শরীয়তপুর প্রতিনিধি:
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভুয়া প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে জন্মসনদ জালিয়াতি—এমন ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সেনেরচর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আবু ছাইমের বিরুদ্ধে। জন্মসনদ নামক নাগরিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি যখন টাকার বিনিময়ে জালিয়াতির হাতিয়ার হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সচিব আবু ছাইম একটি দালালচক্রের মাধ্যমে নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করেন। যেখানে প্রকৃত নাগরিকরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুরেও সঠিক জন্মসনদ পান না, সেখানে মোটা অংকের টাকা দিলেই মিনিটের মধ্যে নতুন জন্মসনদ তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, জন্মতারিখ পরিবর্তন করে বয়স বাড়ানো বা কমানো থেকে শুরু করে মিথ্যা তথ্য বসিয়ে নতুন নাগরিক পরিচয় তৈরি করে দেন তিনি।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২৬ আগস্ট সেনেরচর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রাজ্জাক ছৈয়াল নামে এক ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়। এ জন্য যাচাই হিসেবে ব্যবহার করা হয় একটি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করার ভুয়া প্রত্যয়নপত্র। কিন্তু পরে দেখা যায়, ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—এই প্রত্যয়নপত্র সম্পূর্ণ জাল এবং রাজ্জাক ছৈয়াল নামে কোনো ছাত্র তাদের প্রতিষ্ঠানে কখনো পড়াশোনাই করেনি।
আরও ভয়ঙ্কর অনিয়ম ধরা পড়ে মো. নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে। তিনি নেত্রকোণার কালমাকান্দার নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করলেও, ওই সনদের উপরের অংশ এডিট করে বসানো হয় সেনেরচর ইউনিয়নের তথ্য। শুধু তাই নয়, সেখানে সেনেরচর ইউপি সচিব আবু ছাইম ও চেয়ারম্যানের অফিসিয়াল সিল ও স্বাক্ষরও যুক্ত করা হয়। যা প্রশাসনিক জালিয়াতির ভয়াবহ উদাহরণ।
ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ রয়েছে, সচিব আবু ছাইম ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলেন। টাকা না দিলে নানান অজুহাতে তাদের জন্মনিবন্ধন মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। অথচ দালাল ও ঘনিষ্ঠ মহলের মাধ্যমে যারা টাকা দেয়, তারা মুহূর্তেই সনদ হাতে পেয়ে যায়।
পরিচয় প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ক্ষুব্ধ অভিভাবক বলেন, “আমাদের বাচ্চাদের সনদ করতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুরতে হয়। অথচ যারা টাকা দেয়, তাদের বয়সও বদলে যায়, আবার মিথ্যা তথ্যেও সহজেই সনদ পাওয়া যায়। এটা তো খোলাখুলি বাণিজ্য!”
সচেতন মহলের ব্যক্তিরা বলেন, একটি শিশুর জীবনের প্রথম নাগরিক পরিচয় হলো জন্মসনদ। অথচ সেই নথি যদি ভুয়া তথ্য, টাকার প্রভাব আর দালালচক্রের হাতে বিক্রি হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, ভোটার তালিকা, পাসপোর্ট, শিক্ষাজীবন এমনকি চাকরির ক্ষেত্রেও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সেনেরচর ইউপি সচিব আবু ছাইমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তাই শুধু একটি ইউনিয়নের নয়—বরং সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি বড় হুমকি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সচিব আবু ছাইম বলেন, “আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। ” তবে রাজ্জাক ছৈয়ালের ভুয়া জন্মসনদ প্রসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, “যাচাই করা হয়নি, এখন যাচাই করে দেখব।”
এবিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান জালাল জমাদ্দার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। সচিবদের প্রশিক্ষণ থাকে, তারাই ভালো বলতে পারবে।” আমি সব সময় বলে দেই যাতে আমার জনগণ এর ভোগান্তি না হয়।
জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাবেরী রায় বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. ওয়াহিদ হোসেন জানান, “বিষয়টি আমি আপনাদের কাছেই শুনলাম। তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮