
মোঃ সাগর ইসলাম,
ইদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন বাজারের মতো ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ঢাকাইয়াপট্টি মার্কেটেও জমে উঠেছে কাপড় ও কসমেটিকসের বেচাকেনা। কিন্তু ক্রেতাদের অভিযোগ, উৎসবের ব্যস্ততাকে পুঁজি করে অনেক দোকানেই পণ্যের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কোথাও মূল্য তালিকা নেই, কোথাও আবার একই পণ্য ভিন্ন ক্রেতার কাছে ভিন্ন দামে বিক্রির অভিযোগ উঠছে। এসব অনিয়ম সরাসরি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯–এর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয় ক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকাইয়াপট্টি মার্কেটে কসমেটিকস ও কাপড়ের দোকানগুলোতে প্রায়ই নির্দিষ্ট মূল্য তালিকা প্রদর্শন করা হয় না। ফলে ক্রেতারা পণ্যের প্রকৃত দাম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন না। অনেক সময় দরকষাকষির উপর নির্ভর করে একই পণ্য একেক জনের কাছে একেক দামে বিক্রি করা হয়। এতে করে বাজারে স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভোক্তারা প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের যুক্তিসংগত সীমা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। আইনের ধারা ৪০–এ বলা হয়েছে, অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করলে তা প্রতারণামূলক বাণিজ্য হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কসমেটিকস পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, পরিবহন ব্যয় এবং একটি গ্রহণযোগ্য মুনাফা যুক্ত করা যেতে পারে। একইভাবে কাপড় বা তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়, শ্রম, পরিবহন ও সীমিত লাভ যোগ করা আইনসিদ্ধ। কিন্তু ক্রয়মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দাম নির্ধারণ করলে তা আইনের চোখে অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আইনের ধারা ৩৮ অনুযায়ী প্রতিটি দোকানে দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে বিক্রয়ের সময় ক্রেতাকে ক্যাশ মেমো বা রশিদ দিতে হবে, যেখানে দোকানের নাম, ঠিকানা, পণ্যের বিবরণ, পরিমাণ, মূল্য ও তারিখ উল্লেখ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক দোকানে মূল্য তালিকা নেই এবং ক্রেতা চাইলে অনেক সময় ক্যাশ মেমোও দেওয়া হয় না। কিছু দোকানি বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বলেন, “মেমো শেষ”, “সিস্টেম নেই” অথবা “এটা পাইকারি দোকান”—যা আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাশ মেমো না দেওয়া বা সংরক্ষণ না করা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি আইনি জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও গুরুতর সমস্যা তৈরি করে। কারণ কোনো অভিযোগ বা তদন্তের ক্ষেত্রে বিক্রির প্রমাণ হিসেবে ক্যাশ মেমো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ধারা ৪৫ অনুযায়ী তদন্ত বা তদারকি কার্যক্রমে বাধা দেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আইনে এ ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন মাত্রার শাস্তির বিধান রয়েছে। ধারা ৪০ অনুযায়ী অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা প্রতারণামূলক বাণিজ্য প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই লক্ষ টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। আবার ধারা ৩৮ অনুযায়ী মূল্য তালিকা না রাখা বা ক্যাশ মেমো না দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। একইভাবে তদন্তে বাধা বা তথ্য গোপন করলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ইদের বাজারকে কেন্দ্র করে অনেক সময় “ছাড়”, “বিশেষ অফার” কিংবা “বিদেশি পণ্য”–এর মতো নানা প্রচারণা ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করেন। ফলে ক্রেতারা প্রকৃত দাম সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। পীরগঞ্জের ঢাকাইয়াপট্টি মার্কেটেও এ ধরনের অভিযোগ মাঝে মাঝে শোনা যায়, যা বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সচেতন মহলের মতে, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের আইন সম্পর্কে সচেতন করা এবং ক্রেতাদেরও ক্যাশ মেমো নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা শুধু আইনের প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি বাজারে আস্থা ও নৈতিক বাণিজ্য সংস্কৃতি গড়ে তোলারও অংশ। তাই ইদের মতো উৎসবমুখর সময়ে বাজারে যেন ভোক্তারা প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
























