সালমান মির্জা, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি,
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি বিভিন্ন শিশু খাদ্যসামগ্রী। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এবং গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে নিম্নমানের ফলের জুস, রঙিন ড্রিংক, লাচ্ছি, ললিপপ, চিপস, চকলেট, ক্যান্ডি, চাটনি, চুইংগাম, ভাজা চিপস, ওয়েফার, লিচু, ডেইরি ও আইস পপসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। যা শিশুদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে এবং তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
শিশুরা না বুঝে এবং রংবেরঙের মোড়ক ও খেলনার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এসব বিষাক্ত খাদ্যসামগ্রী কিনে খাচ্ছে। এমনকি গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষও বুঝে বা না বুঝে শিশুদের মুখে তুলে দিচ্ছেন খাবার নামক এসব বিষ। যার ফলে এসব খাবার খেয়ে শিশুরা ডায়রিয়া, আমাশয় ও বমিসহ নানা পেটের পীড়ায় ভুগছে। দীর্ঘদিন এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে তারা জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করা যায় না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শিশুরা এসব খাবার খেলে নানা রকম পেটের অসুখ দেখা দেয়। এছাড়া দীর্ঘদিন এসব খাবার গ্রহণের ফলে তাদের ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়, স্নায়ু দুর্বল হয়, মেধাশক্তি কমে যায়, পাকস্থলীতে আলসার হয় এবং একসময় কিডনি অকেজো হয়ে পড়ে। পাশাপাশি এটি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও রক্তকোষ বিকাশে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
মঙ্গলবার উপজেলার মেইন রোড, মধ্য বাজার, মুড়ি হাটা ও গাজী সুপার মার্কেট সংলগ্নসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, বাহারি মোড়কে এসব ভেজাল খাদ্যসামগ্রী খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে ও আশপাশের মুদি দোকান, ভ্যারাইটিজ স্টোর, কনফেকশনারি এবং চায়ের দোকানে এসব শিশুখাদ্য বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
এসব খাদ্যপণ্যে আকর্ষণীয় মোড়ক ও রংবেরঙের প্যাকেটজাত করা হলেও তার গায়ে থাকে না উপকরণের তালিকা, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ কিংবা সরকারের বিএসটিআই অনুমোদিত সিল। আবার কোনো কোনো শিশু খাদ্যের প্যাকেটে বিএসটিআইয়ের সিল দিয়ে প্রতারণাও করা হচ্ছে। অর্থাৎ বিএসটিআইয়ের সিলের নিচে লেখা থাকে 'বিএসটিআই অনুমোদিত নয়', যা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে না তাকালে বোঝাই যায় না।
একদিকে মানহীন ও অনুমোদনহীন ভেজাল খাদ্যসামগ্রী, অন্যদিকে এসব শিশু খাদ্যের প্যাকেটে প্লাস্টিকের খেলনা সামগ্রী দিয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবারকে আরও বেশি বিষাক্ত করে তোলা হচ্ছে। মুখরোচক এসব শিশু খাদ্যের প্রচুর চাহিদা থাকায় তা নির্বিঘ্নে বিক্রি হচ্ছে। এসব নিম্নমানের পণ্যের বেচাকেনা বাড়াতে খুচরা ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করার জন্য লাভজনক ও আকর্ষণীয় অফারও দেওয়া হচ্ছে।
শিশুরা না বুঝে এসব খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করছে, আর অভিভাবকরাও শিশুদের বাহানার কাছে অসহায় হয়ে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এসব নিম্নমানের ভেজাল ও নকল খাদ্য শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। ফলে শিশুরা দিন দিন স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং পুষ্টিহীনতা ও পেটের পীড়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সন্তানের সুস্বাস্থ্য নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছেন অভিভাবকরা।
নকল ও মানহীন শিশুখাদ্য প্রতিরোধে মাঝে মধ্যে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অভিযান নজরে এলেও, উৎপাদনকারী কারখানা, জেলা ও উপজেলার সদরে পাইকারি বিক্রয়ের স্থান এবং খুচরা পর্যায়ে জোরালো কোনো অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না। এছাড়া জনসচেতনতায় দৃশ্যমান কোনো প্রচার-প্রচারণা বা কর্মসূচি না থাকায় এগুলো দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সচেতন মহল মনে করেন, কিছু বিবেকহীন মুনাফালোভী মানুষ ব্যবসার নামে হরহামেশা এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর ও মানহীন খাবার তৈরি করে বিক্রি করছেন, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল হুমকি। সবার সামনে এসব শিশুখাদ্য ক্রয়-বিক্রয় হলেও অজ্ঞাত কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না এবং অভিভাবক হিসেবে আমরাও সচেতন হচ্ছি না।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বলেন, অস্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিহীন খাবারে শিশুর পেটের অসুখ ও ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। এছাড়া দীর্ঘদিন এসব খাবার খেলে পাকস্থলীতে আলসার হয় এবং একসময় কিডনি অকেজো হয়ে যায়। এতে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই ঘরে তৈরি খাবার শিশুকে খাওয়ানোর জন্য অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
রায়পুরের সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব অস্বাস্থ্যকর ও ভেজাল শিশু খাদ্যের লাগাম টেনে না ধরা হলে আগামী প্রজন্মের জন্য তা এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮