহূর্ত:
* *চায়ের স্মৃতি- *লালমনিরহাট সার্কিট হাউসে নেত্রী যখন জানলেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু চা খান না, তখন তিনি কৌতুক করে বলেছিলেন—“চা খাও না? তবে রাজনীতি করলা কীভাবে? বাংলাদেশে চা খায় না এমন কোনো রাজনীতিবিদ আছে?”। এত বড় মাপের রাজনীতিবিদ হয়েও তিনি কীভাবে ক্ষুদ্র বিষয়কেও অ্যাড্রেস করতেন, তা আজও দুলু সাহেবকে বিষ্মিত করে।
* *গ্রামের জীবন- *অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু কেন শহর ছেড়ে অজপাড়াগাঁয়ে থাকেন তা নিয়ে নেত্রীর উদ্বেগের জবাবে তিনি যখন বলেন মানুষের ভালোবাসাই তাঁর নিরাপত্তা, তখন নেত্রী তাঁর এই দর্শনের প্রশংসা করে বলেছিলেন—“মানুষকে ভালোবাসলে ভালোবাসা পাওয়া যায়।”

শেষ বিদায়ের আর্তি, শোক যখন শক্তি:
দেশমাতা খালেদা জিয়া যুগ যুগ ধরে মানুষের মণিকোঠায় বেঁচে থাকবেন, মানুষের মানসপটে বেঁচে থাকবেন—এমনই মন্তব্য করেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। শারীরিকভাবে তিনি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু মনে করেন তাঁর আদর্শই হবে আগামী দিনের আলোকবর্তিকা। মহান আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেন, তাঁকে কেউ অসম্মান করতে পারে না। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সেটিই প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আজ মহিমান্বিত হয়েছেন, মহীয়সী নারী হয়েছেন। গোটা বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছেন। এই যে ভালোবাসা, এই যে আন্তরিকতা—সেটি শতাব্দী থেকে শতাব্দী বাংলাদেশের মানুষ মনে রাখবে।

বাবা শহীদ জিয়াকে অনেক আগে হারিয়েছেন, ভাই আরাফাত রহমানকে হারিয়েছেন, আর আজ পরম প্রিয় মাতাকে হারিয়ে দেশনায়ক তারেক রহমান আজ বড় একা, আজ তিনি এতিম। অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর শেষ আকুতি—এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আজকের প্রধান শপথ।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মানুষের মানসপটে এবং ইতিহাসের পাতায় যুগ যুগ ধরে এক অবিনশ্বর নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপুরে ২য় বারের মতো শুরু হচ্ছে হিফজুল কুরআন হামদ-নাত ও আজান প্রতিযোগিতা

স্মৃতির আয়নায় দেশমাতা: অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর বয়ানে এক মানবিক নেত্রী

আপডেট সময় : 01:08:06 pm, Monday, 5 January 2026

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল,
কলামিস্ট, মানব ও শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞ,

“বলার মতো, গুছিয়ে কথা বলার শক্তি বা ভাষা আজ অবশিষ্ট নেই। তবুও স্মৃতির পাতা উল্টালে ভেসে ওঠে এক মহীয়সী নারীর অবয়ব।” এভাবেই অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে প্রিয় নেত্রীর স্মৃতিচারণ শুরু করেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর যাপিত জীবনের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর ভাষায়, অভিভাবক হিসেবে তাঁর মা দুজন—একজন জন্মদাত্রী মাতা, আর রাজনৈতিক মা হলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আজ সেই রাজনৈতিক মাতাকে হারিয়ে গোটা দেশ যেমন শোকাতুর, অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর ব্যক্তিগত জগতও তেমনি এক বিশাল শূন্যতায় নিমজ্জিত। তাঁর মতে, এটি একটি মহাকালের প্রস্থান।

মুগ্ধতার সেই প্রথম প্রহর:
অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর স্মৃতিতে আজও অম্লান ১৯৮৩ বা ৮৫ সালের সেই দিনটি, যখন তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। শহরে মাইকিং হচ্ছিল—কালেক্টরেট মাঠে খালেদা জিয়া আসবেন। সেই জনসভায় যোগ দেওয়ার জন্য তৎকালীন ছাত্রনেতা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছিল। মাঠের অনেক দূর থেকে প্রথমবার সেই ব্যক্তিত্বময়ী নেত্রীকে দেখে এবং তাঁর দৃঢ়চেতা মনোভাব উপলব্ধি করে তিনি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। এর ঠিক কয়েক বছর পর, ১৯৮৬ সালে লালমনিরহাট চার্চ অব গড মিশনের গেস্ট হাউসে নেত্রী যখন এক রাত যাপন করেন, তখনই তাঁর সঙ্গে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর প্রথম সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়। নেত্রীর সেই দিনের আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে সরকার পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে বিভিন্ন পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে পাশে ছিলেন।

মানবিকতার দুই অনন্য উপাখ্যান:
অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু তাঁর বক্তব্যে দুটি পরম মানবিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যা বেগম জিয়ার অতুলনীয় কোমল হৃদয়কে ফুটিয়ে তোলে:
* *পাগল রফিকের প্রতি মমতা ও সহায়তা-*একবার লালমনিরহাটের বড়বাড়ী কলেজ মাঠের এক জনসভায় ‘রফিক’ নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক সারা শরীরে ধানের শীষ নিয়ে লাফাচ্ছিল। নেত্রী তাকে দেখে অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুকে বলেছিলেন, “দুলু, এই ছেলেটা তো পাগল হয়ে যাবে”। নিরাপত্তারক্ষীরা বা সিএসএফ সদস্যরা তাকে সরিয়ে দিলেও নেত্রীর নির্দেশে তাকে কাছে আনা হলে তিনি নিজ হাতে তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে সেই পাগলের হাতে তুলে দেন। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির প্রতি দেশের শীর্ষ নেত্রীর এই মমতা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর মনে চিরস্থায়ী রেখাপাত করে।
* তৃণমূলের খোঁজ রাখা- ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চরম ব্যস্ততার মাঝেও বেগম খালেদা জিয়া লালমনিরহাটের সেই সাধারণ নারী কর্মীদের কথা ভোলেননি, যারা একসময় অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর মনোনয়নের দাবিতে তাঁর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। নেত্রী স্বয়ং অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুকে তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, “দুলু, ওই মহিলাগুলোর খোঁজ রাখিও, ওদের সহযোগিতা করিও।” তিনি প্রকৃতপক্ষেই ছিলেন এক মমতাময়ী মানবতার নেত্রী।

উন্নয়ন ও লালমনিরহাটের প্রতি মমত্ববোধ:
সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু তুলে ধরেন নেত্রী লালমনিরহাটকে কতটা ভালোবাসতেন এবং তাঁর বিভিন্ন প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে এই অঞ্চলের উন্নয়নে যা করেছেন:
* *লালমনি এক্সপ্রেস- *অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর বিশেষ অনুরোধে সাড়া দিয়ে নেত্রী লালমনিরহাটবাসীর যাতায়াতের সুবিধার্থে ‘লালমনি এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি চালু করেন ও রেলওয়ে স্টেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেন।
* *তিস্তা সেতু- *তিস্তা ব্রিজের ফান্ডিং যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন নেত্রী স্বয়ং কুয়েত সফর করে পুনরায় ফান্ডের ব্যবস্থা করেন এবং নিজে হেলিকপ্টারে করে এসে সেতুটির উদ্বোধন করেন।
* অন্যান্য প্রকল্প- কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC), এতিমখানা এবং যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পেছনে নেত্রীর বিশেষ ভূমিকা ছিল।
* কূটনৈতিক সাফল্য- দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা করিডোর খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা তিনি ভারতের সাথে চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন।

রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আপসহীন সংগ্রাম:
অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু জানান, বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ছিল শালীনতা আর ধৈর্যের। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করেননি। তাঁর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস এক অদম্য সাহসের মহাকাব্য; ১৯৮২ সাল থেকে দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি যে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল। ১/১১-এর কঠিন সময়ে যখন তাঁকে দেশত্যাগের জন্য প্রবল চাপ ও নানা লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন—”এদেশই আমার ঠিকানা”।
গত ১৭ বছরের বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘ অবরুদ্ধ জীবন, কারাবরণ এবং সুচিকিৎসা বঞ্চিত হওয়ার কঠিন ত্যাগ তিনি কেবল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য স্বীকার করেছেন। এমনকি ৫ই আগস্টের ভাষণে অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন—“পরাজিতের ওপর যদি কেউ প্রতিশোধ নেয়, তবে বিজয়ের আনন্দ থাকে না”। অথচ তাঁকে যারা অশ্লীলভাবে, নানাভাবে অপমানিত করার চেষ্টা করেছে, আক্রমণ করেছে—তিনি ঘুণাক্ষরেও তাঁদের একজনের নামও উল্লেখ করেননি। কত বড় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানবিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলে এটি সম্ভব! এত নির্যাতনের পরেও তিনি কারও বিরুদ্ধে একটিও উসকানিমূলক কথা বলেননি।

নিভৃত মুহূর্তের সেই মধুর স্মৃতি মৃতিচারণে উঠে এসেছে অত্যন্ত ঘরোয়া কিছু মায়াবী মুহূর্ত:
* *চায়ের স্মৃতি- *লালমনিরহাট সার্কিট হাউসে নেত্রী যখন জানলেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু চা খান না, তখন তিনি কৌতুক করে বলেছিলেন—“চা খাও না? তবে রাজনীতি করলা কীভাবে? বাংলাদেশে চা খায় না এমন কোনো রাজনীতিবিদ আছে?”। এত বড় মাপের রাজনীতিবিদ হয়েও তিনি কীভাবে ক্ষুদ্র বিষয়কেও অ্যাড্রেস করতেন, তা আজও দুলু সাহেবকে বিষ্মিত করে।
* *গ্রামের জীবন- *অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু কেন শহর ছেড়ে অজপাড়াগাঁয়ে থাকেন তা নিয়ে নেত্রীর উদ্বেগের জবাবে তিনি যখন বলেন মানুষের ভালোবাসাই তাঁর নিরাপত্তা, তখন নেত্রী তাঁর এই দর্শনের প্রশংসা করে বলেছিলেন—“মানুষকে ভালোবাসলে ভালোবাসা পাওয়া যায়।”

শেষ বিদায়ের আর্তি, শোক যখন শক্তি:
দেশমাতা খালেদা জিয়া যুগ যুগ ধরে মানুষের মণিকোঠায় বেঁচে থাকবেন, মানুষের মানসপটে বেঁচে থাকবেন—এমনই মন্তব্য করেন অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। শারীরিকভাবে তিনি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু মনে করেন তাঁর আদর্শই হবে আগামী দিনের আলোকবর্তিকা। মহান আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেন, তাঁকে কেউ অসম্মান করতে পারে না। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সেটিই প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আজ মহিমান্বিত হয়েছেন, মহীয়সী নারী হয়েছেন। গোটা বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছেন। এই যে ভালোবাসা, এই যে আন্তরিকতা—সেটি শতাব্দী থেকে শতাব্দী বাংলাদেশের মানুষ মনে রাখবে।

বাবা শহীদ জিয়াকে অনেক আগে হারিয়েছেন, ভাই আরাফাত রহমানকে হারিয়েছেন, আর আজ পরম প্রিয় মাতাকে হারিয়ে দেশনায়ক তারেক রহমান আজ বড় একা, আজ তিনি এতিম। অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর শেষ আকুতি—এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আজকের প্রধান শপথ।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মানুষের মানসপটে এবং ইতিহাসের পাতায় যুগ যুগ ধরে এক অবিনশ্বর নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।