জহিরুল ইসলাম খান, কলামিস্ট:
যুদ্ধ একসময় থেমে যায়। কারন যুদ্ধের ও আয়ু থাকে। এখন যা কিছু দেখতে পাচ্ছে বিশ্ব তা প্রদীপ নিভে যাওয়ার পূর্বে দপ করে জ্বলে ওঠার অবস্থা। ইরান-আমেরিকা- ইসরাইলের এই অসম যুদ্ধ ও শেষের দিকে। যেকোন সময় ঘরে ফেরার ডাক পড়বে যুদ্ধের ময়দানে ব্যস্ত সৈনিকদের। হাফ ছেড়ে বাঁচবে বিশ্ব। শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। তৈরী হবে নতুন সম্ভাবনা।
আমেরিকা মূলত খালি হাতে ঘরে ফিরতে চাইছে না। সেক্ষেত্রে মার্কিন জনগনের ৩১.২ বিলিয়ন ডলার খরচের মাসুল গুনতে হবে ট্রাম্পকে। সরকারের উপর তেতে থাকা মার্কিন জনগন বিনা লাভের এই যুদ্ধের খরচ বহন করতে চাইবে না। মার্কিন জনগন ষোলয়ানা লাভ ছাড়া বোধকরি কিছুই বোঝে না। ইরানের বিপক্ষে মার্কিন জনগনের সমর্থন না পাওয়ার প্রধান কারন মূলত এটাই। No investment without profit অথবা Return on investment নীতির কারনে।

মার্কিন জনগন বুঝতে পেরেছে ইরান যুদ্ধ আমেরিকার লাভের পাল্লা শূন্য। মধ্য প্রাচ্যে ইসরাইল ফার্স্ট নীতি এ যাত্রায় মার্কিনীদের ডুবিয়েছে। মার্কিন জনগনের কোন নীতিবোধ আছে বলে নিকট অতীতে এমন উদাহরন পাওয়া যায় না। ফিলিস্তিনের উপর গনহত্যাকে ওরা কখনো প্রটেস্ট করেনি। বরংচ ফিলিস্তিনি গনহত্যাকে মার্কিনীরা ইসরায়েলের আত্মরক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করেছে বিশ্ববাসীর সামনে।
গত জানুয়ারি ২০২৬ এ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদূরোকে স্ব-স্ত্রীক অপহরন করে নিউইয়র্কে আদালতে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে। কোন মার্কিনী এর প্রতিবাদ করেনি। কারন এতে ভেনেজুয়েলার তেল সমৃদ্ধ খনিগুলো মার্কিনীরা দখল করেছে। আামেরিকানদের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কমেছে খরচের খরগ। ২০০৩ সালে ইরাক এবং ২০০৮ সালে লিবিয়া আক্রমণকে মার্কিন জনগন সমর্থন দিয়েছে একই কারনে। বুমেরাং হয়েছে কেবল ভিয়েতনাম আর আফগানিস্তান যুদ্ধ। ২০০০ সালে শুরু হওয়া আফগানিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধে আমেরিকার অর্জন শূন্য। আফগানিস্তানের তেল গ্যাস পাহাড়ি উপত্যকা পেড়িয়ে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার খরচ কুলিয়ে উঠতে না পেরেই বরং ২০২৪ সালে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী।
ট্রাম্পের অসংলগ্ন আচরনকে অনেকেই পাগলামী কিংবা বোকামি ভেবে ভুল করেন। কারন সে পুরোদস্তুর একজন ব্যবসায়ী। কখন কি বললে আদতে সে লাভবান হবে সেই ছক কষেই সে কথা বলে। ইরান যুদ্ধে মূলত স্থবির হয়ে যাওয়া অস্ত্রনির্মাতা কোম্পানিগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধে ঠিক যেমনটা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধে আমেরিকার জনগন স্পষ্টতই বুঝতে পেরেছে এবার আর ইরানের তেলক্ষেত্রগুলো দখল করা মোটেই সম্ভব নয়। তারমানে হিসেবটা সহজ মার্কিন জনগনের কোন লাভ আদতে হচ্ছে না। লাভ না থাকলে যুদ্ধের খরচ কেন বহন করবে সাধারণ জনগন। শুধুমাত্র এই কারনে মার্কিন প্রশাসন সাধারণ জনগনের সমর্থন হারিয়েছে।
মার্কিনীদের কাছে এপস্টেইন কারসাজি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। ওদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বার্থ। ওদের স্বার্থরক্ষা হলে সবকিছু জায়েজ।

বুমেরাং হয়েছে মূলত ট্রাম্পের গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে। অন্যথায় সে বরং হিসেব নিকেশ করেই নেমেছিলো যুদ্ধের ময়দানে। সিআইএ এর রিপোর্ট কে পাত্তা না দিয়ে ট্রাম্প মূলত ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের রিপোর্টের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল যা পরবর্তীতে ধোয়াশায় রুপ নেয়। ইরানের অস্ত্র ভান্ডার আর প্রতিরোধের জন্য মার্কিনীরা মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।
অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি আলোচনার টেবিলেও মার্কিনীদের ভেলকি দেখিয়ে ছেড়েছে। ইরান এখনো পর্যন্ত তাদের পয়েন্ট অব অর্ডার থেকে এক চুলও নড়েনি। দিন যত গড়াচ্ছে আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের নাজেহাল অবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে আরো প্রকট হয়ে উঠছে। আমেরিকার শেষ ১৪ দফা প্রস্তাবে ইরানের যুদ্ধ ব্যয়, সকল অবরোধ সরানো, আটকে থাকা মূলধন ফেরত, স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। যাতে মার্কিনীদের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি ত্রাহি অবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরান ইউরেনিয়াম ইস্যুতে ছাড় দিতে নারাজ। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনীদের উপস্থিতিও সহ্য করবে না মর্মে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। আমি পূর্বে ও বলেছিলাম এই যুদ্ধ মূলত বিকেন্দ্রীকরণ বিশ্ব ব্যবস্থার জন্ম দিবে। যা মূলত রাশিয়া ইরান চীন কেন্দ্রিক হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান হবে একমাত্র পরাশক্তি। GCC ভুক্ত দেশগুলোতে ইরানের প্রভাব বাড়বে। অন্যদিকে একা হয়ে পড়বে আরব আমিরাত ও জর্ডান। কিন্তু শেষ মেষ ইরানের এই বলয়ে তারাও প্রবেশ করবে।

গত ১১ এপ্রিল ২০২৬ এ এক অভুতপূর্ব ঘটনার স্বাক্ষী হয় বিশ্ব। মুহুর্মুহু পাকিস্তানের কার্গো বিমানগুলো সৌদি আরবের বিমান ঘাটিতে অবতরন করে। অথচ ইরান কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি এই বিষয়ে। কারন চলমান যুদ্ধের মাঝখানে এই ধরনের ঘটনা চিন্তার খোরাক যোগানোর জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কিন্তু ইরানের চুপচাপ থাকা ভিন্ন কিছু নির্দেশ করেছিলো তখনই। সবশেষে জানা যায় সৌদি আরব আমেরিকার উপর থেকে আস্থা ফিরিয়ে নিয়েছে। এবং পাকিস্তানের দিকে ঝুকেছে মূলত এই কারনে যে মার্কিনীরা সৌদির সম্পদ রক্ষা করার বদলে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় সৌদিকে ব্যবহার করছে। ১৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য বর্তমানে সৌদিতে অবস্থান করছে। এতে ইরানের প্রত্যাশার প্রতি সৌদির সমর্থন স্পষ্ট হয়েছে। সৌদি বর্তমানে আমেরিকাকে তাদের বিমানঘাঁটি এবং আকাশসীমা ব্যবহারে অনুমতি থেকে সরে এসেছে।
আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের পর প্রচুর সম্ভাবনার তৈরী হয়েছিলো। সেই যুদ্ধ বন্ধে বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারল জিয়াউর রহমানের অবদান অসামান্য। তিনি এবং ইয়াসির আরাফাত মূলত ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে মুখ্য ভুমিকা পালন করেছিলেন। কুয়েতে তৎকালীন প্রায় লাখ খানেক শ্রমিক রপ্তানি করেছিলো বাংলাদেশ। তাদের অনেকে এখনো কুয়েতে কর্তব্যরত আছেন। এদের মধ্যে ছিলো ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার এবং সাধারন শ্রমিক। এবারো এমনটা ঘটবে তা প্রায় নিশ্চিত। এবং বর্তমান সরকারের বিভিন্ন আলোচনা শুনলে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে সরকার সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে।

যুদ্ধ শেষে আমেরিকার একক মোড়লীপনা বন্ধ হবে। ন্যাটো ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা ইতোমধ্যে ডালপালা ছড়িয়েছে। ইতালি, ফ্রান্সের মত দেশগুলো ইতোমধ্যে ইরানের সাথে আলাদা যোগাযোগ তৈরীর চেষ্টা করছে। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচী কে টেলিফোনে যোগাযোগ করেছেন। এগুলো মূলত ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনীতিকে বাচানোর পজিটিভ এ্যাপ্রোচ। অন্যদিকে BRICS এর উত্থান ঘটবে নিশ্চিত। ইরানের অর্থনীতি প্রান ফিরে পাবে। ইরান হয়ে উঠবে বিশ্বের চতুর্থ পরাশক্তির দেশ।
এসব আপাতদৃষ্টিতে অকল্পনীয় মনে হলেও সময়ের সাথে সবকিছু পরিস্কার হতে থাকবে। সমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। একই সাথে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আর ইজরায়েলের অস্তিত্ব সংকটও পাপ আর পূন্যের বিপরীতে প্রমান হিসেবে জানান দিবে আগামীর প্রজন্মকে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮