
শওকত আলম, ককসবাজার,
বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়ন দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, পর্যটক নিরাপত্তা ও মানবিক সেবায় অসাধারণ ভূমিকা রেখে চলেছে। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে তাদের কার্যক্রমে অর্জিত সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
গত নয় মাসে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ ৩৪ জন ছিনতাইকারী, ৪৪ জন ভাসমান অপরাধী, ১০ জন ইভটিজারসহ মোট ৯১ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া ১৬৭ জন হারিয়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ২৮টি মোবাইল ফোন, ২০ জনের মৃতদেহ ও ১৫ জন জীবিত ব্যক্তিকে।
একই সময়ে ১৮১টি সিআর মামলার মধ্যে ১৪০টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং ৪১টি মামলা চলমান। পাশাপাশি ১৬টি জিআর মামলার মধ্যে ১১টি নিষ্পত্তি হয়েছে (৭টি চার্জশিট ও ৪টি এফআরটি) এবং ৫টি এখনো বিচারাধীন।
উল্লেখযোগ্য অভিযান ও মানবিক উদ্যোগ
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের গত এক বছরের কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে—
ছিনতাই হওয়া পর্যটকের হারানো ১০,৫০০ টাকা ও আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স উদ্ধার করে জড়িত ৫ আসামিকে গ্রেফতার ও আদালতে স্বীকারোক্তি প্রদান।
রাশিয়ান পর্যটক মনিকা কবির-এর হারানো ব্যাগ মাত্র দুই দিনের মধ্যে উদ্ধার ও ফেরত প্রদান।
১৭টি পর্যটক হয়রানির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
মিথ্যা অপহরণের নাটক সাজিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টাকারী একজনকে আটক।
হারিয়ে যাওয়া শিশু, প্রেমিক যুগল ও প্রতারণার শিকার নারীদের উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর।
টিকটকে সৈকতে গোসলরত পর্যটকের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এক ব্যক্তিকে আটক।
লাইটহাউজ এলাকায় অসামাজিক কার্যক্রম বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ১৩ জন নারী-পুরুষকে আটক।
স্পা সেন্টার, বিচ এলাকা ও কবিতা চত্বর এলাকায় অসামাজিক কার্যক্রমবিরোধী অভিযান।
মারমেইড বিচ রিসোর্টের বেআইনি সম্প্রসারণ উচ্ছেদ ও সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি।
পরিবেশ রক্ষায় বিচে বিন সরবরাহ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
১৯০ পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেফতার ও মামলা রুজু।
কক্সবাজারের জিনিয়া ও কক্স ভ্যালি হোটেলের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
নারী নেতৃত্বে সাফল্য
পর্যটন সেবায় অসাধারণ অবদান রাখায় ট্যুরিস্ট পুলিশের দুই নারী সদস্য “উইমেন ট্যুরিজম লিডার অ্যাওয়ার্ড” অর্জন করেছেন। এছাড়া পর্যটকদের সুবিধার্থে ট্যুরিস্ট পুলিশ সার্ভিস সেন্টার স্থাপন ও ১০টি হুইলচেয়ার প্রদানসহ সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
পর্যটক ও স্থানীয়দের প্রশংসা
ঢাকার পর্যটক লায়লা রহমান বলেন, “আগে সৈকতে সন্ধ্যার পর বের হতে ভয় লাগতো, এখন দেখি পুলিশ টহল দেয় ও সাহায্য করে— এতে কক্সবাজারে আসা অনেক বেশি নিরাপদ মনে হয়।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিবুল হক বলেন, “আমার এক বন্ধু মোবাইল হারিয়ে ফেলেছিল, ট্যুরিস্ট পুলিশ আধঘণ্টার মধ্যে সেটি উদ্ধার করে দেয়— সত্যিই অবাক করার মতো তৎপরতা।”
স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “ট্যুরিস্ট পুলিশের কারণে এখন আমাদের এলাকাটা শান্ত, পর্যটকরাও নির্ভয়ে ঘুরছেন, ব্যবসাও ভালো হচ্ছে।”
পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন,
“পর্যটকবান্ধব কক্সবাজার গড়ে তোলা আমাদের অঙ্গীকার। ট্যুরিস্ট পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়— আমরা সচেতনতা, সহযোগিতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে নিরাপত্তা সংস্কৃতি তৈরিতে কাজ করছি। পর্যটক যেন ভয়হীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারেন, সংকটে সাহায্য পান— সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন, “কক্সবাজার এখন আন্তর্জাতিকমানের পর্যটনগন্তব্য, এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সেই মান অনুযায়ী উন্নত করা হচ্ছে। জনগণের আস্থা অর্জনই আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা।”
পর্যটন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশের সাফল্য কেবল অপরাধ দমনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি মানবিক, আধুনিক ও সেবামুখী পুলিশিং মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। হারানো শিশু উদ্ধার থেকে শুরু করে বিদেশি পর্যটকদের সহায়তা— সব ক্ষেত্রেই তাদের কার্যকর ভূমিকা পর্যটকদের আস্থা বাড়িয়েছে এবং পর্যটন ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে।

























