আরিফ আহমেদ,
বরিশালের গৌরনদী থেকে বাবুগঞ্জের রহমতপুর হয়ে বরিশাল, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা মহাসড়কের অবস্থা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। অসংখ্য খানাখন্দের এই ইতিহাস এখন দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য বিষফোঁড়া। আজ এই গল্প বাদ। অভ্যন্তরীণ সড়ক ও গ্রামের কি অবস্থা? এখানে গৌরনদীর বাটজোর থেকে সরিকল সড়কে প্রবেশমাত্র আঁতকে উঠতে হয়, খালপাড় সংলগ্ন সড়কের ভেঙে পরা দৃশ্য দেখে। সরু এই সড়কের বিভন্ন স্থানে খানাখন্দ বাবুগঞ্জের আগরপুর বাজার পর্যন্ত। এখানে আগরপুর উচ্চবিদ্যালয় ছাড়াও রয়েছে ডিগ্রি কলেজ। ওপাশে মাত্র ৫০০ গজ পশ্চিমেই সরিকল বাজার। কাছাকাছি ও পাশাপাশি গৌরনদী ও বাবুগঞ্জ যেন দুজন দুজনকে জড়িয়ে আছে সবকিছুতেই। দুটি উপজেলার অভ্যন্তরীণ বেশিরভাগ সড়কের যেমন বেহাল দশা, তেমন দুটি উপজেলার অসংখ্য গ্রাম
নদী ভাঙনের কবলে ঝুকিপূর্ণ ও ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।
বলা যায়, ভাঙন কবলিত জনপদ বরিশালের গৌরনদী আগৈলঝারা এবং বাবুগঞ্জ-মুলাদি এলাকা। ফলে ভাঙন থেকে রক্ষা এবং মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ নিরসনে জরুরি পদক্ষেপের দাবিতে বাবুগঞ্জে রীতিমতো মানববন্ধনও হচ্ছে।
তবে গৌরনদীর বাটাজোড় বাজার থেকে আগরপুর হয়ে সরিকল বাজার পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি প্রশস্ত ও টেকসই করার প্রকল্প গ্রহণের সুখবর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সাবেক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি। অন্যদিকে আড়িয়াল খাঁ, পালরদী, সন্ধ্যা ও সুগন্ধা নদীর ভাঙনে বসতভিটা, কৃষিজমি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ অবকাঠামো রক্ষার প্রশ্নটি সামনে এসেছে। এ অবস্থায় গৌরনদী–আগৈলঝাড়া আসনের সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন এবং বাবুগঞ্জ–মুলাদী আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের জরুরি ও সমন্বিত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর জহির উদ্দিন স্বপন গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের মিয়ারচর, কুড়ির চর, হোসনাবাদ, বোরাদী গরঙ্গল এবং মোল্লার খাল ও পালরদী খালের বিল্বগ্রাম এলাকাসহ আড়িয়াল খাঁ নদীর বিভিন্ন ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি ও অন্যান্য ব্যক্তিরা ছিলেন। পরিদর্শনকালে তিনি নদীভাঙনের বাস্তব চিত্র দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কথা শোনেন।
মিয়ারচর লঞ্চঘাট এলাকায় নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজের উদ্বোধনও করেন তিনি। নদীভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কর্মসূচি গ্রহণের কথা জানিয়ে জহির উদ্দিন স্বপন প্রথম ধাপে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানান। পাশাপাশি মিয়ারচরকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে স্থায়ী ভূখণ্ড হিসেবে গড়ে তোলা এবং মুলাদীর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তার এই পরিদর্শন ও উদ্যোগ নদী ভাঙন কবলিত মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তবে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ঘোষিত উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য স্থানেও পর্যায়ক্রমে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের মিয়ারচর এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার বিপাকে পড়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে গত দুই বছরে মিয়ারচর এলাকায় অন্তত ৪০টি পরিবারের বসতভিটা হারানোর তথ্য উঠে এসেছে। নদীতীরবর্তী বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মিয়ারচরের পাশাপাশি সরিকল ইউনিয়নের কুড়ির চর, হোসনাবাদ ও বোরাদী গরঙ্গল এলাকায়ও নদীভাঙনের সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া পালরদী নদী ও সংশ্লিষ্ট খালের তীরবর্তী বিল্বগ্রাম এলাকায় ভাঙন সড়ক, সেতু ও জনবসতির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গৌরনদীর মাহিলাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বিল্বগ্রাম এলাকায়ও নদী ও খালসংলগ্ন অবকাঠামো রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, ভাঙন অব্যাহত থাকলে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শুধু মিয়ারচরে নয়, সরিকল ও আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও সরেজমিন পরিদর্শন, ভাঙনের মাত্রা নিরূপণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
অন্যদিকে, বাবুগঞ্জ উপজেলায় সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙন বিভিন্ন জনপদের মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সুগন্ধা নদীর ভাঙনে বাবুগঞ্জ বাজার, খেয়াঘাট, বরিশাল বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা, বকুলতলা স্টেশন এবং দক্ষিণ ভূতেরদিয়া নতুনচরের কিছু অংশ ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীভাঙনে আগে বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া অনেক পরিবার আবারও নতুন করে ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।
সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে কেদারপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভূতেরদিয়া–মোল্লারহাট এলাকায় বসতভিটা ও বাজার রক্ষার দাবি উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও নদীতীর সংরক্ষণের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন। অন্যদিকে দেহেরগতি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন এবং ইদিলকাঠী–বাহেরচর সংযোগ সড়কের ঝুঁকির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে বাবুগঞ্জ ও মুলাদীর সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর যোগাযোগ এবং বসতি রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মুলাদী উপজেলার গাছুয়া ইউনিয়নের চরডুমুরীতলা পাকারমাথা ও নমরহাট লঞ্চঘাট এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলার কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চরকালেখানসহ মুলাদীর বিভিন্ন এলাকায়ও আড়িয়াল খাঁ ও জয়ন্তী নদীর ভাঙনে বসতভিটা হারানোর ঝুঁকির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ এলাকায় খুব কমই আছেন সংসদ সদস্য।
এ অবস্থায় বাবুগঞ্জ–মুলাদী আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, তার নির্বাচনী এলাকার নদী ভাঙন প্রবণ স্থানগুলোতে চলমান জরুরি প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের অগ্রগতি তদারকির পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে বাবুগঞ্জ বাজার, দেহেরগতি, কেদারপুর, বাহেরচর ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নদীভাঙনের মাত্রা যাচাই করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে এ বিষয়ে জয়নাল আবেদীন এমপির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সড়ক যোগাযোগের দুর্ভোগও দুই উপজেলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১৫ অক্টোবর বাটাজোড় বাজার থেকে আগরপুর হয়ে সরিকল বাজারের পথে চলাচল করতে গিয়ে সড়কটির সংকীর্ণতা ও বিভিন্ন স্থানে ভাঙনের চিত্র দেখা যায়। কোথাও রাস্তা এতটাই সরু যে বিপরীত দিক থেকে ট্রাক কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি এলে অন্য যানবাহনকে থামিয়ে জায়গা করে দিতে হয়। কোথাও সড়কের দুই পাশ ভেঙে গেছে, আবার কোথাও খাল পাড় ভেঙে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে ইজিবাইকসহ ছোট যানবাহনগুলোকে ধীরগতিতে উল্টে পরা ভয় নিয়ে চলতে হয় এবং যাত্রীদের চোখেমুখে তখন রীতিমতো আতঙ্ক ভর করে।
সরিকল বাজার এলাকার বাসিন্দা ও কবি মোস্তফা হাবিব বলেন, বাটাজোড়–আগরপুর–সরিকল সড়কটি সাধারণ মানুষের বহুল ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগ পথ। এটি শুধু গৌরনদীর সরিকল এলাকার মানুষের নয়, বাবুগঞ্জ উপজেলার বহু মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরিকলে যাতায়াতের আরেকটি পথ সরিকল–নলচিরা সড়ক, যা স্থানীয়ভাবে নাভানা সড়ক নামেও পরিচিত।
সড়কটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জহির উদ্দিন স্বপন জানান, এর অপ্রতুল প্রশস্ততা ও বিভিন্ন স্থানে দুই পাশ ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি তার নজরে এসেছে। সড়কটির সংকীর্ণতার কারণে তাকেও অনেক সময় এই পথ এড়িয়ে চলাচল করতে হয়, কারণ তার গাড়ি চলাচলের সময় একই পথে থাকা অন্য যানবাহনের চলাচলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সড়কটি প্রশস্তকরণসহ আরও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া নিজ এলাকার নদী ভাঙন কবলিত এলাকা সম্পর্কেও সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন বলে জানান তিনি।
এলাকাবাসীর মতে, সড়ক উন্নয়ন ও নদীভাঙন প্রতিরোধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। নদীভাঙনে সড়ক ও সেতুর সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারে আসা-যাওয়া এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হতে পারে। আবার সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি নদীতীরের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন করে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।
তাই গৌরনদী–আগৈলঝাড়া আসনের সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপনের কাছে এলাকাবাসীর দাবি, সরিকল ও আশপাশের নদী ভাঙন কবলিত এলাকায় পরিদর্শনের পর গৃহীত উদ্যোগগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হোক। প্রথম ধাপে ঘোষিত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি কুড়ির চর, হোসনাবাদ, বোরাদী গরঙ্গল ও বিল্বগ্রামসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে বাটাজোড়–আগরপুর–সরিকল সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি স্পষ্ট করা হোক।
অন্যদিকে বাবুগঞ্জ–মুলাদী আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের উদাসীনতা কষ্ট পাচ্ছেন তার ভোটাররা।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকেই তাই আহ্বান জানিয়েছেন, বাবুগঞ্জের নদী ভাঙন প্রবণ জনপদ ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ জোরদার করা হোক। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষা এবং সড়ক যোগাযোগ সচল রাখার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, যেহেতু গৌরনদী ও বাবুগঞ্জের সমস্যা এক। তাই দুই সংসদ সদস্যের সমন্বিত উদ্যোগে নদী ভাঙন প্রতিরোধ, সড়ক উন্নয়ন ও যোগাযোগ অবকাঠামো সুরক্ষায় কার্যকর অগ্রগতি হবে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮