
মো: মোসাদ্দেক হোসেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়:
না, রাজনীতি নামক সত্তাকে অগোচরে রেখে কখনোই একটি বিশ্ববিদ্যালয় কে পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না বড়জোর সেটিকে একটি স্পেশালাইজ্ড বা বিশেষায়িত সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বলা যায়। কেন এমন? চলুন বলছি।
কল্পনা করুন, একটি দেশ। তার নিজস্ব ভূখণ্ড আছে, আছে বিভিন্ন স্তরের জনসংখ্যা, সার্বভৌমত্বও আছে, শুধু নেই এসকল কিছু কে সমন্বয় করার প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কাঠামো। অকল্পনীয় না পরিস্থিতিটা? অরাজকতা আর স্বেচ্ছাচারীদের রাজত্ব কায়েম হবে এমন সময়টাতে এটায় স্বাভাবিক।
এখন যদি বলি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভেতরে একটি ছায়া রাষ্ট্র! যার অন্যতম লক্ষ্য বিষয়ভিত্তিক দক্ষ পেশাদার তৈরির পাশাপাশি একটি সাধারণ শিক্ষার্থীকে সর্ব দিকে দীক্ষা দিয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে গড়ে তোলা। তাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটেও একটি রাষ্ট্রের মতো প্রত্যেকটি সংগঠন, প্রত্যেকটি মতাদর্শ, প্রত্যেকটি বিতর্কের জন্য এক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়ে গেছে।
দেখুন, একটি রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক উপাদান চারটি (ভূমি, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব)। যার সবগুলোই একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রয়েছে সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, আছে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জনসংখ্যার প্রতিচ্ছবি। রয়েছে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ ও বিচারের ক্ষমতা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স, সিন্ডিকেট সভার রেগুলেশন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। আর সরকার? সেটা তো ভাইস-চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, ডিন, প্রভোস্ট এসব একেকটা পদ একেকটা মন্ত্রণালয়ের মতো।
তাহলে বলুন তো, এই ছোট্ট স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে রাজনীতি থাকবে না কেন? একটা দেশ যেমন রাজনীতি ছাড়া চলতে পারে না, তেমনি একটা পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ও রাজনীতিহীন হয়ে থাকতে পারে না। কারণ এখানে শুধু পড়াশোনা হয় না এখানে গড়ে ওঠে উন্নত সভ্যতা, মানসম্পন্ন সমাজ। এখানে চিন্তা জন্মায়, বিতর্ক হয়, প্রতিবাদ জাগে, নেতৃত্ব তৈরি হয় আর এসবের জন্য দরকার হয় সংগঠিত হওয়া যার জন্য প্রয়োজন রাজনীতি কারণ রাজনীতিই শেখায় ক্ষমতার বণ্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বার্থের সংঘাত ও সমঝোতার খেলা।
কিন্তু আপনি হয়তো বলবেন, ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে তো সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, সিট দখল, মারামারি হয়! ঠিক বলেছেন। কিন্তু এসব তো রাজনীতির দোষ নয় এসব হচ্ছে বিকৃত রাজনীতির দোষ, এসব অসুস্থ রাজনৈতিক মননের ত্রুটি, পরিপূর্ণ চিন্তাধারার অপ্রতুলতা। একটা দেশে যদি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস হয়, তাহলে কি আমরা বলি দেশে রাজনীতি বন্ধ করে দাও? না, আমরা বলি সংস্কার করো, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করো, সুশাসন আনো। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন একই যুক্তি খাটবে না?
হ্যা, আজ আমরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটা ছোট রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করছি,রাষ্ট্রে যেমন বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান থাকে, তেমনি ক্যাম্পাসেও থাকা উচিত।
রাষ্ট্র যেমন কেবল প্রশাসন দিয়ে চলে না, তার জন্য প্রয়োজন হয় বিরোধী মত, প্রেসার গ্রুপ, বিভিন্ন মতবাদ, বিভিন্ন সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ও একথা প্রযোজ্য। ছাত্র সংগঠনগুলো এখানে ঠিক একটি রাষ্ট্রের প্রেসার গ্রুপের ভূমিকা পালন করে। প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা রোধ, শিক্ষার্থীদের নায্য অধিকার আদায় এবং ক্যাম্পাসের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলার জন্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উপস্থিতি অনস্বীকার্য।
যখনই আমরা রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের কথা বলি, আমরা আসলে এই ছায়া রাষ্ট্র থেকে তার গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু কেড়ে নিতে চাই। রাষ্ট্রের নাগরিকরা যেমন আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি পেশ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তাদের দাবিগুলো প্রশাসনের টেবিলে পৌঁছে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হলো, একটি রাষ্ট্রকে স্বৈরাচারী শাসকের হাতে তুলে দেওয়া, যেখানে জনগণের (শিক্ষার্থীদের) কোনো কথা বলার অধিকার থাকবে না।
এছাড়াও একটি পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠন বা গণমাধ্যম কর্মী শিক্ষার্থীদের পূর্ণ স্বাধীনতা বা প্রয়োজনীয় তথ্য অধিগত করার ক্ষমতা। যাতে প্রসাশনের সকল কার্যক্রমে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা বজায় থাকে। বলা হয় গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাই ক্যাম্পাসে এর সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা অতি প্রয়োজনীয়।
মনের গহিনে প্রশ্ন আসার কথা, কি হবে এসব না থাকলে, কেন রাষ্ট্রের সকল গুনে গুণান্বিত হতে হবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে? উত্তর হলো এসব না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় হয় একটা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান যেখানে শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং শিখিয়ে তৈরি করা হয় শুধু ইঞ্জিনিয়ার, বা শুধু মেডিকেল পড়িয়ে তৈরি করা হয় শুধু ডাক্তার। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা শুধু একমুখী ভূমিকাই পালন করবে আজীবন। কিন্তু একটা পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হলে সে প্রাঙ্গন হবে একটা জীবন্ত সমাজ, যেখানে রাজনীতি, সংস্কৃতি, গবেষণা, প্রগতি সবকিছুর উপস্থিতি থাকবে, সর্বদিকে দীক্ষিত হবে ছাত্রসমাজ। যেমন একটা দেশে শুধু অর্থনীতি থাকলে চলে না,দরকার রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, সমাজসেবা। তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও কথা গুলো সত্য।একটা সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হবে সবকিছুর সমন্বয়। এখানে একই সাথে গবেষণা হবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, ধর্মীয় আলোচনা হবে, প্রগতিশীল চিন্তা জাগবে, রাজনৈতিক বিতর্ক হবে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, এগুলো একে অপরের পরিপূরক। যদি শুধু গবেষণা থাকে আর রাজনীতি না থাকে, তাহলে সেই গবেষণা সমাজের জন্য অনেকাংশে কাজে নাও লাগতে পারে। যদি শুধু সংস্কৃতি থাকে আর প্রগতিশীল চিন্তা না থাকে, তাহলে সত্যিকারের সাংস্কৃতিক জাগরণ নাও ঘটতে পারে।
আরেকটা কথা অনেকেই বলেন যে, রাজনীতি থাকলে পড়াশোনা নষ্ট হয়। তাদের বলছি, অতীতে দৃষ্টিপাত করে দেখুন ইতিহাসের প্রতিটি মোড় ঘুরানো মুহুর্তের পেছনে রয়েছে ছাত্রদের সংগঠিত রাজনীতি। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ বা এই আমাদের জুলাই ২৪ শের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এসব কি রাজনীতিহীন ছিল? না। রাজনীতিই তো দেশকে নতুন দিক দেখিয়েছে। এসব ছিল ন্যায়ের রাজনীতি। রাজনীতি বন্ধ করলে এসব কখনো ঘটত না। শুধু পড়াশোনা করে দেশ বদলানো যায় না দরকার চিন্তা, প্রতিবাদ, ও সংগঠিত হওয়া। আর সেটা গঠনমূলক রাজনীতি ছাড়া কি আদৌ সম্ভব?
তবে হ্যাঁ, সমস্যা আছে। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি, দখলদারি, সন্ত্রাস এগুলো বন্ধ করতে হবে। কিন্তু বন্ধ করার মানে পুরো রাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয়। বন্ধ মানে সংস্কার, বন্ধ মানে প্রতিকার। নির্দলীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করা, দলীয় নেতাদের ক্যাম্পাসে অপশক্তি প্রয়োগ বন্ধ করা, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা। রাজনীতি থাকবে কিন্তু তা হবে সুস্থ, গণতান্ত্রিক, শিক্ষাকেন্দ্রিক।
শেষে বলতে চাই, একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি রাজনীতিমুক্ত করা হয়, তাহলে সেটি শুধু ডিগ্রি ছাপানোর কারখানা হয়ে যায় এটি কখনো সভ্য সমাজের আয়না বা বৃহৎ চিন্তার কারখানা বা দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হতে পারেনা। আমরা চাই না বিশ্ববিদ্যালয় একটি নির্জীব প্রতিষ্ঠান হোক। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রাণোজ্জ্বল ও জীবন্ত, যেখানে রাজনীতি থাকবে, থাকবে সকল মতাদর্শ, থাকবে সকল মানবাধিকার, স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক, গবেষণামূলক সংগঠন যেগুলোর একমাত্র উপজীব্য বিষয় হবে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রের কান্ডারী হিসেবে সুপ্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা।
























