জনি কান্ত শর্মা,
সিলেটের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে মাসব্যাপী ‘সৃজনশীল পণ্য প্রদর্শনী, শিল্প-পণ্য ও বাণিজ্য মেলা ২০২৬’ আয়োজনকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম, প্রশাসনের শর্তভঙ্গ এবং শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলা ঘিরে নগরজুড়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা ঝড়।
অভিযোগ রয়েছে, মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার সময় জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে না। মাঠের সীমানা ও ব্যবহার, বিদ্যুৎ সংযোগ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং মেলার কার্যক্রম পরিচালনার সময়সীমাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে মেলা শেষ হওয়ার পর মাঠটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার উপযোগী রাখার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নগরবাসীর একটি বড় অংশের মতে, শিশু-কিশোরদের নিয়মিত ক্রীড়া চর্চার গুরুত্বপূর্ণ এই মাঠে বাণিজ্যিক আয়োজন, এর ফলে মাঠের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সিলেটের সাধারণ শাখা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, সিলেট সদর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের স্মারক নম্বর সিটিএসবি/এসএমপি-৪৪১৭, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ২৩ আগস্ট ২০২৬ এ স্মারক অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ৩০ দিনব্যাপী মেলা আয়োজনের কথা ছিল।
তবে মেলার অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় মাঠের নিরাপত্তা, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার কথা উঠে আসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের চিঠিতে।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠ সিলেট সদর উপজেলার প্রধান খেলার মাঠ এবং শিশু-কিশোরদের নিয়মিত ক্রীড়া চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান এটি। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মাঠটির বিশেষ ভূমিকাও রয়েছে।
এ ছাড়া মাঠে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭’, প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট-২০২৬ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ সরকারের বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক ক্রীড়া কার্যক্রম নির্ধারিত রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করার পরেও এসব মেলা আয়োজন করা হয়েছে।
চিঠিতে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। মাঠের এক পাশে লাক্কাতুরা চা বাগানের দলদলি চা বাগান রয়েছে। পাশাপাশি, এয়ারপোর্ট থানার আওতাধীন সংশ্লিষ্ট এলাকাটি থানা থেকে দূরে হওয়ায় মেলা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হলেও নির্ধারিত শর্তগুলো কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন এখন জনমনে।
প্রশাসনের শর্ত অনুযায়ী, মেলার কার্যক্রম শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ রাখার কথা ছিল। কিন্তু এই শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মেলার বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও আয়োজনের কাজে ব্যবহৃত ইটের টুকরো, পাথরের খোয়া এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী মাঠের মাটির সঙ্গে মিশে রয়েছে। এসব সামগ্রী যথাযথভাবে অপসারণ করা না হলে ভবিষ্যতে শিশু-কিশোর ও তরুণেরা খেলাধুলা করতে গিয়ে আহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ, মেলা শেষে শুধু দৃশ্যমান স্থাপনা সরিয়ে নিলেই মাঠ আগের অবস্থায় ফিরবে না। মাঠের মাটির সমতলতা, নিরাপত্তা ও ক্রীড়া উপযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
মেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আয়োজকদের নিজস্ব প্রি-পেইড মিটার নেওয়ার নির্দেশনা ছিল। একই সঙ্গে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার না করার শর্তও দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এই নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মেলার মতো বড় আয়োজনের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে নির্ধারিত ব্যবস্থা অনুসরণ করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ সুরক্ষিত রাখা প্রশাসনিক শর্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।
প্রশাসনের নির্দেশনায় মেলা আয়োজনের কারণে মাঠের কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, মাটির সমতলতা কিংবা খেলাধুলার উপযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না বলে উল্লেখ ছিল। কিন্তু এসব কিছুই মানা হচ্ছে না।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ থেকে নির্মিত উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিসকক্ষ ও সীমানাপ্রাচীর সুরক্ষার বিষয়টিও শর্তের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, মেলার আয়োজন ও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে মাঠের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং ক্রীড়া অবকাঠামোর সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে মাঠের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মেলা আয়োজনের অনুমতিতে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সামাজিক রীতিনীতির পরিপন্থী কোনো কার্যক্রম পরিচালনা না করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে মেলার কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা। একই সঙ্গে আজান ও নামাজ চলাকালে কোনো ধরনের বাদ্যযন্ত্র বা মাইক বাজানো নিষিদ্ধ ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়সূচি এবং শব্দ ব্যবহারের বিধিনিষেধ যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে আজান ও নামাজের সময় মাইক বা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা প্রতিপালন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ধর্মীয় ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং ধর্মীয় কার্যক্রমে যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আয়োজকদের ওপরই বার্তায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া মেলা চলাকালে নেশাজাতীয় দ্রব্য, জুয়া, অশ্লীলতা, নৃত্য, যাত্রা, সার্কাস, বিপজ্জনক খেলা কিংবা অন্য কোনো অসামাজিক কার্যকলাপের আয়োজন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, এসব বিধিনিষেধ যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে না। ফলে মেলার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং শর্তগুলো বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
মেলার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়েছিল।
নির্দেশনা অনুযায়ী, মেলায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য কিংবা অন্য কোনো অবৈধ ও সরকার নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি করা যাবে না। আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য প্রদর্শন বা বিক্রিও নিষিদ্ধ ছিল। পাশাপাশি, প্রদর্শিত পণ্যসামগ্রী মেলার ঘোষিত উদ্দেশ্য ও আয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মেলার স্টল সমূহের প্রদর্শিত পণ্যের সিংহভাগই আয়োজনের উদ্দেশ্যের সাথে কোন মিল নেই। অভিযোগ রয়েছে বড় অংকের টাকার বিনিময়ে মেলার উদ্দেশ্যের সামে মিল নেই এমন পণ্যের বিক্রেতাকেও স্টল বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে।
বিদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি নীতি আদেশ অনুসরণ করার নির্দেশনা ছিল। একই সঙ্গে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি শিল্পী, মডেল বা সেলিব্রেটিকে মেলায় অংশগ্রহণ করানোর অনুমতি ছিল না।
এসব শর্তের উদ্দেশ্য ছিল মেলার বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে নির্ধারিত নীতিমালা ও প্রচলিত আইনের আওতায় রাখা। অভিযোগ উঠেছে, শর্তগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
শাহী ঈদগাহ মাঠের আশপাশে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, স্কুল ও মাদ্রাসা থাকায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
প্রশাসনের শর্ত অনুযায়ী, এসব সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এমন উচ্চশব্দে মাইক ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। মেলার অভ্যন্তরে সাউন্ড সিস্টেম সীমাবদ্ধ রাখার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মেলা প্রাঙ্গণে উচ্চশব্দে মাইকিং ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এতে হাসপাতালের রোগী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে হাসপাতাল এলাকায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মেলায় দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে একাধিক প্রবেশ ও প্রস্থানপথ স্থাপন এবং প্রবেশপথে তল্লাশির ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা ছিল। পাশাপাশি পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা, বাইরের প্রধান সড়কে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের চলাচলের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল মেলায় আগত দর্শনার্থীদের চলাচল নিরাপদ রাখা এবং আশপাশের সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা।
তবে সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ ওঠায় প্রবেশপথ, পার্কিং, সড়কের শৃঙ্খলা এবং জনসাধারণের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনের শর্ত অনুযায়ী, মেলার সম্পূর্ণ প্রাঙ্গণ সিসি ক্যামেরার আওতায় রাখার কথা ছিল। এমনকি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও যাতে সিসি ক্যামেরা সচল থাকে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা ছিল। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিকল্প হিসেবে জেনারেটর রাখার শর্তও দেওয়া হয়েছিল।
জনসমাগমপূর্ণ বাণিজ্য মেলায় অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশাসনের সব শর্ত বাস্তবে কতটা প্রতিপালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শন ও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগার রাখার নির্দেশনা ছিল। একই সঙ্গে প্রবেশ টিকিটের ওপর ঘোষিত র্যাফেল ড্র পুরস্কার ছাড়া অন্য কোনো ধরনের লটারি বা র্যাফেল ড্র আয়োজন না করার কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া মেলার প্রতিটি স্টলের নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সিলেট মহানগর পুলিশে (এসএমপি) জমা দেওয়ার কথা ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, স্টলসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে জমা দেওয়ার শর্তসহ এসব নির্দেশনার প্রতিপালন নিয়েও ঘাটতি রয়েছে। ফলে মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্টলগুলোর তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।
শাহী ঈদগাহ মাঠে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্সের টেস্ট ড্রাইভ কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার বিষয়টিও প্রশাসনিক নির্দেশনায় বিবেচনায় ছিল।
নির্দেশনা অনুযায়ী, মাঠে বিআরটিএর টেস্ট ড্রাইভের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ সুরমার ট্রাক টার্মিনাল সাময়িকভাবে ব্যবহারের কথা ছিল। তবে এ-সংক্রান্ত সামগ্রিক কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকার জারিকৃত নির্দেশনা প্রতিপালনের শর্তও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও তদারকি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেলা আয়োজনের অনুমতিপত্রে শর্তভঙ্গের ক্ষেত্রে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত বিধিবিধানের যেকোনোটি লঙ্ঘিত হলে কিংবা অনুমতি দেওয়ার পর অথবা মেলা চলাকালে প্রয়োজন দেখা দিলে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানো ছাড়াই মেলার সময়সূচি পরিবর্তন করতে পারবেন অথবা মেলার সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
অর্থাৎ, অনুমতিপত্রের শর্তগুলো শুধু আনুষ্ঠানিকতার অংশ নয়; মেলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সেগুলো প্রতিপালন করা আয়োজকদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। অভিযোগগুলো সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে অনুমতিপত্রে সংরক্ষিত ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টিও বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
শাহী ঈদগাহ মাঠে মেলা আয়োজন এবং এর ফলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমী, অভিভাবক ও নগরবাসীর একটি অংশ।
তাদের মতে, একদিকে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের নিয়মিত ক্রীড়া চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাঠে মাসব্যাপী বাণিজ্যিক আয়োজনের ফলে তাদের খেলাধুলার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
তারা মনে করছেন, একটি খেলার মাঠের গুরুত্ব শুধু বিনোদন বা অবসর কাটানোর জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, তরুণদের প্রতিভা বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ ক্রীড়াবিদ তৈরির ক্ষেত্রেও এমন মাঠের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে শাহী ঈদগাহ মাঠে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২০২৭’, প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট-২০২৬ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রম নির্ধারিত থাকার বিষয়টি সামনে এনে মাঠটির স্বাভাবিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, স্কুল ও মাদ্রাসার কাছাকাছি এলাকায় মেলার কার্যক্রম, উচ্চশব্দে মাইকিং এবং সম্ভাব্য যানজট ও জনদুর্ভোগ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, জনবহুল ও সংবেদনশীল এলাকায় এ ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং আশপাশের প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে আয়োজিত মেলা ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ।
তাদের দাবি, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সিলেট মহানগর পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে মাঠের বর্তমান অবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, শব্দদূষণ, স্টলসংক্রান্ত তথ্য, প্রবেশ ও প্রস্থানপথ, পার্কিং এবং অন্যান্য শর্ত বাস্তবে কতটা প্রতিপালিত হচ্ছে, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হোক।
একই সঙ্গে মাঠের অবকাঠামো ও মাটির সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মেলা শেষে মাঠকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার উপযোগিতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগকারীদের দাবি, মেলা আয়োজনের অনুমতিপত্রে নির্ধারিত শর্তগুলোর ব্যত্যয় ঘটেছে এমন অভিযোগের পক্ষে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে। এসব তথ্য যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এছাড়াও মেলায় প্রবেশ টিকেটের নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য সিলেটের মেলার টিকেটের পাশাপাশি এই মেলায় বিভিন্ন সেকশনে বিক্রি হচ্ছে সিরাজগঞ্জ যমুনা শিশু পার্কের টিকেট।
সিলেটের ব্যবসায়ী সমাজের অভিযোগ বিভিন্ন কারনে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া উইমেন চেম্বারের সভাপতি শম্পার ব্যাক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের ভুল বুঝিয়ে এই বাণিজ্যের আয়োজন করেছেন।
এ বিষয়ে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবানা ইয়াছমিন শম্পা বলেন, যানজট নিরসনে তারা সব সময় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে পূজা উপলক্ষে নিরাপত্তাকর্মীর সংকট থাকায় বর্তমানে প্রয়োজনীয় কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে নিরাপত্তাকর্মী পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে মেলার শর্ত সমূহ ভঙ্গের বিষয়ে বিস্তারিত পয়েন্ট টু পয়েন্ট জানতে জাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে মেলায় যাওয়ার দাওয়াত দেন।
বিষয় সমূহ নিয়ে জানতে চাইলে সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পূজার কারণে মেলার কার্যক্রমের সময়সীমা বাড়িয়ে রাত ৮টার পরিবর্তে ১০টা করা হয়েছে। ফলে এ সময় পর্যন্ত মেলার কার্যক্রম চলমান থাকবে। পার্কিং ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনে স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮