আরিফ আহমেদ,
ফুটবল মাঠে ফিরছে তরুণরা। মাদক, অপরাধ ও নানা সামাজিক অবক্ষয় থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে রেখে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে ‘প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’। আজ বরিশালে এ টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করলেন তিনি। এরইমধ্যে গত ৩ অক্টোবর শনিবার অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে জার্সি, ট্রফিসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন নয়, তরুণ প্রজন্মকে মাঠমুখী করার মধ্য দিয়ে তাদের একটি ইতিবাচক পরিবেশে সম্পৃক্ত রাখার লক্ষ্যও রয়েছে এ আয়োজনের পেছনে। বিশেষ করে মাদকের বিস্তার নিয়ে যখন পরিবার ও সমাজে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন খেলাধুলার মতো সুস্থ বিনোদন ও শারীরিক চর্চার সুযোগ তৈরি করে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন তরুণ যখন মাঠে থাকে, তখন তার হাতে থাকে ক্রিকেট কিম্বা ফুটবল। এতে শরীর ও মন ব্যস্ত থাকে অনুশীলন, প্রতিযোগিতা ও দলগত সাফল্যের চিন্তায়। আর এই জায়গাটিই মাদক ও অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই প্রশাসক কাপকে শুধু প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে।
বরিশাল নগরীর বিভিন্ন প্রান্তের তরুণদের এক মাঠে এনে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়, দলগত চেতনা ও নেতৃত্বের গুণাবলিও বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে নিয়মিত খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি হলে তরুণদের মাঠে ফেরানোর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পথও তৈরি হতে পারে।
তবে তরুণদের মাঠে ফেরানোর পাশাপাশি যে নগরে তারা বসবাস করে, সেই নগরকে বাসযোগ্য করে তোলার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানেই প্রশাসক হিসেবে বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের সাম্প্রতিক বিভিন্ন কার্যক্রম সামনে আসছে। বগুড়া রোড ও কাঞ্চন পার্কের ভবন নির্মাণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা এড়িয়ে পুনরায় তার কাজে স্বস্তি ফিরেছে নগরবাসীর মধ্যে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের বান্দ রোডের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও উন্নয়নকাজ গতকাল শনিবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করার লক্ষ্যেই প্রশাসকের উদ্যোগে এ কাজ শুরু হয়েছে বলে বিসিসি সূত্র জানিয়েছে।
বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে রোগী ও তাদের স্বজনরা এখানে আসেন। ফলে হাসপাতালের সামনের সড়কের উন্নয়ন শুধু একটি সড়ক সংস্কারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রোগী পরিবহন, জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল। আর এই চলাচলের দুর্ভোগ সরাসরি লাইভ তুলে ধরে প্রশাসক শিরিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবি পার্টি বরিশালের প্রতিনিধি জি এম রাব্বি। তার আহ্বানে তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়ে সড়কের কাজ শুরু করে প্রশংসায় ভাসছেন শিরিন।
অন্যদিকে নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যার সমাধানে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে নবগ্রাম রোডে। সাবেক বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রায়হান কাওছারের সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে সড়কটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও সামান্য বৃষ্টিতে সড়কের একটি অংশে পানি জমার সমস্যা থেকে যায়।
বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন নবগ্রাম রোডটি আরও উঁচু করে জলাবদ্ধতা নিরসনের উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে বর্তমানে চলছে খনন ও বালু ভরাটের কাজ।
নবগ্রাম রোডের এই উদ্যোগের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে নগরবাসীর। কারণ শুধু সড়ক উঁচু করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। সড়কের সঙ্গে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, ড্রেনের সক্ষমতা, খাল ও জলাধারের সঙ্গে সংযোগ, সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে নগরবাসীর প্রত্যাশা, এবার যেন সংস্কারের পর আবার একই জায়গায় জলাবদ্ধতার চিত্র ফিরে না আসে।
নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধেও কাজ চলছে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এবং জলাবদ্ধতা কমাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা জোরদারের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিসিসি।
বগুড়া রোডে বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে বিসিসির নিজস্ব জমিতে উন্নয়নমূলক কাজও চলছে। ভারী বর্ষায় জলাবদ্ধতা কমানোর লক্ষ্যে নতুন অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যাল পর্যন্ত রাস্তার দক্ষিণ পাশে অসমাপ্ত ড্রেনের কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিসিসি জানিয়েছে, দীর্ঘদিন দখলে থাকা জমিটি আগের প্রশাসনের সময়ে উদ্ধার করে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখন কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে নগরকে পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলতে ‘পরিচ্ছন্ন গ্রাম-পরিচ্ছন্ন শহর’ কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও তত্ত্বাবধান কমিটির জরুরি সভাও হয়েছে। ৪ অক্টোবর রোববার নগর ভবনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বিসিসি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন।
সভায় নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কার রাখা এবং নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বিসিসির কর্মকর্তা, বিভিন্ন ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
এর পাশাপাশি ৪ অক্টোবর নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কেডিসি কলোনিতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বাসস্থান পরিদর্শন করেছেন বিসিসি প্রশাসক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি জরুরি সহায়তার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
একদিকে ফুটবল মাঠে তরুণদের নিয়ে আয়োজন, অন্যদিকে নগরীর সড়ক, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কার্যক্রম, সাম্প্রতিক সময়ে বিসিসির প্রশাসকের কার্যক্রমে এ দুই দিকই দেখা যাচ্ছে।
তবে প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো মাঠের ফলাফলের বাইরে। একটি টুর্নামেন্ট শেষ হবে, একটি দল চ্যাম্পিয়ন হবে, ট্রফি উঠবে বিজয়ীদের হাতে। কিন্তু তরুণদের মাঠে ধরে রাখার যে সামাজিক উদ্যোগ, সেটি যদি নিয়মিত খেলাধুলা, ওয়ার্ডভিত্তিক ক্রীড়া কার্যক্রম এবং তরুণদের জন্য স্থায়ী মাঠ ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির দিকে এগিয়ে যায়, তাহলেই এ আয়োজনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হতে পারে।
আর এখানেই প্রশাসক শিরিনের অঙ্গীকার - খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার করতে পদক্ষেপও নিতে শুরু করেছেন তিনি। নগরীতে ছয়টি খেলার মাঠ উদ্ধার করে এই প্রস্তুতি চলবে বলে জানিয়েছেন শিরিন। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান কিংবা শাস্তি নয়, প্রয়োজন বিকল্পও। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে একজন তরুণ অবসর সময়ে মাদকের আড্ডার পরিবর্তে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল কিম্বা অন্যকোনো খেলা নিয়ে মাঠে যেতে আগ্রহী হবে, প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে, সতীর্থদের সঙ্গে সময় কাটাবে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের আয়োজনে-
প্রশাসক কাপ- সেই সম্ভাবনার একটি সূচনা হতে পারে। আর সেই সূচনার সঙ্গে যদি নবগ্রাম রোডের জলাবদ্ধতা নিরসন, হাসপাতাল সড়কের নিরাপদ চলাচল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পরিচ্ছন্ন নগর গড়ার কাজগুলোও ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে খেলাধুলার মাঠ থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগটি ধীরে ধীরে একটি বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক বরিশাল গড়ার বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮