আরিফ আহমেদ,
বরিশাল নগরীর চৌমাথা বাজারের সামনে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক দখল করে হকারদের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সড়ক দখল, যানজট ও পথচারীদের ভোগান্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হচ্ছে না। বরিশাল সিটি করপোরেশন (বসিক) একের পর এক উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পরই আবার বসছে দোকানপাট। সর্বশেষ গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) উচ্ছেদের মাত্র দুদিন পর রোববার (১১ অক্টোবর) একই এলাকায় আবারও অভিযান চালাতে হয়েছে বসিক প্রশাসনকে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি মহল এই দখল-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখছে। তাদের দাবি, স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতাকর্মীরা এখানে মহাসড়ক দখল করে এসব দোকানপাট বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে। ফলে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে ১১ অক্টোবর, রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে নগরীর চৌমাথা বাজারের সামনে বসিকের ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মকর্তাদের উচ্ছেদ অভিযান চালাতে দেখা গেছে। এসময় তারা বাজারের আশেপাশে, সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজসংলগ্ন এলাকা এবং চৌমাথা লেকের পাশে অভিযান পরিচালনা করে প্রায় অর্ধশত অবৈধ দোকানপাট ভেঙে ঘুড়িয়ে দেন। বসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রায়হান উজ জামানের নেতৃত্বে অভিযানে উচ্ছেদ শাখার প্রধান লতিকুল্লাহ, ট্রেড লাইসেন্স বিভাগের আজিজ শাহীন এবং হাটবাজার শাখার প্রধান রেজাউল করিম উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রায়হান উজ জামান বলেন, নগরীর ফুটপাত জঞ্জালমুক্ত করতে বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চৌমাথায় অভিযান চালানো হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অভিযান অব্যাহত থাকলেও সড়ক ও ফুটপাত বারবার দখল হয়ে যাচ্ছে কেন? গত ৯ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বসিক প্রশাসক আইনজীবী বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের নির্দেশনায় একই এলাকায় অভিযান চালিয়ে সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকানপাট ও স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছিল। এরপর ১১ অক্টোবর রোববার আবারও এখানে একইস্থানে অভিযান চালাতে হয়েছে। সিটি করপোরেশনের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার নাম প্রকশ না করার শর্তে বলেন, উচ্ছেদের পরদিনই সেখানে ২০ থেকে ২৫টি দোকান পুনরায় বসে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। তার অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু রাজনৈতিক নেতার অসহযোগিতা রয়েছে বলেই এই সমস্যার সমাধান হচ্ছেনা।
চৌমাথার এই সমস্যা নতুন নয়। গত ১৭ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাজারের সামনে মহাসড়কের একাংশে প্রায় অর্ধশত হকার ও ব্যবসায়ীর বসার বিষয়টি উঠে আসে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বরাতে সেখানে কিছু বিএনপি নেতা ও ইজারাদারের যোগসাজশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর গত ১৮ জুন পুনরায় সংবাদ শিরোনাম হয়- নগরীর চৌমাথা বাজারের সামনে মহাসড়ক দখল ও যানজটের সমস্যা নিয়ে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। গত ৮ অক্টোবর এক প্রতিবেদনে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের একাংশে রাতারাতি ২০টি দোকানঘর বসানোর তথ্য প্রকাশিত হয়। একই দিনে অন্যতম একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম হয়- চৌমাথায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অন্তত ২৫টি ফলের দোকান বসানোর খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে দোকানগুলোতে সিটি করপোরেশনের লোগো থাকার বিষয়টি উঠে এলেও কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। এসব প্রতিবেদন থেকে সড়ক দখল ও দোকান স্থাপন নিয়ে প্রশাসনিক অনুমোদন এবং তদারকির প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর শীর্ষ একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বরিশালে দলীয় ছত্রছায়ায় ফুটপাত দখলের মহোৎসব’ শিরোনামের প্রতিবেদনেও নগরীর বিভিন্ন সড়কে দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ চৌমাথাসহ নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলের অভিযোগ এক দিনের নয়; দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চৌমাথায় কিছু হকার শুধু জীবিকার প্রয়োজনে দোকান বসাচ্ছেন, বিষয়টি এমন নয়। একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দখল বজায় রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে। তাদের দাবি, স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপি, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতাকর্মীর নাম ব্যবহার করে কিংবা তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে দোকান বসানোর সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। অভিযুক্ত অনেক নেতার নামও প্রকাশ্যে এসেছে। তবে তাদের বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ না থাকায়, নাম ব্যবহার করা হলোনা।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুকও স্পষ্ট বললেন, যারাই দখলদারি বা চাঁদাবাজির সাথে সম্পৃক্ত হবে, তারা কেউই বিএনপির কেউ না।
আর বিএনপি কখনো কোনো চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের দল হতে পারেনা বলে পরিষ্কার ঘোষণা দিয়েছেন বরিশাল ৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আইনজীবী মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ ভাবে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করুন। তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই।
একই কথা বললেন বসিক প্রশাসক ও বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তিনি বলেন, মহাসড়কের পাশে দোকান বসানোর কারণে যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়। এই বোধটুকু কেন তাদের হয়না? তিনি দখলদার ও চাঁদাবাজ হতে নগরবাসীকে সচেতন হবার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলারও আহ্বান জানান।
নগরীর চৌমাথা মহাসড়ক সংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল এলাকা। এখানে পথচারীদের অনেক সময় সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। বাজারে আসা ক্রেতা, স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী এবং যানবাহনের চালকদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একই সঙ্গে বড় দোকানের সামনে অস্থায়ী দোকান বসানো নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। এ পরিস্থিতিতে সড়ক দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব কেবল অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের নির্দেশনায় ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও মাঠপর্যায়ে এর স্থায়ী ফল নিশ্চিত করা যাচ্ছে না দলীয় নেতাকর্মীদের অসহযোগিতার কারণে তা স্পষ্ট হয়েছে।
বসিকের উচ্ছেদ শাখা দোকান সরিয়ে দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে কিংবা পুনরায় দখলকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে একই জায়গায় বারবার অভিযান চালাতে হবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়বে, অথচ নগরবাসীর ভোগান্তি থেকেই যাবে।
এ অবস্থায় চৌমাথা বাজারের সামনে মহাসড়ক ও ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর অনুমোদন কে দিচ্ছে, দোকানগুলোর জন্য কোনো বৈধ ইজারা বা অনুমতি রয়েছে কি না, সিটি করপোরেশনের লোগোযুক্ত দোকানগুলোর উৎস কী এবং উচ্ছেদের পরপরই কীভাবে পুনরায় দোকান বসছে- এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন বরিশালের সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের দাবী, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ দখল বজায় রাখলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসা করা প্রকৃত ক্ষুদ্র হকারদের জন্য আইনসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা জরুরি বলে মনে করেন নগর চিন্তাবিদরা।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮