
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান কোরাল রীফ প্রপার্টিজ লিমিটেডের নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় নির্মিত একটি প্রকল্পে জমির মালিকদের প্রাপ্য ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে, একই ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে জাল কাগজপত্র ও জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। শুধু চট্টগ্রামে নয়, কক্সবাজারের বিভিন্ন প্রকল্পে একই কৌশল করে একাধিক জমির মালিকের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের দায়ের করা মামলার তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তবে এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে দায়ের করা পাল্টা মামলায় ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার আমানত খান সড়কের খান বাড়ির ১৬ হাজার ৫৩৩ বর্গফুট জমিতে ১৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য জমির মালিক ৩০ জন ওয়ারিশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন কোরাল রীফ প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম। চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে প্রায় ৮ বছর অতিবাহিত করে। চুক্তিতে অতিরিক্ত ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছিল। প্রকল্পে মোট ৮৯টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়, যার মধ্যে ৫০ শতাংশ জমির মালিক এবং বাকি ৫০ শতাংশ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান পাওয়ার কথা ছিল। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়। চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হলে ডেভেলপারকে জমির মালিকদের প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। সে হিসেবে মামলার বাদী প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা পাওয়ার অধিকারী।
তবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো অর্থ পরিশোধ না করে বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখে কোরাল রীফ প্রপার্টিজ। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের জুন মাসে জমির অন্যতম মালিক মো. আমজাদ খানের ছেলে সামিউল খান আদালতে মামলা দায়ের করেন।
মামলা সূত্রে আরও জানা যায়, কোরাল রীফ প্রপার্টিজকে বারবার চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বৈঠকে ডাকা হলেও তারা বিষয়টি আমলে নেয়নি, বরং অন্যান্য ভূমি মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সমঝোতা চুক্তি ও আমোক্তারনামা সম্পাদন না করে ২০১২ সালের মূল চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে থাকে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদ ভূমি অফিসে জমির মালিক সামিউল খান, আসিফ খান ও আমজাদ খান আপত্তি দাখিল করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওই ভবনের নামজারি কার্যক্রম স্থগিত করেন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৩ জুন খান বাড়িতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কোরাল রীফ প্রপার্টিজের লোকজন জমির মালিক সামিউল খান ও তার বাবা আমজাদ খানকে মারধর করে। একইসঙ্গে ওই বৈঠকে চুক্তিপত্র অস্বীকার করে কোনো ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেয়। এমনকি পরে ফ্ল্যাট বুঝে নিতে চাইলে জমির মালিকদের কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৬ এ দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সিএমপির ডিবি বন্দর-পশ্চিম বিভাগ। তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ মহসীন উদ্দিন রুবেল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাদী সামিউল খান কোরাল রীফ প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম, প্রতিষ্ঠানের ইনচার্জ জামাল উদ্দিনসহ তাদের আত্মীয়-স্বজনসহ মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের মূল চুক্তির পাশাপাশি ২০১৯ ও ২০২০ সালে জমির মালিকদের সঙ্গে কোরাল রীফের দুটি সম্পূরক চুক্তি হলেও তাতে জমির মালিক আমজাদ খান, আসিফ খান ও আসাদ খানের কোনো স্বাক্ষর ছিল না। তবুও তাদের নাম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি ফ্ল্যাট, পার্কিংসহ বিভিন্ন সম্পত্তি হস্তান্তর অব্যাহত রাখে। একই সঙ্গে উল্লিখিত তিন মালিককে তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ডিজিটাল জরিপে দেখা গেছে, একেকটি ফ্ল্যাটের আকার ভিন্ন ভিন্ন এবং চুক্তিতে দোকানের উল্লেখ না থাকলেও সেখানে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া বাদী ও তার পিতাকে মারধরের অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, কোরাল রীফ প্রপার্টিজও জমির পাঁচজন মালিককে বিবাদী করে পৃথক একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলার তদন্তেও সিএমপির ডিবি (বন্দর-পশ্চিম) বিভাগ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৬ এ ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে দায়ের করা ওই মামলায় কোরাল রীফের পক্ষ থেকে জমির মালিকদের বিরুদ্ধে ১৫টি ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগ আনা হলেও তদন্তে তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং তদন্তে উল্টো প্রমাণ মিলেছে যে, কোরাল রীফ প্রপার্টিজ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেড় কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়ে গড়িমসি করেছে। এ ছাড়া আবাসিক ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও সেখানে ‘হোটেল অ্যান্ড সুইটমিট’ হিসেবে পরিকল্পনা অনুমোদন নেওয়া হয়েছে ও দোকান, পার্কিংসহ একাধিক ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সামিউল খান বলেন, আমাদের ভবনের প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাটেই কোরাল রীফ প্রপার্টিজ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে পরে লাপাত্তা হয়ে যায়। তারা অনেক ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছে। আমাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ তো দেয়ইনি, বরং পুরো ভবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এছাড়া, কক্সবাজারের বেস্ট ওয়েস্টার্ন হ্যারিটেজ হোটেলে দুটি ফ্ল্যাট বিক্রির কথা বলে আমার বাবার কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। সেখানেও তারা মূল্য নিয়ে প্রতারণা করেছে। কোনো মুনাফা তো দূরের কথা, মূল টাকাটিও ফেরত দেয়নি।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সিডিএ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলে সংস্থাটি একটি নোটিশ জারি করে। তবে পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কোরাল রীফ প্রপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
























