Dhaka , Saturday, 7 March 2026
নিবন্ধন নাম্বারঃ ১১০, সিরিয়াল নাম্বারঃ ১৫৪, কোড নাম্বারঃ ৯২
শিরোনাম ::
দুর্গাপুর সাংবাদিক সমিতির ৩ সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা গ্যাস সংকটে ঘোড়াশাল-পলাশ সারকারখার উৎপাদন বন্ধ মিতালী বাজার এসএসসি ২০২০ ফাউন্ডেশনের মানবিক উদ্যোগ: ৫০টি সুবিধাবঞ্চিত পরিবার পেল রমজানের উপহার। রূপগঞ্জের মুরাপাড়ায় মাদকবিরোধী অভিযান, মাদক কারবারিদের কঠোর হুঁশিয়ারি কক্সবাজারের রামু থেকে জাল টাকার সরঞ্জামসহ ডিবির হাতে যশোরের এক যুবক আটক পাইকগাছায় সেই মৎস্য ঘের নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চরমে; বাঁধ কেটে দেওয়ার অভিযোগ খলিফা ওমরের আদর্শ অনুসরণ করে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবো: এমপি আবুল কালাম আজাদ কুলাউড়ায় কানাডা পাঠানোর নামে কোটি টাকার প্রতারণা বাহুবল–নবীগঞ্জ সার্কেলের এএসপি জহিরুল ইসলামের বদলি ইবি শিক্ষিকা হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুর রহমান গ্রেফতার মহাকালের এক অলৌকিক যুদ্ধের সাক্ষী বদরের প্রান্তর রামগঞ্জ প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটিকে জামাতের সংবর্ধনা ও ইফতার পার্টি অনুষ্ঠিত। চট্টগ্রামে ড্যাবের ইফতার মাহফিলে ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার তথ্যমন্ত্রীর সফরকে বানচাল করতে ফ্যাসিবাদী দোসরদের সার্কিট হাউজে মব সৃষ্টি কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট সীমান্তে ১৫ বিজিবি’র বড় সাফল্য: ১৪ লক্ষাধিক টাকার শাড়ি ও জিরা জব্দ লালমনিরহাটে তরুণ সমাজের আয়োজনে দোয়া ও ইফতার মাহফিলে তরুণদের সরব উপস্থিতি ছোট বোনকে কুপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় বড় বোনকে গলা কেটে হত্যা: রংপুরে র‍্যাবের জালে প্রধান আসামি কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট সীমান্তে ১৫ বিজিবি’র হানা: বিপুল পরিমাণ জিরা ও মাদক জব্দ লক্ষ্মীপুরে ঝগড়া থামাতে গিয়ে অটোরিকশা চালকের কিল-ঘুষিতে যুবদল নেতার মৃত্যু কক্সবাজারে মাদকবিরোধী অভিযানে ইয়াবা ও টাকাসহ গ্রেফতার ৩ শরীয়তপুরের জাজিরায় অনুমোদনহীন সেমাই কারখানায় অভিযান, ১ লাখ জরিমানা চট্টগ্রামে আলহাজ্ব শামসুল হক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ইন্টারকম সেবা উদ্বোধন রূপগঞ্জে মাদদ্রব্যসহ ৪ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার রামগঞ্জে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক সাংবাদিক মারাত্মক আহত রূপগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমির সীমানা নির্ধারণে মাঠ পরিদর্শন করলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। মাদক বিরোধী অভিযান রুপগঞ্জে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেপ্তার-৪ মাদক ব্যবসায়ী সীমান্তে ১৫ বিজিবি’র সাঁড়াশি অভিযান: দুই জেলায় বিপুল মাদক ও প্রসাধনী উদ্ধার পাইকগাছা পৌরসভায় জামায়াতের পরিচ্ছন্নতা অভিযান পাইকগাছায় প্রশাসনের উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যের বাজারের উদ্বোধন পাইকগাছায় গ্রাম আদালত বিষয়ক ত্রৈমাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

মহাকালের এক অলৌকিক যুদ্ধের সাক্ষী বদরের প্রান্তর

  • Reporter Name
  • আপডেট সময় : 12:39:09 pm, Saturday, 7 March 2026
  • 2 বার পড়া হয়েছে

মো: মোসাদ্দেক হোসেন
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

আচ্ছা কিছু সময়ের জন্য কল্পনা করুন, বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতায় বিখ্যাত পদার্থবিদ মাইকেল মরিস ও কিপ থোর্নের ট্র্যাভারসেবল ওয়ার্মহোল কিংবা টাইম ডায়ালেশনের কাল্পনিক জগৎ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। অতীত ভ্রমণের সফলতায় আপনি পৌঁছে গেছেন এই মুহুর্ত থেকে কয়েক সহস্র বছর আগের আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন এক সময়ে। যেখানে যাতায়াতের জন্য উচ্চগতিসম্পন্ন বাহন বলতে শুধুই ঘোড়া, যোগাযোগের সবচেয়ে উন্নত মাধ্যম হাতে লেখা পত্র, আর যুদ্ধের মারাত্মক মারণাস্ত্র বলতে তরবারি, ঢাল, তীর আর ধনুক।

এমনই এক সময়ে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক তপ্ত রণমঞ্চে। সামনে ধু-ধু মরুপ্রান্তর, যেখানে মুখোমুখি দুই পক্ষ। এক পক্ষে মাত্র কয়েকশ যোদ্ধা, যাদের সম্বল অতি নগণ্য। আর অন্য পক্ষে তৎকালীন প্রবল প্রতাপশালী এক বিশাল সুসজ্জিত বাহিনী। কী হবে এই যুদ্ধের ফলাফল? বড় এ পরাক্রমশালী বাহিনীর কাছে কি কচুকাটা হবে দুঃসাহসের শিখরে দাঁড়িয়ে থাকা এ ক্ষুদ্র বাহিনী? নাকি ভীষণ অকল্পনীয়, অস্বাভাবিক কিছু ঘটবে, যা মানব ইতিহাসে বিরলতার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে? চলুন আমরা আজ ইতিহাসের এমনই এক ঘটনার দর্শক হই।

রমজান যে শুধুই আত্মশুদ্ধি বা ঐশী বানী নাজিলের মাস তা কিন্তু নয় বরং এমাসেই এক অসামান্য যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে মুসলিম জাতি প্রথম তার অস্তিত্ব রক্ষায় ও ন্যায়, ইনসাফের পক্ষে নিজেদের অনড় অবস্থানের বার্তা দেয় পুরা বিশ্বে, যা আজও অনেকের অজানা!

মুসলিমদের এই ঐশ্বরিক জয়ের মাল্য গাঁথা শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ১৪০২ বছর আগে ২য় হিজরির ১৭ ই রমজান বা ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মার্চ দিনটি ছিল সোমবার, স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নেতৃত্বে ৩১৩ জন মুসলিম পদাতিক সৈন্য নিয়ে মুসলিমরা তাদের ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তৎকালীন কুরাইশের প্রবল প্রতাপশালী এক বিশাল সৈন্য বাহিনীর বিপরীতে।

আল্লাহর হাবিব, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে ফরিয়াদ করলেন,”ইয়া আল্লাহ! তুমি আমায় যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, আজ তা পূর্ণ করো। ইয়া আল্লাহ, যদি মুসলমানদের এই বাহিনী আজ নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে এই পৃথিবীতে তোমার উপাসনার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।”

পরম প্রিয় হাবিব তার বন্ধুর কাছে যেই সাহায্যের স্বরূপ ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ চাইলেন, তা কি বৃথা যেতে পারে? মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে আসমান থেকে জিবরাঈল (আ.) এর নেতৃত্বে ক্ষিপ্র গতিতে নেমে এলেন হাজার ফেরেশতার এক ঐশ্বরিক বাহিনী। শুরু হয়ে গেল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ,বদরের যুদ্ধ । কিন্তু শান্তির ও সম্প্রীতির প্রতিবিম্ব ইসলামের বানী প্রচারে আসা মুহাম্মদ (সা.) যিনি রহমাতুল্লিল আলামিন অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের জন্য যিনি রহমত ও সুপথের পথিকৃৎ তিনি কেন লিপ্ত হলেন এ রক্তক্ষয়ী, বিধ্বংসী আর সর্বগ্রাসী সংঘর্ষে? কি বলছেন ইতিহাসাজ্ঞরা, কিভাবেই বা ব্যাখ্যা করছেন তার এ স্ব-বৈপরীত্য? চলুন জানি একদম গোড়া থেকে।

আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হযরত ইব্রাহিম আ. তার পরম আরাধ্য সন্তান ঈসমাইল আ. কে নিয়ে মক্কা শহরে কাবা ঘর নির্মাণ করেছিলেন এক আল্লাহর উপাসনার জন্য।অথচ কালের পরিক্রমায় সব ভুলে খুব সামান্য সংখ্যক মানুষই আল্লাহকে মনে রাখলো। আর পবিত্র কাবা ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো পৌত্তলিকতার মহোৎসবের কেন্দ্রে, আর শেষ নবী সা. এর জামানায় এই মহোৎসবের অন্যতম আধিপত্যকারী নেতা ছিল দাম্ভিক আবু জাহেল।

৬১০ খ্রিস্টাব্দে ওহি প্রাপ্তির পর নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন তাওহীদের ডাক দিলেন, তখন এই এতিম মুহাম্মদ সা. এর কথায় অসংখ্য মানুষ সত্যের পথে ফিরতে লাগলো যাতে কুরাইশদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তখন নবীজি সা. কে তারা ক্ষমতা ও সম্পদের নানা প্রলোভন দেখালো যাতে তিনি সব বন্ধ করেন। কিন্ত তিনি সত্য প্রচারে ছিলেন অনড়, অবিচল। এরপর দীর্ঘ ১২ বছর ধরে রিসালাত পন্থীদের উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন, বয়কট ও হত্যাচেষ্টা। অবশেষে অস্তিত্ব রক্ষায় আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ সালে নবীজি (সা.) ও মুসলমানরা মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনা বা তৎকালীন ইয়াসরিবে হিজরত করেন। মক্কায় মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা রিফিউজি, মদিনায় এসে হয়ে উঠলেন এক অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়ক, রচনা করলেন পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ যার মাধ্যমে মদিনার বিভক্ত সম্প্রদায় গুলো ঐক্যবদ্ধ হলো। মুহাম্মদ সা. এর উদ্যোগে রচিত বিশ্ববিখ্যাত এই মদিনা সনদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে স্যার উইলিয়াম মুইর তার রচিত ‘দ্য লাইফ অফ মোহাম্মদ’ বইতে লেখেন: “It reveals the man in his real greatness. A mastermind, not only of his own age, but of all ages.”

অন্যদিকে,৬২২ সালে হিজরতের পর লুটেরা কুরাইশরা মক্কায় মুসলমানদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি, জমিজমা ও ব্যবসায়িক সব সম্পদ লুট ও মদিনায় মুসলমানদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে গুপ্তচর নিয়োগ করল।এরই ২ বছর পর ৬২৪ খ্রীস্টাব্দের শুরুতে মুসলিমরা খবর পায় ইসলামের কট্টর শত্রু মক্কান আবু সুফিয়ান লুন্ঠিত সম্পদ নিয়ে বানিজ্যের জন্য সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানরা আবু সুফিয়ানের এ বাণিজ্য কাফেলায় রেইডের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয় না মুসলমানদের, ধূর্ত আবু সুফিয়ান আগেই বিপদের আচঁ পেয়ে পথ বদলে তাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। এরই কিছুদিন পর ফের মদিনায় খবর আসে, আবু সুফিয়ান বাণিজ্য শেষ করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ে সিরিয়া থেকে ফিরছে। আবার মুসলমানরা মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে আধুরা কাজ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এখন এই জায়গায় অনেকের মনে প্রশ্ন আসবে, ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ খ্যাত নবীজি (সা.) কেন সংঘর্ষ বেছে নিয়ে বাণিজ্য কাফেলায় আক্রমণ করলেন?

পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের মাঝে এই রেইডের বৈধতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে, কিন্তু একটু বিবেক দিয়ে ভেবে বলুনতো, আপনি দেখছেন আপনার শত্রু আপনার সম্পদ লুট করে আপনার বাড়ির পাশ দিয়ে বাণিজ্য করতে যাচ্ছে, যেন সেই অর্থ ব্যবহার করে একটা বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তুলে আপনারই বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে, তখন আপনার হাত গুটিয়ে বসে থাকা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

এটি মুসলমানদের জন্য ছিল এক্সিস্টেন্সিয়াল থ্রেড বা অস্তিত্বের হুমকি। মূলত এই রেইড দেওয়ার পেছনের কারণ ছিল শক্তিশালী মক্কান কুরাইশদের ইকোনমিক্যালি দুর্বল করা, মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সম্পদ ফেরত নেওয়া এবং বৃহত্তর স্বার্থে মদিনায় নতুন রাষ্ট্র গঠনে সেই অর্থ ব্যবহার করা। আরেকটি বিষয় এটি ইসলামের একদম প্রারম্ভিক সময়ের ঘটনা। যখন মুসলিমরা বছরের পর বছর ধরে মজলুম ছিলেন। মক্কানদের তাই নিজেদের সক্ষমতা জানান দেওয়ার এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, যেন তারা ইসলামের বিরোধিতা করতে অতি উৎসাহী না হয়।

চলুন আবার ফিরে যাই মুসলিমদের দ্বিতীয় রেইডে, এবার মুহাম্মদ (সা.) ৩১৩ জন সহযোগী নিয়ে রেইডের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন এদিকে অতি সতর্ক আবু সুফিয়ান আবার বিপদের আভাস পেয়ে তার কাফেলার দ্রুততম চরের মাধ্যমে মক্কা থেকে সাহায্য চাইলেন। মক্কা পৌঁছানোর পূর্বেই চর নিজেকে নিজে ক্ষতবিক্ষত করে কুরাইশদের কাছে অতিরঞ্জিত খবর পৌঁছালো। হক চকিয়ে গেল মক্কাবাসী। আতঙ্কিত হয়ে আবু জাহেলরা ১৩০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রওনা হলো। এদিকে ধুর্ত আবু সুফিয়ান তার কাফেলা নিয়ে সমুদ্রের দিকে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল। এখন মুখোমুখি দুপক্ষ, শুরু হয়ে গেল বদরের যুদ্ধ।

কাফেলা নিরাপদ জেনে, ৩০০ জন ফিরে গেলেও, মুসলমানদের চিরতরে নিঃশেষ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি দাম্ভিক আবু জাহেল। ১০০০ জন সৈন্য নিয়ে সামনে এগোতে থাকলো সে।
এদিকে নবীজি (সা.) ও তাঁর ৩১৩ জন সাহাবী শুধুমাত্র কাফেলা আটকাতে এসেছিলেন, বিশাল বাহিনীর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তবে আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রেখে তাঁরা শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত হন। নবী থেকে মোহাম্মদ সাঃ হয়ে ওঠেন সমরনায়ক এবং সাথে থাকা ৩১৩ জন সাহাবী মুহূর্তেই হয়ে ওঠেন সহযোদ্ধা। তারা কেউ কেউ ছিল নিরস্ত্র আবার কেউ গাছের ডাল নিয়ে শুরু করলেন যুদ্ধ প্রস্তুতি । এমন সময় বদর প্রান্তরে নেমে এলো রহমতের বৃষ্টি। নবীজি (সা.) মুসলমানদের সুনিশ্চিত বিজয়ের সুসংবাদ দিলেন। সেনাপতি নবীজি (সা.) এর এক দুর্দান্ত কৌশল যুদ্ধ শুরু আগেই আবু জাহেলকে চরম বিপাকে ফেলে দেয়। মুসলমানরা উঁচু ও সুবিধাজনক স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং মক্কানদের জন্য থাকা খাবার পানির উৎসগুলো পাথর ও বালি দিয়ে বন্ধ করে দেয়। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা ক্লান্ত কুরাইশরা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিচু, কর্দমাক্ত ও আবর্জনায় ভরা স্থানে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। যুদ্ধ শুরুর আগেই নবীজির এই বুদ্ধিদীপ্ত ও অভাবনীয় রণকৌশল অহংকারী মক্কান বাহিনীর মনোবলকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়।

শুরু হয় ডুয়েল বা দ্বন্দ্ব লড়াই। তৎকালীন আরব সংস্কৃতিতে যুদ্ধ শুরুর আগে এ রীতি পালিত হত যার প্রেক্ষিতে আসওয়াদ নামের একজন সামনে এগিয়ে এলে সে বীর হামজা (রা.) এর হাতে প্রান হারায়। এরপর কুরাইশ পক্ষ থেকে উতবা, শাইবা ও আল-ওয়ালিদ দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানালে নবীজি (সা.) হামজা, আলী ও উবাইদা (রা.)-কে পাঠান। সকল মক্কান পরাজিত হয় শুধু উবাইদা (রা.) পা হারিয়ে আহত হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বদরের প্রথম শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
তবে ডুয়েলের পরাজয়ের গ্লানি মেনে নিতে না পেরে আবু জাহেল ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সদলবলে পূর্ণ শক্তিতে আক্রমণ করে মুসলিম আর্মির উপর।
সংখ্যার সুবিধায় থাকা মক্কান বাহিনী তিনবার তীব্র আক্রমণ করে মুসলমানদের ঘিরে ধরতে চায়। তবে নবীজি (সা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবীরা মাটি কামড়ে লড়াই করে কোরাইশদের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে মক্কানদের প্রতিটি আক্রমণই ব্যর্থ হয় এবং তাদের মনোবল ভেঙে যায়।

তৃতীয় আক্রমণ শেষে কুরাইশরা যখন পিছু হটতে লাগে ঠিক তখন সুযোগ বুঝে নবীজি (সা.) পাল্টা আক্রমণের ঘোষনা দেন। এসময় আল্লাহর আদেশে জিবরাঈল (আ.) এর নেতৃত্বে ফেরেশতারাও মুসলিমদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ঐশ্বরিক শক্তির আক্রমণে ও মুসলিমদের দৃঢ় প্রত্যয়ে দিশেহারা হয়ে কুরাইশরা পরাজিত হয়; আবু জাহেল নিহত হলে মুসলমানরা এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে সেদিন।

এই বিজয়ই মহানবী (সা.)-কে প্রথম এক অনন্য সমরনায়ক ও নেতা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে। এই যুদ্ধ কুরাইশদের মনোবল চূর্ণ করার পাশাপাশি ইতিহাসে একটি মাইলফলকে পরিণত হয়। আবু জাহেলের পতনের পর আবু সুফিয়ানের উত্থান হয় এরপর দীর্ঘ ছয় বছর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চললেও বদরের মাহাত্ম্য চিরভাস্বর। অদম্য বিশ্বাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা এবং আল্লাহর রহমতে অবিচল আস্থা থাকলে যেকোনো অসম প্রতিপক্ষকে হারানো সম্ভব, বদরের প্রান্তরের এই মহান শিক্ষাই আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তবে, বদরের সে তপ্ত মরুর প্রান্তর আজ শান্ত হলেও তার শুষ্ক বালুকণায় মিশে আছে শতাব্দী প্রাচীন সেই বীরত্বের ঘ্রাণ যা সিরিয়ার মজলুম বা ফিলিস্তিনের যুদ্ধাহতদের মনে জাগায় প্রশ্ন, কবে আবার এই পৃথিবীতে এমন কোনো নিঃস্বার্থ নেতার দেখা মিলবে, মিলবে সাহায্যের কমল হাত। যিনি আবার কোন সনদে ঐক্যবদ্ধ করবেন সমগ্র মুসলিম জাহান। যার এক আঙুলের ইশারায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে মজলুমের কণ্ঠস্বর? কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত ভোর?
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ কোরআনে সূরা আল-আনফালে বলেন,
“স্মরণ করো, যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে ফরিয়াদ করছিলে, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদ কবুল করলেন যে, ‘আমি তোমাদের সাহায্য করব এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা একের পর এক আসবে’”। অর্থাৎ, সাহায্য কেবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।”

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্গাপুর সাংবাদিক সমিতির ৩ সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা

মহাকালের এক অলৌকিক যুদ্ধের সাক্ষী বদরের প্রান্তর

আপডেট সময় : 12:39:09 pm, Saturday, 7 March 2026

মো: মোসাদ্দেক হোসেন
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

আচ্ছা কিছু সময়ের জন্য কল্পনা করুন, বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতায় বিখ্যাত পদার্থবিদ মাইকেল মরিস ও কিপ থোর্নের ট্র্যাভারসেবল ওয়ার্মহোল কিংবা টাইম ডায়ালেশনের কাল্পনিক জগৎ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। অতীত ভ্রমণের সফলতায় আপনি পৌঁছে গেছেন এই মুহুর্ত থেকে কয়েক সহস্র বছর আগের আধুনিকতার ছোঁয়াবিহীন এক সময়ে। যেখানে যাতায়াতের জন্য উচ্চগতিসম্পন্ন বাহন বলতে শুধুই ঘোড়া, যোগাযোগের সবচেয়ে উন্নত মাধ্যম হাতে লেখা পত্র, আর যুদ্ধের মারাত্মক মারণাস্ত্র বলতে তরবারি, ঢাল, তীর আর ধনুক।

এমনই এক সময়ে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক তপ্ত রণমঞ্চে। সামনে ধু-ধু মরুপ্রান্তর, যেখানে মুখোমুখি দুই পক্ষ। এক পক্ষে মাত্র কয়েকশ যোদ্ধা, যাদের সম্বল অতি নগণ্য। আর অন্য পক্ষে তৎকালীন প্রবল প্রতাপশালী এক বিশাল সুসজ্জিত বাহিনী। কী হবে এই যুদ্ধের ফলাফল? বড় এ পরাক্রমশালী বাহিনীর কাছে কি কচুকাটা হবে দুঃসাহসের শিখরে দাঁড়িয়ে থাকা এ ক্ষুদ্র বাহিনী? নাকি ভীষণ অকল্পনীয়, অস্বাভাবিক কিছু ঘটবে, যা মানব ইতিহাসে বিরলতার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে? চলুন আমরা আজ ইতিহাসের এমনই এক ঘটনার দর্শক হই।

রমজান যে শুধুই আত্মশুদ্ধি বা ঐশী বানী নাজিলের মাস তা কিন্তু নয় বরং এমাসেই এক অসামান্য যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে মুসলিম জাতি প্রথম তার অস্তিত্ব রক্ষায় ও ন্যায়, ইনসাফের পক্ষে নিজেদের অনড় অবস্থানের বার্তা দেয় পুরা বিশ্বে, যা আজও অনেকের অজানা!

মুসলিমদের এই ঐশ্বরিক জয়ের মাল্য গাঁথা শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ১৪০২ বছর আগে ২য় হিজরির ১৭ ই রমজান বা ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মার্চ দিনটি ছিল সোমবার, স্বয়ং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নেতৃত্বে ৩১৩ জন মুসলিম পদাতিক সৈন্য নিয়ে মুসলিমরা তাদের ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন তৎকালীন কুরাইশের প্রবল প্রতাপশালী এক বিশাল সৈন্য বাহিনীর বিপরীতে।

আল্লাহর হাবিব, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে ফরিয়াদ করলেন,”ইয়া আল্লাহ! তুমি আমায় যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, আজ তা পূর্ণ করো। ইয়া আল্লাহ, যদি মুসলমানদের এই বাহিনী আজ নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে এই পৃথিবীতে তোমার উপাসনার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।”

পরম প্রিয় হাবিব তার বন্ধুর কাছে যেই সাহায্যের স্বরূপ ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ চাইলেন, তা কি বৃথা যেতে পারে? মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে আসমান থেকে জিবরাঈল (আ.) এর নেতৃত্বে ক্ষিপ্র গতিতে নেমে এলেন হাজার ফেরেশতার এক ঐশ্বরিক বাহিনী। শুরু হয়ে গেল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ,বদরের যুদ্ধ । কিন্তু শান্তির ও সম্প্রীতির প্রতিবিম্ব ইসলামের বানী প্রচারে আসা মুহাম্মদ (সা.) যিনি রহমাতুল্লিল আলামিন অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের জন্য যিনি রহমত ও সুপথের পথিকৃৎ তিনি কেন লিপ্ত হলেন এ রক্তক্ষয়ী, বিধ্বংসী আর সর্বগ্রাসী সংঘর্ষে? কি বলছেন ইতিহাসাজ্ঞরা, কিভাবেই বা ব্যাখ্যা করছেন তার এ স্ব-বৈপরীত্য? চলুন জানি একদম গোড়া থেকে।

আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হযরত ইব্রাহিম আ. তার পরম আরাধ্য সন্তান ঈসমাইল আ. কে নিয়ে মক্কা শহরে কাবা ঘর নির্মাণ করেছিলেন এক আল্লাহর উপাসনার জন্য।অথচ কালের পরিক্রমায় সব ভুলে খুব সামান্য সংখ্যক মানুষই আল্লাহকে মনে রাখলো। আর পবিত্র কাবা ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো পৌত্তলিকতার মহোৎসবের কেন্দ্রে, আর শেষ নবী সা. এর জামানায় এই মহোৎসবের অন্যতম আধিপত্যকারী নেতা ছিল দাম্ভিক আবু জাহেল।

৬১০ খ্রিস্টাব্দে ওহি প্রাপ্তির পর নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন তাওহীদের ডাক দিলেন, তখন এই এতিম মুহাম্মদ সা. এর কথায় অসংখ্য মানুষ সত্যের পথে ফিরতে লাগলো যাতে কুরাইশদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ক্ষতি হওয়া শুরু হলো। তখন নবীজি সা. কে তারা ক্ষমতা ও সম্পদের নানা প্রলোভন দেখালো যাতে তিনি সব বন্ধ করেন। কিন্ত তিনি সত্য প্রচারে ছিলেন অনড়, অবিচল। এরপর দীর্ঘ ১২ বছর ধরে রিসালাত পন্থীদের উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন, বয়কট ও হত্যাচেষ্টা। অবশেষে অস্তিত্ব রক্ষায় আল্লাহর নির্দেশে ৬২২ সালে নবীজি (সা.) ও মুসলমানরা মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনা বা তৎকালীন ইয়াসরিবে হিজরত করেন। মক্কায় মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা রিফিউজি, মদিনায় এসে হয়ে উঠলেন এক অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়ক, রচনা করলেন পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ যার মাধ্যমে মদিনার বিভক্ত সম্প্রদায় গুলো ঐক্যবদ্ধ হলো। মুহাম্মদ সা. এর উদ্যোগে রচিত বিশ্ববিখ্যাত এই মদিনা সনদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে স্যার উইলিয়াম মুইর তার রচিত ‘দ্য লাইফ অফ মোহাম্মদ’ বইতে লেখেন: “It reveals the man in his real greatness. A mastermind, not only of his own age, but of all ages.”

অন্যদিকে,৬২২ সালে হিজরতের পর লুটেরা কুরাইশরা মক্কায় মুসলমানদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি, জমিজমা ও ব্যবসায়িক সব সম্পদ লুট ও মদিনায় মুসলমানদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে গুপ্তচর নিয়োগ করল।এরই ২ বছর পর ৬২৪ খ্রীস্টাব্দের শুরুতে মুসলিমরা খবর পায় ইসলামের কট্টর শত্রু মক্কান আবু সুফিয়ান লুন্ঠিত সম্পদ নিয়ে বানিজ্যের জন্য সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানরা আবু সুফিয়ানের এ বাণিজ্য কাফেলায় রেইডের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয় না মুসলমানদের, ধূর্ত আবু সুফিয়ান আগেই বিপদের আচঁ পেয়ে পথ বদলে তাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। এরই কিছুদিন পর ফের মদিনায় খবর আসে, আবু সুফিয়ান বাণিজ্য শেষ করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ে সিরিয়া থেকে ফিরছে। আবার মুসলমানরা মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে আধুরা কাজ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এখন এই জায়গায় অনেকের মনে প্রশ্ন আসবে, ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ খ্যাত নবীজি (সা.) কেন সংঘর্ষ বেছে নিয়ে বাণিজ্য কাফেলায় আক্রমণ করলেন?

পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের মাঝে এই রেইডের বৈধতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে, কিন্তু একটু বিবেক দিয়ে ভেবে বলুনতো, আপনি দেখছেন আপনার শত্রু আপনার সম্পদ লুট করে আপনার বাড়ির পাশ দিয়ে বাণিজ্য করতে যাচ্ছে, যেন সেই অর্থ ব্যবহার করে একটা বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তুলে আপনারই বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে, তখন আপনার হাত গুটিয়ে বসে থাকা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

এটি মুসলমানদের জন্য ছিল এক্সিস্টেন্সিয়াল থ্রেড বা অস্তিত্বের হুমকি। মূলত এই রেইড দেওয়ার পেছনের কারণ ছিল শক্তিশালী মক্কান কুরাইশদের ইকোনমিক্যালি দুর্বল করা, মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সম্পদ ফেরত নেওয়া এবং বৃহত্তর স্বার্থে মদিনায় নতুন রাষ্ট্র গঠনে সেই অর্থ ব্যবহার করা। আরেকটি বিষয় এটি ইসলামের একদম প্রারম্ভিক সময়ের ঘটনা। যখন মুসলিমরা বছরের পর বছর ধরে মজলুম ছিলেন। মক্কানদের তাই নিজেদের সক্ষমতা জানান দেওয়ার এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, যেন তারা ইসলামের বিরোধিতা করতে অতি উৎসাহী না হয়।

চলুন আবার ফিরে যাই মুসলিমদের দ্বিতীয় রেইডে, এবার মুহাম্মদ (সা.) ৩১৩ জন সহযোগী নিয়ে রেইডের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন এদিকে অতি সতর্ক আবু সুফিয়ান আবার বিপদের আভাস পেয়ে তার কাফেলার দ্রুততম চরের মাধ্যমে মক্কা থেকে সাহায্য চাইলেন। মক্কা পৌঁছানোর পূর্বেই চর নিজেকে নিজে ক্ষতবিক্ষত করে কুরাইশদের কাছে অতিরঞ্জিত খবর পৌঁছালো। হক চকিয়ে গেল মক্কাবাসী। আতঙ্কিত হয়ে আবু জাহেলরা ১৩০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রওনা হলো। এদিকে ধুর্ত আবু সুফিয়ান তার কাফেলা নিয়ে সমুদ্রের দিকে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল। এখন মুখোমুখি দুপক্ষ, শুরু হয়ে গেল বদরের যুদ্ধ।

কাফেলা নিরাপদ জেনে, ৩০০ জন ফিরে গেলেও, মুসলমানদের চিরতরে নিঃশেষ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি দাম্ভিক আবু জাহেল। ১০০০ জন সৈন্য নিয়ে সামনে এগোতে থাকলো সে।
এদিকে নবীজি (সা.) ও তাঁর ৩১৩ জন সাহাবী শুধুমাত্র কাফেলা আটকাতে এসেছিলেন, বিশাল বাহিনীর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তবে আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রেখে তাঁরা শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত হন। নবী থেকে মোহাম্মদ সাঃ হয়ে ওঠেন সমরনায়ক এবং সাথে থাকা ৩১৩ জন সাহাবী মুহূর্তেই হয়ে ওঠেন সহযোদ্ধা। তারা কেউ কেউ ছিল নিরস্ত্র আবার কেউ গাছের ডাল নিয়ে শুরু করলেন যুদ্ধ প্রস্তুতি । এমন সময় বদর প্রান্তরে নেমে এলো রহমতের বৃষ্টি। নবীজি (সা.) মুসলমানদের সুনিশ্চিত বিজয়ের সুসংবাদ দিলেন। সেনাপতি নবীজি (সা.) এর এক দুর্দান্ত কৌশল যুদ্ধ শুরু আগেই আবু জাহেলকে চরম বিপাকে ফেলে দেয়। মুসলমানরা উঁচু ও সুবিধাজনক স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং মক্কানদের জন্য থাকা খাবার পানির উৎসগুলো পাথর ও বালি দিয়ে বন্ধ করে দেয়। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা ক্লান্ত কুরাইশরা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিচু, কর্দমাক্ত ও আবর্জনায় ভরা স্থানে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। যুদ্ধ শুরুর আগেই নবীজির এই বুদ্ধিদীপ্ত ও অভাবনীয় রণকৌশল অহংকারী মক্কান বাহিনীর মনোবলকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়।

শুরু হয় ডুয়েল বা দ্বন্দ্ব লড়াই। তৎকালীন আরব সংস্কৃতিতে যুদ্ধ শুরুর আগে এ রীতি পালিত হত যার প্রেক্ষিতে আসওয়াদ নামের একজন সামনে এগিয়ে এলে সে বীর হামজা (রা.) এর হাতে প্রান হারায়। এরপর কুরাইশ পক্ষ থেকে উতবা, শাইবা ও আল-ওয়ালিদ দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানালে নবীজি (সা.) হামজা, আলী ও উবাইদা (রা.)-কে পাঠান। সকল মক্কান পরাজিত হয় শুধু উবাইদা (রা.) পা হারিয়ে আহত হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বদরের প্রথম শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
তবে ডুয়েলের পরাজয়ের গ্লানি মেনে নিতে না পেরে আবু জাহেল ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সদলবলে পূর্ণ শক্তিতে আক্রমণ করে মুসলিম আর্মির উপর।
সংখ্যার সুবিধায় থাকা মক্কান বাহিনী তিনবার তীব্র আক্রমণ করে মুসলমানদের ঘিরে ধরতে চায়। তবে নবীজি (সা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবীরা মাটি কামড়ে লড়াই করে কোরাইশদের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে মক্কানদের প্রতিটি আক্রমণই ব্যর্থ হয় এবং তাদের মনোবল ভেঙে যায়।

তৃতীয় আক্রমণ শেষে কুরাইশরা যখন পিছু হটতে লাগে ঠিক তখন সুযোগ বুঝে নবীজি (সা.) পাল্টা আক্রমণের ঘোষনা দেন। এসময় আল্লাহর আদেশে জিবরাঈল (আ.) এর নেতৃত্বে ফেরেশতারাও মুসলিমদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ঐশ্বরিক শক্তির আক্রমণে ও মুসলিমদের দৃঢ় প্রত্যয়ে দিশেহারা হয়ে কুরাইশরা পরাজিত হয়; আবু জাহেল নিহত হলে মুসলমানরা এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে সেদিন।

এই বিজয়ই মহানবী (সা.)-কে প্রথম এক অনন্য সমরনায়ক ও নেতা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে। এই যুদ্ধ কুরাইশদের মনোবল চূর্ণ করার পাশাপাশি ইতিহাসে একটি মাইলফলকে পরিণত হয়। আবু জাহেলের পতনের পর আবু সুফিয়ানের উত্থান হয় এরপর দীর্ঘ ছয় বছর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চললেও বদরের মাহাত্ম্য চিরভাস্বর। অদম্য বিশ্বাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা এবং আল্লাহর রহমতে অবিচল আস্থা থাকলে যেকোনো অসম প্রতিপক্ষকে হারানো সম্ভব, বদরের প্রান্তরের এই মহান শিক্ষাই আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তবে, বদরের সে তপ্ত মরুর প্রান্তর আজ শান্ত হলেও তার শুষ্ক বালুকণায় মিশে আছে শতাব্দী প্রাচীন সেই বীরত্বের ঘ্রাণ যা সিরিয়ার মজলুম বা ফিলিস্তিনের যুদ্ধাহতদের মনে জাগায় প্রশ্ন, কবে আবার এই পৃথিবীতে এমন কোনো নিঃস্বার্থ নেতার দেখা মিলবে, মিলবে সাহায্যের কমল হাত। যিনি আবার কোন সনদে ঐক্যবদ্ধ করবেন সমগ্র মুসলিম জাহান। যার এক আঙুলের ইশারায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে মজলুমের কণ্ঠস্বর? কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত ভোর?
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ কোরআনে সূরা আল-আনফালে বলেন,
“স্মরণ করো, যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে ফরিয়াদ করছিলে, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদ কবুল করলেন যে, ‘আমি তোমাদের সাহায্য করব এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা একের পর এক আসবে’”। অর্থাৎ, সাহায্য কেবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।”