
আরিফ আহমেদ,
আজ ১০ অক্টোবর শনিবার বিশ্ব হসপিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার দিবস। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য- “ব্যথা ব্যবস্থাপনা: প্যালিয়েটিভ কেয়ারের একটি অপরিহার্য অংশ।” নিরাময়-অযোগ্য বা জীবনসীমিত রোগে আক্রান্ত মানুষের শারীরিক যন্ত্রণা উপশম, মানসিক প্রশান্তি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতেই বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে রোগী ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ব্যথা উপশম এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) চিকিৎসক ডা. সাবিকুন নাহার উর্মীসহ এ সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। বলা যায়, অনেকটা সাদামাঠা ভাবে একাই দিবসটি উদযাপন করেন তিনি ও তার টিম। সহযোগিতা করেন শেবাচিম পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডাঃ মশিউল মুনীর।
দিবসটি উপলক্ষে শেবাচিমে চিকিৎসাধীন গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের ব্যথা উপশম, মানসিক প্রশান্তি এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্যানসারসহ জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিং ও ব্যথা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রয়োজনীয়তা এবং বাড়িতে গুরুতর অসুস্থ রোগীর যত্ন নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে শেবাচিম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বছরের প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক চিকিৎসাসেবার গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর সাত কোটিরও বেশি মানুষের প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ এ সেবা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে অনেক রোগী যথাযথ ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, মানসিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় যত্ন ছাড়াই দীর্ঘ সময় কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন।
এ সম্পর্কে বরিশাল বিভাগের একমাত্র প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং শেবাচিমের মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সাবিকুন নাহার উর্মী বলেন, প্যালিয়েটিভ কেয়ার কেবল ব্যথানাশক ওষুধ প্রয়োগ কিংবা শারীরিক কষ্ট কমানোর চিকিৎসা নয়। এর আওতায় রোগীর মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়। রোগের কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ, ভয়, অসহায়ত্ব এবং পরিবারের সদস্যদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়তা করাও এ সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগ নিরাময় সম্ভব না হলেও উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর কষ্ট কমানো এবং জীবনের অবশিষ্ট সময়কে আরও স্বস্তিদায়ক ও অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।
বরিশালে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ মেডিসিনের চিকিৎসক ডা. সাবিকুন নাহার উর্মী। তার পেশাগত পরিচিতি অনুযায়ী, তিনি এমবিবিএস ও বিসিএস (স্বাস্থ্য) সম্পন্ন করার পাশাপাশি প্যালিয়েটিভ মেডিসিনে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি আবাসিক ফিজিশিয়ান (মেডিসিন) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ডাঃ সাবেকুন নাহার উর্মী বলেন, জটিল, দীর্ঘস্থায়ী ও অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও উপসর্গ ব্যবস্থাপনায় প্যালিয়েটিভ মেডিসিনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার পাশাপাশি রোগী ও তার পরিবারের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাদের উদ্বেগ বোঝা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকার মানসিকতা প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মূল দর্শন। এ সেবা শুধু জীবনের শেষ পর্যায়ের রোগীদের জন্য নয়; গুরুতর অসুস্থতার বিভিন্ন পর্যায়েও প্রয়োজন অনুযায়ী এটি দেওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।
ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে এ সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছেন শেবাচিম পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডাঃ মশিউল মুনীরও।
তিনি বলেন, বরিশালের স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতায় প্যালিয়েটিভ কেয়ারের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। শেবাচিম বরিশাল বিভাগের ছয় জেলাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা বর্তমানে ১১০০ হলেও রোগীর চাপ অনেক সময় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, হাসপাতালে প্রায় তিন হাজার রোগী ভর্তি আছেন এবং প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন সেবা নিতে আসেন।
বিপুলসংখ্যক রোগীর এই চাপের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, মানসিক প্রশান্তি, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা এবং পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি রোগ ও অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত সেবা প্রয়োজন বলে জানান শেবাচিম পরিচালক।
ইতিপূর্বে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেবাচিমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ২৪৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন ১০২ জন; শূন্য ছিল ১৪৬টি পদ। একন পর্যন্ত এ অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। তবে চিকিৎসক ও জনবলের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপের বাস্তবতায় প্যালিয়েটিভ কেয়ারসহ বিশেষায়িত সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।
প্যালিয়েটিভ কেয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাড়িতে রোগীর পরিচর্যা। অনেক পরিবারের পক্ষে দীর্ঘদিন অসুস্থ স্বজনের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘুমের সমস্যা কিংবা মানসিক অস্থিরতা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কীভাবে রোগীকে আরামদায়ক অবস্থায় রাখা যায়, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং কীভাবে রোগীর মানসিক শক্তি ধরে রাখতে সহায়তা করা যায়, এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রোগীর আর্থিক ও সামাজিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ডা. সাবিকুন নাহার উর্মীর চেম্বারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি শেবাচিম এর বাইরেও বরিশালে নির্ধারিত সময়ে রোগী দেখেন। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তার চেম্বারে সেবা নেওয়া যায়। শুক্র, শনি ও রবিবার চেম্বার বন্ধ থাকে। চেম্বারটি সদর রোডের সাউথ এপোলো কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলায়, কক্ষ নম্বর ৫০১। যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছে ০৯৬১৭-৮৮৮৮৯২, ০১৭০৬-৩৫৪৯৭৪, ০১৭১১-৪৫৭৪৪৪ ও ০১৩৩৪-৯৪০৯৯৯ নম্বর। এ ছাড়া তিনি শেবাচিমে সকাল ৮টা থেকে নিয়মিত রোগী দেখেন বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ব হসপিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার দিবসের আহ্বান- কোনো মানুষ যেন ব্যথা, অসহায়ত্ব ও চিকিৎসাসেবার অভাবে একা কষ্ট না পান। সব রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব না হলেও রোগীর যন্ত্রণা লাঘব, তাঁর মর্যাদা রক্ষা এবং পরিবারকে সহায়তা করা সম্ভব। ব্যক্তি, পরিবার, চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষ প্যালিয়েটিভ কেয়ার পাবেন।
































