আন্তর্জাতিক ডেস্ক,
‘ভোট চুরি’র অভিযোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসার পর এবার ভারতের সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের গাড়ি থেকে ‘পেট্রল চুরি’র অভিযোগ তুলেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ইথানল মিশ্রিত ই২০ পেট্রল বাজারজাত করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি এ অভিযোগ করেন।
রাহুল গান্ধীর দাবি, সরকার পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর কথা বললেও কংগ্রেসশাসিত কর্ণাটকের সাতটি জেলা থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষায় এর চেয়ে বেশি ইথানলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এক্সে হিন্দিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ই২০ হয়ে গেছে ৪২০—জনগণের গাড়ি থেকে পেট্রল চুরি!’ ভারতের সাবেক দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার অপরাধের কথা উল্লেখ ছিল।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্য বিতর্কে বসার চ্যালেঞ্জও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইথানল মেশানোর বিষয়টিও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এর আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
ই২০ পেট্রল হলো এমন জ্বালানি, যাতে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো হয়। আখ থেকে মূলত ইথানল উৎপাদিত হয়। অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলে ভারত কয়েক দশক ধরেই জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।
গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার জৈব জ্বালানি কর্মসূচি জোরদার করেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পেট্রলে ইথানল মেশানোর হার দেড় শতাংশেরও কম থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
তবে ই২০ পেট্রল নিয়ে গাড়িচালকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, কম ইথানলযুক্ত জ্বালানির জন্য তৈরি গাড়ির ইঞ্জিনে এই মিশ্রণ ক্ষতি করতে পারে এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়াতে পারে।
রাহুল গান্ধী বলেন, কর্ণাটক সরকার সাতটি জেলা থেকে পেট্রলের নমুনা সংগ্রহ করে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়েছে। ১৪টি নমুনার মধ্যে ১১টিতে ২০ শতাংশের বেশি ইথানল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের (আইওসিএল) নমুনায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (এইচপিসিএল) নমুনায় ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ ইথানল পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, আইওসিএল, এইচপিসিএল, বিপিসিএল, নায়ারা ও শেলসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জ্বালানিতেই নির্ধারিত সীমার বেশি ইথানল পাওয়া গেছে। কোম্পানিগুলোর নিজস্ব পরীক্ষাগারে ইথানলের পরিমাণ নিয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাহুলের দাবি, অতিরিক্ত ইথানল মেশানোর ফলে গাড়ির কার্যক্ষমতা ও মাইলেজ কমতে পারে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়তে পারে। পেট্রল পাম্পে জ্বালানিতে কত শতাংশ ইথানল রয়েছে, তা উল্লেখ করে লেবেল না থাকার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এর আগে ভারত সরকার স্বীকার করেছে, ই২০ পেট্রল ব্যবহারে জ্বালানির দক্ষতা ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে ইঞ্জিনের ক্ষতি হওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছে সরকার।
রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘মোদিজি, আমাদের বলুন—দেশের ট্যাংকে কী ঢালা হচ্ছে? পেট্রলে আসলে কতটা ইথানল রয়েছে? ২০ শতাংশের বেশি ইথানল মেশানো কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে?’
কর্ণাটকের অভিযোগ ও পরীক্ষার ফল
রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের এক দিন আগে কর্ণাটক সরকার অভিযোগ করে, বড় তেল বিপণন কোম্পানিগুলো নির্ধারিত ২০ শতাংশ সীমার বেশি ইথানলযুক্ত পেট্রল সরবরাহ করছে। পরীক্ষায় ইথানলের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ২ শতাংশ পাওয়া গেছে বলে দাবি করে রাজ্য সরকার। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কর্ণাটকের খাদ্য, সরবরাহ, ভোক্তা বিষয়ক ও আইন পরিমাপবিষয়ক মন্ত্রী রিজওয়ান আরশাদ জানান, বেঙ্গালুরু, কোলার, চিক্কাবল্লাপুর, বেঙ্গালুরু গ্রামীণ, রামনগর, মাঙ্গালুরু ও তুমাকুরু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে।
বেঙ্গালুরুর শ্রী রাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, আইওসিএলের নমুনায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং এইচপিসিএলের নমুনায় ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ ইথানল পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড ফর টেস্টিং অ্যান্ড ক্যালিব্রেশন ল্যাবরেটরিজের স্বীকৃত এবং আইএসও সনদপ্রাপ্ত।
রাজ্য সরকারের দাবি, বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় ২০ শতাংশের বেশি ইথানল পাওয়া গেছে।
তেল কোম্পানিগুলোর পাল্টা দাবি
তবে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি আইওসিএল, ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসিএল) ও এইচপিসিএল কর্ণাটক সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
তাদের দাবি, কর্ণাটকসহ তাদের খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্কে সরবরাহ করা ই২০ পেট্রল ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের আইএস ১৭০২১ মানদণ্ড মেনে চলে। ওই মানদণ্ডে ইথানলের পরিমাণ ১৯ থেকে ২১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে কোম্পানিগুলো জানায়, কর্ণাটক সরকারের উল্লেখ করা পরীক্ষার ফল নির্ধারিত আইনগত ও কারিগরি পদ্ধতি অনুসরণ করে করা পরীক্ষার মাধ্যমে সমর্থিত নয়। তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষাগারের সনদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। কোম্পানিগুলোর বক্তব্য, এসব সনদে পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে স্বাধীনভাবে ইথানলের উল্লেখিত মাত্রা যাচাই করা সম্ভব নয়।
তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর উদ্ধৃত পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ সালের ইথানল সরবরাহ বছর থেকে এ কর্মসূচির মাধ্যমে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি রুপির বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৩১৬ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেলের বিকল্প তৈরি হয়েছে, কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন প্রায় ৯৫২ লাখ মেট্রিক টন কমেছে এবং কৃষকদের ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি রুপির বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮