আরিফ আহমেদ,
"নেশা খাবি খা, মারা যাবি যা..." এত ভয়ংকর ভাবে নিষেধ করার পরও মাদক তথা তামাকের ব্যবহার দিনকে দিন বেড়েই চলছে। সিগারেটের প্যাকেটের গায়েও এর ভয়াবহতার ছবি, তবুও থামছে না ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার। এভাবেই কবি শুভঙ্কর চক্রবর্তী তুলে ধরেন তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভয়াবহ পরিণতির সতর্কবার্তা, প্যাকেটের গায়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির ছবি কিংবা নানা প্রচার-প্রচারণা, কোনোটিই কি তামাকের ছোবল থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারছে?
তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লেও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে তামাকের আসক্তি থেকে রক্ষা করা, তামাকজাত পণ্যের প্রচার ও বিপণনের কৌশল মোকাবিলা এবং জনসমাগমস্থলকে তামাকমুক্ত রাখতে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উৎপাদন বন্ধ করা, এটি কেন হচ্ছে না?
এমন বাস্তবতায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণে দেশের রোল মডেল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে বরিশালের। দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে বরিশালে সাক্ষরতার হার সর্বোচ্চ, সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী এ হার ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এ শিক্ষার হারকে কাজে লাগিয়ে তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন এবং আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বরিশাল দেশের অন্য অঞ্চলের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ১৮ অক্টোবর
রোববার বরিশাল নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউনহলে আয়োজিত ‘বরিশাল কনফারেন্স অন টোব্যাকো অর হেলথ ২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘তামাকজাত দ্রব্য (সিগারেট, বিড়ি, ই-সিগারেট, জর্দা, গুল, সাদাপাতা ইত্যাদি) ব্যবহার করতে চাই, নাকি সুস্থ-সুন্দর স্বাস্থ্য ও জীবন চাই’ - এই স্লোগানে আয়োজিত সম্মেলনটি সকাল ১০টায় শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন শুরু হয় স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলমের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। এতে ‘Tobacco-Free Bangladesh by 2040: From Political Commitment to Effective Implementation’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক ও সম্মেলনের সদস্য সচিব এ কে এম মাকসুদ।
মূল প্রবন্ধ ও আলোচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বক্তারা বলেন, শুধু তামাকের ক্ষতিকর দিক প্রচার করলেই হবে না, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন
সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান খান, বরিশালের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কাশফিয়া কবীর ঐশী, ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বশির গাজী, বরিশাল বিভাগের সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক ড. মো. মাহবুবুর রহমান, উন্নয়ন সংস্থা সেতুর পরিচালক আবদুল কাদের, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের পরিচালক (হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ) ইকবাল মাসুদ, স্পিড ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক এএইচএম সামসুল ইসলাম দীপু এবং সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর কবির।
অনুষ্ঠানে গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর এ বি কে রেজা বরিশালে তামাক নিয়ন্ত্রণে চলমান কার্যক্রম ও বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরেন। সেতুর প্রজেক্ট ডিরেক্টর শাগুফতা সুলতানা তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকারের নির্দেশিকা নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা তরুণ সমাজকে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সম্মিলিত সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তামাক নিয়ন্ত্রণে জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ, তামাকশিল্পের বিপণন কৌশল এবং তরুণদের ওপর এর প্রভাবও উঠে আসে সম্মেলনের আলোচনায়। ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের হেড অব প্রোগ্রাম সৈয়দা অনন্যা রহমান তামাক নিয়ন্ত্রণে জাতীয় জোটের ভূমিকা তুলে ধরেন। তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ফাহমিদা ইসলাম ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের ওপর তামাকশিল্পের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ শাহ আলম খলিফা ও রফিকুল ইসলাম পান্না।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে তামাক নিয়ন্ত্রণ, করনীতি ও জনসচেতনতা বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য-প্রমাণ তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন বিসিসিপির গবেষক মো. জাকারিয়া হাবিব। যক্ষ্মা ও তামাক নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক তুলে ধরেন নাটাবের প্রজেক্ট ম্যানেজার ফিরোজ আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর সিনিয়র কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল বাজেট প্রস্তাবে ‘ও তদূর্ধ্ব’ শব্দের অপপ্রয়োগ ও তামাকপণ্যের মূল্যকাঠামোর ত্রুটি নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
তবে তাদের কেউই বাংলাদেশ টোবাকো কোম্পানি বা সিগারেট তৈরি কারখানা বন্ধের বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি, যা সত্যি দুঃখজনক।
বক্তারা তামাকমুক্ত নৌপরিবহন ব্যবস্থা এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তামাকমুক্ত ক্যাম্পাস নীতি নিয়ে গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন, কিন্তু উৎপাদন, আমদানি বন্ধের কোনো রূপরেখা নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক নিয়ন্ত্রণকে কেবল স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। তামাক পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে সবার আগে আমদানি এবং উৎপাদন বন্ধ করতে হবে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮