Dhaka , Wednesday, 4 March 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
দুর্গাপুরে ২য় বারের মতো শুরু হচ্ছে হিফজুল কুরআন হামদ-নাত ও আজান প্রতিযোগিতা রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উচ্ছেদ অভিযান চট্টগ্রামকে ক্লিন-গ্রিন সিটি হিসেবে গড়তে একযোগে কাজ করতে হবে: মেয়র ডা. শাহাদাত সাংবাদিক নেতা মো. আইয়ুব আলীর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের শোক আগামী দিনে কাজের মধ্য দিয়ে প্রমান করব, মেয়র মজিবুর রহমান বেনাপোল দিয়ে দেশে ফিরল সাবেক এমপি জোয়াহেরুল ইসলামের মরদেহ আদ্-দ্বীন হাসপাতালে অত্যাধুনিক সিটি স্ক্যান মেশিন উদ্বোধন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সুন্দরগঞ্জ  পৌর এলাকায় ডাষ্টবিন বিতরণ  আমতলীতে সাংবাদিকের চাঁদা দাবী। গণধোলাইয়ের পর পুলিশে সোপর্দ। এমপির নির্দেশ অমান্য করে ছেড়ে দিলেন পুলিশ সংরক্ষিত মহিলা আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চান টাঙ্গাইলের নাজমা পারভীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০৮ কেজি গাঁজাসহ মাইক্রোবাস আটক সাঘাটায় মাদক সেবনকারীকে ৬ মাসের  কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমান আদালত    নোয়াখালীতে ৫ মাদকসেবীকে কারাদণ্ড নোয়াখালীতে ৫ মাদকসেবীকে কারাদণ্ড চবিতে ফ্যাসিস্টের দোসর সাইদ হোসেন এর বিতর্কিত পদোন্নতি : প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন বেতাগী মেয়ার হাট বাজারে পাবলিক টয়লেট দখল করে ছাগলের ঘর-প্রশাসনের অভিযানে উদ্ধার  কোস্ট গার্ডের অভিযানে অস্ত্রসহ বনদস্যু আটক বেতাগীতে (বিএনপি) দুই দফা আনন্দ মিছিল:-চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি আদিতমারীতে পলাশী ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিতআদিতমারীতে পলাশী ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উচ্ছেদ অভিযান  রায়পুরে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান: ২৪ হাজার টাকা জরিমানা। দুর্গাপুর সাংবাদিক সমিতির আহবায়ক কমিটি গঠন পাইকগাছা পৌরসভা বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে পৌর প্রশাসক পাইকগাছায় মৎস্য লীজ ঘের নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে উত্তেজনা গাজীপুরে ইয়াবাসহ ৯ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লুটপাটের শিকার কারখানা মালিকের সংবাদ সম্মেলন পতাকা বিধিমালার তোয়াক্কা নেই লালমনিরহাট খামারবাড়িতে; নিয়ম জানেন না খোদ উপ-পরিচালক! ভঙ্গুর সংযোগ সড়কে মরণফাঁদ: মোগলহাটে ৬৯ লাখ টাকার সেতুতে জনভোগান্তি চরমে রামগঞ্জে সন্ধ্যার পর কোন শিক্ষার্থী বাহিরে থাকতে পারবে না শাহাদাত হোসেন সেলিম এমপি ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে আকাশপথে অচলাবস্থা, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ আটকা কয়েক হাজার যাত্রী

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচশ বছরের পুরনো” নবরত্ন মুন্দির”

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 05:47:58 pm, Monday, 12 December 2022
  • 207 বার পড়া হয়েছে

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচশ বছরের পুরনো" নবরত্ন মুন্দির"

মোঃ সৌরভ হোসাইন (সবুজ)

স্টাফ রিপোর্টার সিরাজগঞ্জ।।

 

সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গ্রামে অবস্থিত নবরত্ন মন্দিরটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবরত্ন মন্দির। এ মন্দির কে ঘিরে গড়ে উঠেছে আরো তিনটি মন্দির।
বাংলার ইতিহাস গ্রন্থের প্রণেতা কালীপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায়ের মতে, ‘ইহা অবিকল দিনাজপুরের কান্তনগরের কান্তজী বিগ্রহের মন্দিরের আদর্শে নির্মিত। যাঁহারা উক্ত কান্তজীর মন্দিরের চিত্র দেখিয়াছেন,তাঁহারা এই মন্দিরের নির্মাণ কৌশল ও কারুকার্যের গুরুত্ব উপলদ্ধি করিতে পারিবেন’।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে অবস্থিত নবরত্ন মন্দিরটি একটি উঁচু বেদীর উপর নবরত্ন পরিকল্পনায় নির্মিত। মন্দিরের প্রতিটি বাহু ১৫.৪ মিটার দীর্ঘ এবং বর্তমানে ১৩.২৫ মিটার উঁচু। ক্রমহ্রাসমান তিনতলা বিশিষ্ট এ মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে “দোলমঞ্চ”নামে পরিচিত। মন্দিরের উপরের রত্ন বা চূড়াগুলো অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। নীচ তলায় ২(দুই) টি বারান্দা বেষ্টিত একটি গর্ভগৃহ আছে। এর বারান্দার বাইরের দিকে ৭ (সাত) টি এবং ভিতরের দিকে ৫ (পঁাচ) টি খিলান প্রবেশ পথ রয়েছে।
গর্ভগৃহের পূর্ব এবং দক্ষিণ দিকে ২(দুই)টি প্রবেশ পথ রয়েছে। মন্দিরের দ্বিতীয় তলায় বারান্দা নেই। মন্দিরটি ইট, চুন, সুরকির মসলা দিয়ে নির্মিত। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবরত্ন মন্দির। মূল অবস্থায় মন্দিরটি পোড়ামাটির চিত্রফলক দ্বারা সজ্জিত ছিল। এখনও মন্দির গাত্রে সামান্য কিছু চিত্র ফলকের চিহ্ণ পরিলক্ষিত হয়। মন্দিরটির ছাদ প্রান্ত আংশিক বাঁকানো। যে স্তম্ভ গুলোর মাধ্যমে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে তার প্রতিটি স্তম্ভের দৈঘর্য ১৫.৪ মিটার ও প্রস্থ ১৩.২৫ মিটার। মন্দিরটি ৭ (সাত)টি বারান্দা ও ৫(পাঁচ)টি দরজার সমন্বয়ে গঠিত। নবরত্ন মন্দিরের পাশাপাশি আরও তিনটি মন্দির রয়েছে। এ মন্দিরের কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি। তবে পাঠজাত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে রামনাথ ভাদুড়ী নামের জনৈক তহসীলদার ১৭০৪-১৭২৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এটি নির্মাণ করেছিলেন। নবরত্ন নামটি এসেছে মন্দিরের উপর বসানো নয়টি চূড়া থেকে। যেগুলো বর্তমানে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
উইকিপিডিয়ার সূত্র থেকে অবশ্য ভিন্ন তথ্য জানা যায়। সে তথ্যানুসারে, নবরত্ন মন্দিরটি আবিষ্কারের সময় এখানে কোনো শিলালিপির অস্তিত্ব ছিলো না বলে এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি অনুসারে, মন্দিরটি ১৬৬৪ সালের দিকে রামনাথ ভাদুড়ী নামে স্থানীয় এক জমিদার নির্মাণ করেছিলেন।
রাধারমণ সাহার লিখিত ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ বই থেকে জানা যায়, রামনাথ ভাদুড়ী মুর্শিদাবাদে নায়েব দেওয়ান ছিলেন।
নবাব মুর্শিদকুলি খাঁনের সময়ে খাজনা আদায়ে কঠোর নিয়ম প্রচলিত ছিল। খাজনা আদায়ে ত্রুটি হলে জমিদারগণ অশেষ প্রকারের লাঞ্চিত ও অপমানিত হতেন। কিস্তিমত খাজনা না দিতে পারলে জমিদারি নিলাম হতো। তা দ্বারা বাকি খাজনা আদায় না হলে, জমিদার কে ধরে এনে নানা প্রকার কষ্ট দিয়ে বাকি টাকা আদায় করা হতো। বাংলার ইতিহাসে এর নাম “বৈকুণ্ঠবাস”।
মুর্শিদকুলি খাঁন রাজস্ব আদায়ে দৃঢ়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে ছোটবড় সকল জমিদারগণই রাজস্ব বাকি রাখতে সাহসী হতো না। দিনাজপুর রাজের রাজস্ব বাকি পড়লে রামনাথ ভাদুড়ীর উপর আদায়ের ভার অর্পিত হয়। তিনি দিনাজপুর উপস্থিত হলে, সে সময়ের দিনাজপুরের মহারাজ একযোগে সমূদয় অর্থ পরিশোধে অসমর্থ হয়ে,নবাবের অত্যাচারের হাত হতে মুক্তি লাভের জন্য এবং বকেয়া রাজস্ব পরিশোধের কিছু সময় চেয়ে রামনাথ ভাদুড়ী কে বহু অর্থ দিয়ে বিদায় করেন। তখনও দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দিরের নির্মাণ কাজ চলছিল।
রামনাথ ভাদুড়ী কান্তজীর মন্দির দর্শন করে প্রীত ও মুগ্ধ হয়ে, আশাতিরিক্ত প্রাপ্ত উৎকোচের টাকায় নিজ বাড়িতে বিচিত্র কারুকাজ খচিত অনুরুপ দেবালয় নির্মাণ করার ইচ্ছায়, সেখান থেকে মজুর ও কারিগর এনে আলেচিত নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করেন।
অবশ্য ভিন্ন একটি মতও প্রচলিত রয়েছে এরুপ, রামনাথ ভাদুড়ী দিনাজপুরের তৎকালীন রাজা প্রাণনাথের বন্ধু ছিলেন। ভাদুড়ী তার বন্ধুকে তার রাজ্যের রাজস্ব পরিশোধে একবার সাহায্য করেছিলেন। তারই ফলস্বরুপ প্রাণনাথ দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দিরের আদলে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে এই মন্দির নির্মাণ করে দেন।
তবে নির্মাণকাল ও অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে যতই মতভেদ থাকুক, নবরত্ন মন্দিরের নির্মাতা রামনাথ ভাদুড়ী এবং কান্তজীর মন্দিরের নির্মাণশৈলী আদলে নির্মিত এ নিয়ে সব ইতিহাসবিদ একমত পোষন করে থাকেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মন্দিরটিতে স্থায়ী কোন বিগ্রহ স্থাপিত হয়নি। তবে দোল উৎসবে রাধাকৃষ্ণ ও গোপাল বিগ্রহ তৈরি করে পূজা অর্চনা করা হতো। হাজারো ভক্তবৃন্দের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠতো মন্দির প্রাঙ্গন। নবাবী আমলের পতনের সাথে সাথেই ভাদুড়ী বংশেরও উজ্জ্বল্য কমতে থাকে। কালেরধূলায় একে একে নিভতে থাকে নবরত্ন দেউলের দেউটি। ক্রমান্বয়ে পরিত্যক্ত হয়ে পরে আলোচিত পূরাকীর্তি। জৌলস হারিয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পরে মন্দিরটি। মন্দিরের গায়ে বটপাকুরের গাছ জন্মে ফাটল ধরায়। পরিণত হয় এক জঙ্গলময় স্থানে।
বাংলা ১৩০৪ সালের ৩০ জ্যৈষ্ঠ তারিখে বেলা পাঁচটার সময় প্রবল ভূমিকম্পে সিরাজগঞ্জের প্রসিদ্ধ জুটমিল একেবারে বিনষ্ট হয়ে যায়। ইলিয়ট ব্রিজ বেঁকে যায়, যমুনানদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। সেই সাথে দেবে যায় হাটিকুমরুলের নবরত্ন মন্দিরটিও। চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায় নবরত্নের নয়টি চূড়া।
ব্রিটিশ শাসনামলে সিরাজগঞ্জ মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট মি. বিটসন বেল সাহেব নবরত্ন মন্দির রক্ষায় প্রচেষ্টা চালায়, যেনো কেউ এই প্রত্নকীর্তিটি ধ্বংস করতে না পারে। এ বিষয়ে তিনি তার প্রশাসন কে কড়া নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। যারফলে আশু ধ্বংসের হাত থেকে মন্দিরটি রক্ষা পায়। তা না হলে পুরাকীর্তির ইটপাথর খুলে নেয়ার বাঙালির যে স্বভাব, তাতে সে সময়ই নিশ্চিহ্ণ হয়ে যেতো নবরত্ন মন্দিরটি।
নবরত্ন মন্দির সংলগ্ন বাসিন্দা শংকর রায় বলেন, তাদের বাড়ি এক সময় নবরত্নের আঙ্গিনায় ছিলো। সরকার অধিগ্রহন করে তাদের কে পূণর্বাসন করে দিয়েছে। চারিদিকে প্রাচীর নির্মাণ করায় ঐতিহাসিক এ প্রত্নকীর্তিটি সুরক্ষিত হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পর্যটক-দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন।
নবরত্ন মন্দিরের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্ত কর্তৃক নিয়োগকৃত নিরাপত্তা কর্মী মহব্বত হোসেন বলেন, ১৯৭২ সালে মন্দিরটি প্রাচীন পূরাকীর্তি হিসেবে তালিকা ভূক্ত হয়। আশির দশকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক মন্দিরটি সংষ্কার করা হয়। ২০০৮ সালে পুণরায় মন্দিরটি সংষ্কার করে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সেই থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা মন্দিরটি দেখতে আসেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাস্টোডিয়ান মো: আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল জানান, উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। টয়লেট, গেস্টহাউস ও গাড়ি পার্কিং সহ অন্যান্য কার্যক্রম করার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখিত কাজগুলো সমাপ্ত হলে দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা হবে। এত করে সরকারের এখান থেকে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। নবরত্ন মন্দির সংলগ্ন ও কিছুটা দুরে আরো তিনটি মন্দির রয়েছে । ইতোমধ্যেই দোচালা ও একচূড়া বিশিষ্ট মন্দির দুটি সংষ্কার করা হয়েছে। শিব মন্দিরটি রাসায়নিক পরীক্ষা সমাপ্ত করা হয়েছে। এখানে সীমানা প্রাচীর করা প্রয়োজন। এরজন্য আরো কিছু জমি অধিগ্রহণ করা দরকার ।
এ কারণে এলাকাবাসীর দাবি উল্লেখিত কার্যক্রম দু্রত বাস্তবায়ন করা হলে, হাজারো দর্শনার্থীর ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠবে নবরত্ন প্রঙ্গন। হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে প্রাচীন এ প্রত্ননগরী।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপুরে ২য় বারের মতো শুরু হচ্ছে হিফজুল কুরআন হামদ-নাত ও আজান প্রতিযোগিতা

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচশ বছরের পুরনো” নবরত্ন মুন্দির”

আপডেট সময় : 05:47:58 pm, Monday, 12 December 2022

মোঃ সৌরভ হোসাইন (সবুজ)

স্টাফ রিপোর্টার সিরাজগঞ্জ।।

 

সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গ্রামে অবস্থিত নবরত্ন মন্দিরটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবরত্ন মন্দির। এ মন্দির কে ঘিরে গড়ে উঠেছে আরো তিনটি মন্দির।
বাংলার ইতিহাস গ্রন্থের প্রণেতা কালীপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায়ের মতে, ‘ইহা অবিকল দিনাজপুরের কান্তনগরের কান্তজী বিগ্রহের মন্দিরের আদর্শে নির্মিত। যাঁহারা উক্ত কান্তজীর মন্দিরের চিত্র দেখিয়াছেন,তাঁহারা এই মন্দিরের নির্মাণ কৌশল ও কারুকার্যের গুরুত্ব উপলদ্ধি করিতে পারিবেন’।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে অবস্থিত নবরত্ন মন্দিরটি একটি উঁচু বেদীর উপর নবরত্ন পরিকল্পনায় নির্মিত। মন্দিরের প্রতিটি বাহু ১৫.৪ মিটার দীর্ঘ এবং বর্তমানে ১৩.২৫ মিটার উঁচু। ক্রমহ্রাসমান তিনতলা বিশিষ্ট এ মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে “দোলমঞ্চ”নামে পরিচিত। মন্দিরের উপরের রত্ন বা চূড়াগুলো অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। নীচ তলায় ২(দুই) টি বারান্দা বেষ্টিত একটি গর্ভগৃহ আছে। এর বারান্দার বাইরের দিকে ৭ (সাত) টি এবং ভিতরের দিকে ৫ (পঁাচ) টি খিলান প্রবেশ পথ রয়েছে।
গর্ভগৃহের পূর্ব এবং দক্ষিণ দিকে ২(দুই)টি প্রবেশ পথ রয়েছে। মন্দিরের দ্বিতীয় তলায় বারান্দা নেই। মন্দিরটি ইট, চুন, সুরকির মসলা দিয়ে নির্মিত। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নবরত্ন মন্দির। মূল অবস্থায় মন্দিরটি পোড়ামাটির চিত্রফলক দ্বারা সজ্জিত ছিল। এখনও মন্দির গাত্রে সামান্য কিছু চিত্র ফলকের চিহ্ণ পরিলক্ষিত হয়। মন্দিরটির ছাদ প্রান্ত আংশিক বাঁকানো। যে স্তম্ভ গুলোর মাধ্যমে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে তার প্রতিটি স্তম্ভের দৈঘর্য ১৫.৪ মিটার ও প্রস্থ ১৩.২৫ মিটার। মন্দিরটি ৭ (সাত)টি বারান্দা ও ৫(পাঁচ)টি দরজার সমন্বয়ে গঠিত। নবরত্ন মন্দিরের পাশাপাশি আরও তিনটি মন্দির রয়েছে। এ মন্দিরের কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি। তবে পাঠজাত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে রামনাথ ভাদুড়ী নামের জনৈক তহসীলদার ১৭০৪-১৭২৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এটি নির্মাণ করেছিলেন। নবরত্ন নামটি এসেছে মন্দিরের উপর বসানো নয়টি চূড়া থেকে। যেগুলো বর্তমানে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
উইকিপিডিয়ার সূত্র থেকে অবশ্য ভিন্ন তথ্য জানা যায়। সে তথ্যানুসারে, নবরত্ন মন্দিরটি আবিষ্কারের সময় এখানে কোনো শিলালিপির অস্তিত্ব ছিলো না বলে এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি অনুসারে, মন্দিরটি ১৬৬৪ সালের দিকে রামনাথ ভাদুড়ী নামে স্থানীয় এক জমিদার নির্মাণ করেছিলেন।
রাধারমণ সাহার লিখিত ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ বই থেকে জানা যায়, রামনাথ ভাদুড়ী মুর্শিদাবাদে নায়েব দেওয়ান ছিলেন।
নবাব মুর্শিদকুলি খাঁনের সময়ে খাজনা আদায়ে কঠোর নিয়ম প্রচলিত ছিল। খাজনা আদায়ে ত্রুটি হলে জমিদারগণ অশেষ প্রকারের লাঞ্চিত ও অপমানিত হতেন। কিস্তিমত খাজনা না দিতে পারলে জমিদারি নিলাম হতো। তা দ্বারা বাকি খাজনা আদায় না হলে, জমিদার কে ধরে এনে নানা প্রকার কষ্ট দিয়ে বাকি টাকা আদায় করা হতো। বাংলার ইতিহাসে এর নাম “বৈকুণ্ঠবাস”।
মুর্শিদকুলি খাঁন রাজস্ব আদায়ে দৃঢ়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে ছোটবড় সকল জমিদারগণই রাজস্ব বাকি রাখতে সাহসী হতো না। দিনাজপুর রাজের রাজস্ব বাকি পড়লে রামনাথ ভাদুড়ীর উপর আদায়ের ভার অর্পিত হয়। তিনি দিনাজপুর উপস্থিত হলে, সে সময়ের দিনাজপুরের মহারাজ একযোগে সমূদয় অর্থ পরিশোধে অসমর্থ হয়ে,নবাবের অত্যাচারের হাত হতে মুক্তি লাভের জন্য এবং বকেয়া রাজস্ব পরিশোধের কিছু সময় চেয়ে রামনাথ ভাদুড়ী কে বহু অর্থ দিয়ে বিদায় করেন। তখনও দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দিরের নির্মাণ কাজ চলছিল।
রামনাথ ভাদুড়ী কান্তজীর মন্দির দর্শন করে প্রীত ও মুগ্ধ হয়ে, আশাতিরিক্ত প্রাপ্ত উৎকোচের টাকায় নিজ বাড়িতে বিচিত্র কারুকাজ খচিত অনুরুপ দেবালয় নির্মাণ করার ইচ্ছায়, সেখান থেকে মজুর ও কারিগর এনে আলেচিত নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করেন।
অবশ্য ভিন্ন একটি মতও প্রচলিত রয়েছে এরুপ, রামনাথ ভাদুড়ী দিনাজপুরের তৎকালীন রাজা প্রাণনাথের বন্ধু ছিলেন। ভাদুড়ী তার বন্ধুকে তার রাজ্যের রাজস্ব পরিশোধে একবার সাহায্য করেছিলেন। তারই ফলস্বরুপ প্রাণনাথ দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দিরের আদলে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে এই মন্দির নির্মাণ করে দেন।
তবে নির্মাণকাল ও অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে যতই মতভেদ থাকুক, নবরত্ন মন্দিরের নির্মাতা রামনাথ ভাদুড়ী এবং কান্তজীর মন্দিরের নির্মাণশৈলী আদলে নির্মিত এ নিয়ে সব ইতিহাসবিদ একমত পোষন করে থাকেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মন্দিরটিতে স্থায়ী কোন বিগ্রহ স্থাপিত হয়নি। তবে দোল উৎসবে রাধাকৃষ্ণ ও গোপাল বিগ্রহ তৈরি করে পূজা অর্চনা করা হতো। হাজারো ভক্তবৃন্দের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠতো মন্দির প্রাঙ্গন। নবাবী আমলের পতনের সাথে সাথেই ভাদুড়ী বংশেরও উজ্জ্বল্য কমতে থাকে। কালেরধূলায় একে একে নিভতে থাকে নবরত্ন দেউলের দেউটি। ক্রমান্বয়ে পরিত্যক্ত হয়ে পরে আলোচিত পূরাকীর্তি। জৌলস হারিয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পরে মন্দিরটি। মন্দিরের গায়ে বটপাকুরের গাছ জন্মে ফাটল ধরায়। পরিণত হয় এক জঙ্গলময় স্থানে।
বাংলা ১৩০৪ সালের ৩০ জ্যৈষ্ঠ তারিখে বেলা পাঁচটার সময় প্রবল ভূমিকম্পে সিরাজগঞ্জের প্রসিদ্ধ জুটমিল একেবারে বিনষ্ট হয়ে যায়। ইলিয়ট ব্রিজ বেঁকে যায়, যমুনানদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। সেই সাথে দেবে যায় হাটিকুমরুলের নবরত্ন মন্দিরটিও। চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায় নবরত্নের নয়টি চূড়া।
ব্রিটিশ শাসনামলে সিরাজগঞ্জ মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট মি. বিটসন বেল সাহেব নবরত্ন মন্দির রক্ষায় প্রচেষ্টা চালায়, যেনো কেউ এই প্রত্নকীর্তিটি ধ্বংস করতে না পারে। এ বিষয়ে তিনি তার প্রশাসন কে কড়া নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। যারফলে আশু ধ্বংসের হাত থেকে মন্দিরটি রক্ষা পায়। তা না হলে পুরাকীর্তির ইটপাথর খুলে নেয়ার বাঙালির যে স্বভাব, তাতে সে সময়ই নিশ্চিহ্ণ হয়ে যেতো নবরত্ন মন্দিরটি।
নবরত্ন মন্দির সংলগ্ন বাসিন্দা শংকর রায় বলেন, তাদের বাড়ি এক সময় নবরত্নের আঙ্গিনায় ছিলো। সরকার অধিগ্রহন করে তাদের কে পূণর্বাসন করে দিয়েছে। চারিদিকে প্রাচীর নির্মাণ করায় ঐতিহাসিক এ প্রত্নকীর্তিটি সুরক্ষিত হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পর্যটক-দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন।
নবরত্ন মন্দিরের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্ত কর্তৃক নিয়োগকৃত নিরাপত্তা কর্মী মহব্বত হোসেন বলেন, ১৯৭২ সালে মন্দিরটি প্রাচীন পূরাকীর্তি হিসেবে তালিকা ভূক্ত হয়। আশির দশকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক মন্দিরটি সংষ্কার করা হয়। ২০০৮ সালে পুণরায় মন্দিরটি সংষ্কার করে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সেই থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা মন্দিরটি দেখতে আসেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাস্টোডিয়ান মো: আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল জানান, উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। টয়লেট, গেস্টহাউস ও গাড়ি পার্কিং সহ অন্যান্য কার্যক্রম করার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখিত কাজগুলো সমাপ্ত হলে দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা হবে। এত করে সরকারের এখান থেকে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। নবরত্ন মন্দির সংলগ্ন ও কিছুটা দুরে আরো তিনটি মন্দির রয়েছে । ইতোমধ্যেই দোচালা ও একচূড়া বিশিষ্ট মন্দির দুটি সংষ্কার করা হয়েছে। শিব মন্দিরটি রাসায়নিক পরীক্ষা সমাপ্ত করা হয়েছে। এখানে সীমানা প্রাচীর করা প্রয়োজন। এরজন্য আরো কিছু জমি অধিগ্রহণ করা দরকার ।
এ কারণে এলাকাবাসীর দাবি উল্লেখিত কার্যক্রম দু্রত বাস্তবায়ন করা হলে, হাজারো দর্শনার্থীর ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠবে নবরত্ন প্রঙ্গন। হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে প্রাচীন এ প্রত্ননগরী।