
চঞ্চল,
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নে ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি গার্ডার ব্রিজ এখন কয়েক হাজার মানুষের মূর্তমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে নির্মিত এই সেতুর কাজ ২০২২ সালের মে মাসে শেষ হলেও, দীর্ঘ তিন বছরেও নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী সংযোগ সড়ক। ফলে ইটাপোতা বিলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল কাঠামোটি এখন এলাকাবাসীর জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হয়েই দাঁড়িয়েছে।
অনিয়ম ও দায়সারা কাজের অভিযোগ: ২০২১-২০২২ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ইটাপোতা নবী মিস্ত্রির বাড়ির দক্ষিণে ছড়ার ওপর ১৫ মিটার দীর্ঘ এই ব্রিজটি নির্মাণের বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার চূড়ান্ত ব্যয় ধরা হয় ৬৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭০৩ টাকা ৩০ পয়সা। নিয়ম অনুযায়ী সেতুর দুই পাশে মজবুত সংযোগ সড়ক থাকার কথা থাকলেও, ঠিকাদার লিটন ইসলাম কাজ শেষে কোনো স্থায়ী সড়ক নির্মাণ করেননি। স্থানীয়দের তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ মাস পর বাঁশের ঠেকা ও কিছু বালুর বস্তার ওপর দায়সারাভাবে মাটি ও ইটের সোলিং বিছিয়ে যাতায়াতের পথ করা হয়। এলাকাবাসীর সরাসরি অভিযোগ, তৎকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও উপজেলা প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে ঠিকাদার নিম্নমানের কাজ করে বিল তুলে নিয়েছেন।
সরেজমিন চিত্র ও জনদুর্ভোগ: সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় দেড় কিলোমিটার মাটির রাস্তা পার হয়ে এই ব্রিজে পৌঁছাতে হয়, যার অনেক জায়গা ইতিমধ্যে ভেঙে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ব্রিজের দুই পাশে বাঁশের ঠেকা, বস্তা এবং কিছু আলগা ইট দিয়ে সংযোগ সড়কটি করা হয়েছে, যার দুই ধার ইতিমধ্যে ভেঙে গেছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়েই ইটাপোতা, বনগ্রাম, ছড়ারপার, খারুয়া ও বুমকা গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করেন। বর্ষাকালে রাস্তার অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয় যে, অনেক জায়গা ভেঙে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের ট্রাক্টর বা ভ্যান নিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরাও রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। সাধারণ একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও এই সেতু দিয়ে পার হতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক সময় চালক ও যাত্রীরা মিলে গাড়ি ঠেলে সেতুতে তুলতে হয়।
তীব্র ক্ষোভে ভুক্তভোগীরা: অটোরিকশা চালক আব্দুল হাকিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুই বছর হলো ব্রিজ হয়েছে কিন্তু স্থায়ী রাস্তা হলো না। ব্রিজ অনেক উঁচা, মাটি কাটলেও দুই পাশে ধরে থাকে না, পড়ে যায়। আওয়ামী লীগের সময় একবার নামমাত্র মাটি কাটল, কিন্তু দায়সারা কাজ করে তারা পালালো। তারপর থেকে আর কোনো কাজ হয়নি। আমার মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারকে টাকা খাইয়ে ঠিকাদার বিল তুলেছে। দুই সাইডের ইট খুলে পড়ে গেছে, আমরা খুব ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করি।”
কৃষক হাফিজার বলেন, “ব্রিজ করার সময় আমরা অনেক তর্ক করেছি, অনুরোধ করেছি কাজটা ভালো করে করতে; কিন্তু কেউ শোনেনি। মেইন জিনিস হলো ব্রিজের দুই সাইডে দুইটা সাপোর্ট বা ঠ্যাং, সেটা ঠিক না থাকলে রাস্তা টিকবে কীভাবে? আমরা নিজেরাই মাটি দিই কিন্তু বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়।”
রফিকুল ইসলাম নামে এক বাসিন্দা বলেন, “রাস্তাটা বৃষ্টি হলেই ভেঙে যায়। আমাদের আবাদ করা ফসল বাড়িতে আনতে অনেক কষ্ট হয়। এর আগে এখানে বেশ কিছু গাড়ি উল্টে গেছে এবং একজনের পা ভেঙেছে। তবে আমাদের প্রিয় দুলু ভাই এখন মন্ত্রী হয়েছেন, তিনি জনবান্ধব নেতা। এই কষ্টের কথা শুনলে তিনি নিশ্চয়ই দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।” স্থানীয় মজনু মিয়া জানান, সেতুর সংযোগ সড়ক থেকে পড়ে গিয়ে ইতিমধ্যে দুটি শিশুর হাত ভেঙেছে, যা অত্যন্ত অমানবিক।
মোগলহাট ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আওয়ামী লীগের আমলে ঠিকাদার অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করে গেছে। এখন এটি পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী। পিআইও অফিসে গেলে তারা উপরে যোগাযোগ করতে বলেন। আমরা এখন আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে যাব, তিনি এই সমস্যার সমাধান করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী লিটন ইসলামের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ থাকায় কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি: এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আল আমিন সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকি তথ্য দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ওপর ঠেলে দেন। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনোনীতা দাস বলেন, “সেতু বা রাস্তার যদি কোনো সমস্যা থাকে এবং এলাকাবাসী যদি যাতায়াতে অসুবিধা বোধ করেন, তবে আমার বরাবর লিখিত আবেদন দিলে আমি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
নাগরিক পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন: একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সেতু যখন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তখন তার নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়ভার কার? গ্রাম অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পক্ষে কি দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা বা আবেদন-নিবেদনের ভাষা বোঝা সম্ভব? একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ যে জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল প্রশাসনের স্বপ্ন দেখছে, সেখানে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এমন দায়সারা বক্তব্য কতটুকু যৌক্তিক—সেই প্রশ্ন এখন সচেতন মহলের মুখে মুখে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮