মোঃ আসিফুজ্জামান আসিফ,
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, অযৌক্তিকভাবে শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ, ছাঁটাই করা শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং গ্রেপ্তার শ্রমিকদের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকার সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল থেকে সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল ও আশুলিয়ার নরসিংহপুর-নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হামলায় পুলিশের একটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। সংঘর্ষে পুলিশ, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে তিন প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। দায়িত্ব পালন করছেন নয়জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। নিরাপত্তার স্বার্থে দুই শিল্পাঞ্চলের শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকালে শ্রমিকেরা নিয়মিত সময়েই বিভিন্ন কারখানায় প্রবেশ করেন। কার্ড পাঞ্চ করে হাজিরা নিশ্চিত করার পর সকাল সাড়ে আটটার দিকে অনেক শ্রমিক কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে তাঁরা হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। জবাবে বিক্ষুব্ধরা পুলিশের একটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলমসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠের টুকরো ফেলে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের একটি অংশ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আটকা পড়ে অসংখ্য যানবাহন। চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও সাধারণ মানুষ। একই সময়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল এলাকায়ও শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে শ্রমিকেরাও পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়েন। এ সময় কয়েকটি কারখানার সামনে হেলমেট ও মুখোশ পরা লাঠি হাতে একদল লোককে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে দেখা যায়। তাঁদের পরিচয় শ্রমিক নাকি বহিরাগত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সকাল থেকেই আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার ভেতরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন শ্রমিকেরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা দাবি আদায়ে সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এতে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সংঘর্ষের কারণে ওই সড়কে কিছু সময় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে মবিন নামের একজনকে আটক করে পুলিশ।
সংঘর্ষের সময় বিভিন্ন স্থানে হেলমেট ও মুখোশ পরা লাঠি হাতে একদল ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উলাইল এলাকায় কয়েকটি কারখানার সামনে থাকা লাঠি ও হেলমেটধারীদের শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে দেখা যায়। এদিকে হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন কারখানার সামনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। তাঁরা বহিরাগত ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের প্রতিহত করার কথা জানান।
তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলন এখন আর শুধু শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর দাবি, আন্দোলন ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে প্রকৃত শ্রমিক নন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রমিক সেজে কারখানায় ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও এবং সড়ক অবরোধ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পাশের সিংগাইর ও হেমায়েতপুর থেকেও লোকজন এসে শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন বলে দাবি করেন এই বিএনপি নেতা।
সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, শ্রমিকদের হামলায় ওসি সাইফুল আলমসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে পুলিশ, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের তৎপরতায় বিকেলের দিকে সাভারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে।
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নয়জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হলেও মোট কতটি কারখানা বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করেছে, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
বিজিবি-৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈয়মুর হাসান খান জানান, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি কাজ করছে। আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের অরাজকতা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, শ্রমিকদের আন্দোলন ও সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রেপ্তার শ্রমিক এবং শ্রমিক নেতাদের দ্রুত নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু। তিনি বলেন, বুধবার বিকেলের দিকে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে। আশুলিয়ার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করায় শ্রমিকেরা নিরাপদে বাড়ি ফিরে গেছেন। তবে সাধারণ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং মামলা-হামলার মাধ্যমে হয়রানি করা হলে পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
খাইরুল মামুন মিন্টুর অভিযোগ, বহিরাগত ব্যক্তিরা সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে হামলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতার পরিচয়। শ্রম আইনের বিষয়ে প্রথম বৈঠক সফল হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলায় না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
শিল্প পুলিশ-১এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আশুলিয়ায় শ্রমিকেরা কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলেও তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। সাভারেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় দুই শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সাভার ও আশুলিয়া মিলিয়ে শতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শ্রম আইনসংক্রান্ত প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে শ্রমিকদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় শিল্পাঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮