আরিফ আহমেদ,
‘নিজের পরিচয়কে ভালোবাসি, অন্যের পরিচয়কেও শ্রদ্ধা করি, এটাই শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের আদর্শ।’ এই আদর্শ ধারণ করে সমাজে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন বরিশালে আয়োজিত স্মরণসভা ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বক্তারা।
এসময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড মামুন অর রশিদ, শের ই বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এর মতো নেতৃত্ব তৈরির জন্য তরুণ প্রজন্মের প্রতি ফজলুল হক এর জীবনাদর্শ অনুসরণ এর আহ্বান জানান।
অবিভক্ত বাংলার প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, গণমানুষের নেতা ও বাংলার বাঘ শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ৩১ অক্টোবর শনিবার বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এই স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা শেরেবাংলার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, শিক্ষা বিস্তারে অবদান, কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বাংলার বাঘ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ। কবি, লেখক ও গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান আবদুল বাতেন, চাখার ফজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন, বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান, শেরেবাংলা স্মৃতি একাডেমির আহ্বায়ক এইচ এম রেজাউল করিম, গবেষক মোসলেম উদ্দিন এবং জাদুঘরের ট্রাস্টি আরিফুর রহমান আরিফ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ বলেন, আমরা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সম্পর্কে জানি, তার অসংখ্য অবদান সম্পর্কেও জানি। কিন্তু তার গুণাবলি সম্পর্কে জেনে আমরা কতটুকু অনুসরণ করছি? কিছু না হোক, তার জীবনের ছোট ছোট শিক্ষার দিকগুলো নিয়ে ভাবতে পারি, সেগুলো অনুসরণ করতে পারি। আমাদের দেশে শেরেবাংলা, মাওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতা আর কেন তৈরি হয় না, সেই বিষয়টিও আমাদের ভাবতে হবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান আবদুল বাতেন তার বক্তব্যে শেরেবাংলার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের গুরুত্ব তুলে ধরেন। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ প্রস্তাব একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
বক্তারা বলেন, শেরেবাংলা কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে তার উদ্যোগ ছিল সুদূরপ্রসারী। কলকাতায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ফজলুল হক মুসলিম ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা, নারীশিক্ষার প্রসারে লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ ও নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল তার নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪০ সালে চালু হওয়া এই আবাসিক হলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাচীন হল। অন্যদিকে ১৯৩৯ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত লেডি ব্রাবোর্ন কলেজের পেছনেও শেরেবাংলার বিশেষ উদ্যোগ ছিল। মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে তার এই ভূমিকা সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার ছিল শেরেবাংলার পৈতৃক নিবাস। এই গ্রামকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি নিজের বসতভিটা ও পৈতৃক সম্পত্তির বড় অংশ শিক্ষার কাজে দান করেন। ১৯৪০ সালে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন ফজলুল হক কলেজ, বর্তমানে সরকারি ফজলুল হক কলেজ। পাশাপাশি ছেলেদের জন্য চাখার ফজলুল হক ইনস্টিটিউশন এবং মেয়েদের জন্য ওয়াজেদ মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। চাখারে একটি গণগ্রন্থাগার, পাঠাগার, গ্রামীণ পুনর্গঠন সমিতি ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও ছিল তার। তার স্মৃতি ও জীবনকর্ম সংরক্ষণে সেখানে রয়েছে শেরেবাংলা স্মৃতি জাদুঘর। এসব প্রতিষ্ঠান আজও চাখারের সঙ্গে শেরেবাংলার শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ঐতিহাসিক সম্পর্ক বহন করছে।
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। তার পিতা কাজী মুহাম্মদ ওয়াজেদ ছিলেন বরিশালের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। শৈশব থেকেই মেধাবী ফজলুল হক বরিশাল জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। আইনশাস্ত্রেও ডিগ্রি অর্জনের পর আইন পেশায় যুক্ত হন।
রাজনীতিতে প্রবেশের পর তিনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী, কলকাতার মেয়র, পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠা, ঋণগ্রস্ত কৃষকদের সুরক্ষা, শিক্ষা বিস্তার এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে তার ভূমিকা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এই বরেণ্য রাজনীতিবিদ। ঢাকার তিন নেতার মাজারে তাকে সমাহিত করা হয়।
এসব তথ্য তুলে ধরে বক্তারা আরও বলেন, শেরেবাংলার জীবন ও কর্ম কেবল জন্ম-মৃত্যুর তারিখ কিংবা রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তার মানবিক গুণাবলি, উদারতা, অন্যের মত ও পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। বর্তমান সমাজে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার বিপরীতে শেরেবাংলার সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের দর্শন চর্চা করা জরুরি।
বরিশালের বিশিষ্ট সাংবাদিক আনিসুর রহমান স্বপন, মুরাদ আহমেদ, আজাদ আলাউদ্দিন, কবি শফিক আমিন, পথিক মোস্তফা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার ও সংগঠক বাহাউদ্দীন গোলাপ, সংগঠক শাহিন ভূইয়সহ আরো অনেক কবি সাহিত্যিক এই আয়োজনকে প্রানবন্ত করে তোলেন। আলোচনা শেষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গুণীজনদের সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮