মো: আব্দুর রহিম, শরীয়তপুর প্রতিনিধি,
জাটকা আহরণে বিরত থাকা জেলে পরিবারকে মানবিক সহায়তা কর্মসূচীর আওতায় মাসিক ৪০ কেজি হারে দুই মাসের মোট ৮০ কেজি করে ভিজিএফ (মৎস্য) চাল বিতরণ করে সরকার। এ চাল বিতরণে জেলেরা অনিয়মের অভিযোগ তুললে এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা হয় । এরপর উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তদন্ত কমিটি অনিয়মের সত্যতা পায়। কিন্তু তদন্ত রিপোর্টে অনিয়মের সত্যতা ২ মাস আগে পেলেও রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ রয়েছেন ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাফিজুল হক। বিষয়টি নিয়ে ইউএনও দাবি করেছেন তিনি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাননি। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে আসা নথিতে প্রমাণ রয়েছে যে, উপজেলা প্রশাসন তদন্ত প্রতিবেদন অফিশিয়ালভাবে পেয়েছেন।
ঘটনার শুরু গত ৩ মার্চ। এদিন সকাল ৮ টা থেকে ট্যাগ অফিসার ভেদরগঞ্জ উপজেলার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান সরকারের উপস্থিতিতে উপজেলার সখিপুর থানার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণের কথা থাকলেও ট্যাগ অফিসারের অনুপস্থিতে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চাল বিতরণ করা হয়। এতে চাল বিতরণে সংশ্লিষ্ট প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দর খানসহ অন্যান্য ইউপি সদস্যরা প্রত্যেক জেলেকে ৪ থেকে ১০ কেজি চাল কম দেয়, যার প্রেক্ষিতে সুবিধাভোগী জেলেরা অভিযোগ তোলে। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে উপজেলা প্রশাসন ভেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে.এম রাফসান রাব্বি ও উপজেলা জেষ্ঠ্য মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ইমরানকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেখানে উল্লেখ করা হয় আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। তদন্ত কমিটি ভূক্তভোগী জেলে, সংবাদ কর্মী ও অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা পায়। এরপর তদন্ত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা প্রশাসনের কাছে প্রেরণ করে। যার ডকেট নং ৪৩২। তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করার পর প্রায় ২ মাস পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে রহস্যজনকভাবে চুপ রয়েছেন ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাফিজুল হক। বিষয়টি নিয়ে জানার জন্য ইউএনওকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, চাল বিতরণে অনিয়মের ঘটনায় তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এখনও তিনি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাননি। তাই পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
এঘটনার তদন্ত কমিটির সদস্য উপজেলা জেষ্ঠ্য মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরী করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমাকে ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রাফসান রাব্বি মহোদয়কে। আমরা তদন্ত করে তা প্রতিবেদন আকারে উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছি। এখন ইউএনও মহোদয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
বিষয়টি নিয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রাফসান রাব্বি বলেন, আমি ঘটনা জানতে পেরে ঘটনারই দিনই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলাম। এরপর পরবর্তীতে আমাকে ও মৎস্য কর্মকর্তাকে তদন্ত করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হলে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন তৈরী করে সঠিক সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। এখন পরবর্তী কাজ ওই দপ্তরের।
দক্ষিণ তারাবুনিয়া এলাকার জেলে রাজিব হোসেন (২৩) বলেন, আমরা একদিকে নিরক্ষর অশিক্ষিত। মাছ ধরে কোনো মতে সংসার চালাই। আমাদের হক মেরে খেয়েছে চেয়ারম্যান ও ট্যাগ অফিসার। এঘটনায় প্রশাসন তদন্ত করে সত্যতা পেলেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ইউএনও চুপ করে আছেন। এর কারণ হলো আমরা নিরক্ষর গরীব জেলে। যদি অন্য কেউ হতো তাহলে এমন সাহস ইউএনও পেত না। আল্লাহর কাছে বিচার দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নাই।
নুরুদ্দি এলাকার ইমন হোসেন (৩৩) নামে আরেক জেলে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর থেকে এই ইউনিয়নে জেলেদের চাল ৮-১০ কেজি করে কম দেয়। আমরা ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারি না। কেউ প্রতিবাদ করলে চেয়ারম্যানের লোকজন আমাদের হুমকি ধামকি দেয়। পত্রিকায় নিউজ প্রকাশ হলে এনিয়ে তদন্ত কমিটি হয়। আমাদের কাছে জানতে চাইলে আমরা তদন্ত কমিটির কাছে অনিয়মের সাক্ষী দিয়েছি। কিন্তু তিনদিনের তদন্ত আজ দু-মাসের বেশি হলেও এখনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিচার না হলে এই ঘটনা সবসময় ঘটবে।
এবিষয়ে সিসিএস এর শরীয়তপুর জেলার কো অর্ডিনেটর মো. মিরাজ শিকদার বলেন, গরীব জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পরেও রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন চুপ থাকা মানে রহস্যজনক বিষয়। গরীব জেলেদের সঙ্গে যারা অনিয়ম করেছে, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বিষয়টি উর্ধ্বতন দপ্তর খতিয়ে দেখবে বলে আমার বিশ্বাস। এইধরনের অনিয়মে ছাড় দেওয়া হলে এই ঘটনার নিয়মিত ঘটবে।
বিষয়টি নিয়ে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মিজ তাহসিনা বেগম বলেন, জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। এটি আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমি ইউএনওর সাথে কথা বলে দেখি তিনি রিপোর্ট পেয়েছে কি না। যদি রিপোর্ট পাওয়ার পরেও কোন ব্যবস্থা না নিয়ে গাফিলতি করে তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনগন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ৪ মার্চ শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা সখিপুর দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নে ইলিশ শিকার থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক জেলের ৮০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয় প্যানেল চেয়ারম্যান, ট্যাগ অফিসার, সচিব ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে প্রত্যেক জেলেকে ৮ থেকে ১০ কেজি চাল কম দেওয়ার অভিযোগ উঠে। উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে পদ্মা ও মেঘনা নদীর অভয়াশ্রমে মাছ ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা থাকবে। নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার থেকে প্রত্যেক জেলেকে ৮০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খান ১ হাজার ৫০ জন নিবন্ধিত জেলের প্রত্যেককে ৮ থেকে ১০ কেজি চাল কম দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে চাল বিতরণের কথা, কিন্তু ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেদরগঞ্জ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান সরকার উপস্থিত হওয়ার আগেই সকাল ৭টা থেকে চাল বিতরণ শুরু করেন সেকান্দার খান ও তাঁর লোকজন। চাল মেপে দেওয়ার কথা থাকলেও তা না করে ইচ্ছেমতো বিতরণ করেন চেয়ারম্যান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অনিয়মের সত্যতা পান গণমাধ্যমকর্মীরা। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুল হককে জানালে তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রাফসান রাব্বি ও সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ইমরানকে ঘটনাস্থলে পাঠান। তারা এসে চাল বিতরণে অনিয়মের সত্যতা পান। এরপর তাঁরা দাঁড়িয়ে থেকে বাকি জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ করেন। ট্যাগ অফিসার উপস্থিত হওয়ার আগে চাল বিতরণ, ওজনে কম দেওয়াসহ অনিয়মের বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খানকে জিজ্ঞাসা করা হলে সদুত্তর দিতে পারেননি।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮