বিবিসি বাংলা,
নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের পর তার দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি আসলেই দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কবে এবং কীভাবে ফিরবেন—এসব প্রশ্ন এখন সামনে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময় দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে এবারই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে নিজের দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে আসছে। ২০১৩ সালে দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি সই হয় এবং ২০১৬ সালে তা সংশোধন করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রত্যর্পণের সুযোগ রয়েছে। হত্যা, গুম, বোমা বিস্ফোরণ ও সন্ত্রাসবাদের মতো অপরাধকে শুধু রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগও সীমিত। তবে কোনো মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরল বিশ্বাসে করা হয়নি বলে মনে হলে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, গণহত্যা, গুম ও নির্যাতনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
ফলে তিনি দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো আইনি বাধা না থাকলেও তার বিরুদ্ধে থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্টের পরিস্থিতি এবং দেশে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি। তিনি কোন নথিতে এবং কোন প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরবেন, সেটিও বাস্তব পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুরো বিষয়টি শুধু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও সরাসরি জড়িত।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে। দলটির বহু নেতা-কর্মী বর্তমানে নানা মামলা ও রাজনৈতিক চাপে থাকায় শেখ হাসিনার এমন বক্তব্য তাদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তা তৈরি করতে পারে।
আবার কেউ কেউ মনে করছেন, দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকেও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ শেখ হাসিনা ফিরলে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে। তার দেশে ফেরা হলে সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এখন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।
তাই প্রশ্ন এখন একটাই—শেখ হাসিনা কি সত্যিই দেশে ফিরবেন, নাকি দেশে ফেরার এই ঘোষণা তার রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ? উত্তর মিলবে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক developments-এ।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮