
মাহবুবুর রহমান (শান্ত)
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরপরই মেঘনা আলম আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য, জনসভা, পাড়া-মহল্লার ছোট সমাবেশ এবং বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রচারণা ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। শুরু থেকেই তাঁর প্রচারণার মূল সুর স্পষ্ট, রাজনীতি হতে হবে জনগণের জন্য, জনগণের সঙ্গে এবং জনগণকে নিয়েই।
নির্বাচনী প্রচারণার সূচনালগ্নে দেওয়া বক্তব্যগুলোতে মেঘনা আলম বারবার বলেছেন, একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব কেবল সংসদে উপস্থিত থাকা বা আইন পাসে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণের দৈনন্দিন সমস্যা, বঞ্চনা ও উদ্বেগকে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে তুলে ধরাই একজন জনপ্রতিনিধির প্রধান কাজ। তাঁর ভাষায়, সংসদ হতে হবে জনগণের কণ্ঠস্বর, ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর একচেটিয়া মঞ্চ নয়।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের আস্থাহীনতার বিষয়টি তাঁর প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন সভায় তিনি উল্লেখ করেছেন, বহু মানুষ আজ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, কারণ তারা মনে করেন, তাদের কথা কেউ শোনে না। বিশেষ করে তরুণ, নারী, শ্রমজীবী মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই হতাশা গভীর। মেঘনা আলম এই আস্থাহীনতাকেই তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে তিনি নিয়মিত গণশুনানি, খোলা বৈঠক এবং ডিজিটাল মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবেন।
অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি তাঁর প্রচারণার অন্যতম প্রধান ইস্যু। সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে তিনি বলেছেন, উন্নয়ন মানে শুধু বড় প্রকল্প বা অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের উন্নতি। নিত্যপণ্যের দাম, কর্মসংস্থানের সংকট, অনিশ্চিত আয়, এসব সমস্যা সাধারণ মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সংসদে এসব বিষয় জোরালোভাবে উত্থাপন করবেন এবং নীতিগতভাবে সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায্য বণ্টনের পক্ষে অবস্থান নেবেন।
তরুণ সমাজ ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে মেঘনা আলম তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ আজ বেকারত্ব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা দূর না করলে এই সংকট আরও বাড়বে। তিনি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, সরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং যুবকদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, তরুণদের ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো সমাজই এগোতে পারে না।
নারী অধিকার ও নিরাপত্তা তাঁর প্রচারণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি নারী নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং ন্যায়বিচারে নারীদের প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। মেঘনা আলম মনে করেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কেবল প্রতীকী হলে চলবে না; নীতিনির্ধারণে নারীর বাস্তব ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও তাঁর প্রচারণায় স্পষ্ট অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং বেসরকারি খাতের অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার। নির্বাচিত হলে তিনি স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি, সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য সংসদে সোচ্চার ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
পরিবেশ ও স্থানীয় সমস্যা নিয়েও মেঘনা আলমের বক্তব্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা, দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি নিয়ে তিনি বলেছেন, এসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকেছে। তাঁর মতে, টেকসই উন্নয়ন মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তিনি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
দুর্নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে মেঘনা আলমের বক্তব্য বেশ সরাসরি। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে। নির্বাচিত হলে তিনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতিতে অটল থাকার অঙ্গীকার করেছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে এককভাবে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন সহজ নয়, তবে নীতিগত অবস্থান থেকেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
প্রচারণার ধরনেও মেঘনা আলম একটি ভিন্ন ধারা অনুসরণ করছেন। বড় শোডাউন বা ব্যয়বহুল আয়োজনের বদলে তিনি ছোট পরিসরের সভা, সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন সংবাদপোর্টালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, তাঁর প্রচারণায় তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ও প্রথমবার ভোট দিতে আসা ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই মেঘনা আলমের সামনে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, এই দুইয়ের ভারসাম্যই তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তাঁর প্রচারণা ইতোমধ্যেই রাজনীতিতে জনগণের ভূমিকা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে এনেছে।
একটি সময়ে যখন বহু মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে, তখন মেঘনা আলমের নির্বাচনী প্রচারণা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, রাজনীতি যদি বদলাতে হয়, তবে তা জনগণকে কেন্দ্র করেই বদলাতে হবে।

























