মো: আব্দুর রহিম, শরীয়তপুর প্রতিনিধি:
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বিল ছাড়ের নামে প্রতিটি প্রকল্প থেকে ৫ শতাংশ অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) অফিসের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার উপ-সহকারী উজ্জ্বল মন্ডল ও অফিস সহকারী আনোয়ারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত এই অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ফাইল আটকে রাখা হয় এবং বিল ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করা হয়।
ভুক্তভোগী একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান ও সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কাবিখা, কাবিটাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ করার পরও তারা সময়মতো বিল পাচ্ছেন না। অফিসের উপ-সহকারী উজ্জ্বল মন্ডল ও অফিস সহকারী আনোয়ার প্রতিটি প্রকল্পে ৫ শতাংশ অর্থ দেওয়ার জন্য চাপ দেন। টাকা না দিলে কখনো কাগজে ত্রুটি, কখনো স্বাক্ষরের অজুহাত দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। কমিশনের টাকা দিলে প্রকল্পের সভাপতি কিংবা সংশ্লিষ্ট কাউকে প্রয়োজন হয় না।
সরেজমিন,স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামীণ সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারের কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তুু সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বা আংশিক সমাপ্ত না করেই পুরো বিল প্রদান করেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা( পিআইও) অফিস । এবছর ভেদরগঞ্জের সব ইউনিয়নে গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকার কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৮৩ দশমিক ৫৩ টন গম যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২৯ লাখ ২৩ হাজার ৫৫০ টাকা, কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৮৩ দশমিক ৫৩ টন চাল যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২৯ লাখ ২৩ হাজার ৫৫০ টাকা ও কাবিটা প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৪০ লাখ ৫১ হাজার ৩৯ টাকা বরাদ্ধ দেয় সরকার। কিন্তু উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অফিসের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার উপ-সহকারী উজ্জ্বল মন্ডল ও অফিস সহকারী আনোয়ার সহ দপ্তরের ব্যক্তিবর্গের
যোগসাজসে কাবিখা ও কাবিটার কাজ আংশিক বা পুরো সম্পন্ন না করেই বিল প্রদান করেছেন পিআইও। যেসব সড়কে প্রকল্পের আওতায় সংস্কার হওয়ার কথা তার আশেপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউই জানেন না যে সড়কগুলো সংস্কার হয়েছে। অথচ কাগজপত্রে সড়ক হয়ে গেছে। সব ইউনিয়নের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সড়কে ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কাজ হয়েছে আংশিক আর কোথায় হয়নি কোন কাজই। শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবছরই নয় যেকোনো ধরনের কাজেই কমিশন না দিলে ফাইল আটকে দেন তারা। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকারের অর্থ অপচয় হচ্ছে। স্থানীয়রা বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তারাবুনিয়া এলাকার মানিক গায়েন বলেন, গত ৩-৪ বছরে এই সড়কে কোনো কাজ হয়নি। এক কোদাল মাটিও কাটা হয়নি। আমি সব সময় এই সড়কের কাছে থাকি, আমার দুই চোখে আমি দেখিনি যে এই সড়কে কাজ হয়েছে। এখন আপনারা বলতেছেন, কাজ হয়ে গেছে। কাজটা হলো কখন? গত ৩-৪ বছর ধরে একই চিত্র সড়কের। বৃষ্টি বাদলে আমাদের নৌকা দিয়ে চলাফেরা করা লাগে। এবছরও নৌকা লাগবে। অনেকে ইতোমধ্যে বর্ষার জন্য নৌকা বানাতে দিয়েছেন। সড়ক হলে তো আর নৌকা বানাতে দিত না।
আফা মোল্লা বাজার এলাকার আব্দুস সালাম বলেম, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করি। যদি কেউ সড়কে কাজ করত, তাহলে আমি দেখতে পেতাম। যদি গভীর রাতেও কেউ কাজ করে থাকেন, তাহলে তারও কোনো প্রমাণ সড়কে দেখা যায়নি। কাগজপত্রে অনেক কিছুই হয়, বাস্তবতা ভিন্ন জিনিস।
জানতে চাইলে এক ঠিকাদার বলেন, “কাজ শেষ করেও মাসের পর মাস বিল পাওয়া যায় না। পার্সেন্ট না দিলে ফাইল নড়ে না—এটাই বাস্তবতা।”
ঠিকাদারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে অর্থ আদায় করা হলেও ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, পিআইও অফিসের মাধ্যমেই প্রকল্পের বিল ছাড় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী উজ্জল মন্ডলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বিল প্রদান করার নিয়ম আছে বিধায় আমরা বিল প্রদান করেছি। যদি কেউ বিল নিয়ে কাজ না করেন, তাহলে লাল তালিকা করে টাকা ফেরত আনবে সরকার। কাজ না করে বিল দেওয়া যায়, এমন প্রমাণপত্র চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন উজ্জল মন্ডল। তিনি পুরো বিষয়টির বক্তব্য না দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে অফিস থেকে চলে যান। এসময় তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে তাদের ছবি তুলে রাখেন। তবে আরেক অভিযুক্ত অফিস সহকারী আনোয়ার হোসেন এবিষয়ে কথা বলতে রাজি হয় নি।
ভেদরগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাসান আহমেদ বলেন, কাজ না করে বিল উত্তলন করার সুযোগ নেই। যদি কাজ না করে কেউ বিল নিয়ে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমার অফিসের কেউ অনিয়মের সাথে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে ভেদরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহি অফিসার (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, কিছু অভিযোগের বিষয়গুলো আমি শুনেছি। যারা কাজ না করে বিল নিয়ে গেছে, তাদের বিষয়ে আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮