চট্টগ্রাম ব্যুরো:
দেশে শতবর্ষী প্রাচীন ব্যাবসায়ীদের বাণিজ্য সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এক প্রকার অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসক দিয়ে চলছে এই প্রতিষ্ঠানটি। মামলা পাল্টা মামলায় চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন ঝুলে আছে। দীর্ঘদিন আইনি জটিলতায় বন্দি চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন। এখন সাধারন ব্যবসায়ীদের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে কবে,কোন প্রক্রিয়ায় হবে চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন?
সর্বশেষ এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল মামলার যে রায় দিয়েছে তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্য বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী নতুন তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন করার আদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ নতুন তফসিলে চেম্বারের সদস্যদের সরাসরি ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি এবং পরিচালক নির্বাচিত হবে। কিন্তু চেম্বারের নির্বাচন বোর্ড এখন কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করবে? চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন নাকি বাণিজ্য বিধিমালা অনুযায়ী?
এফবিসিসিআইয়ের নিজস্ব সালিশী ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারী বেলালসহ তিনজনের আবেদন নিষ্পত্তি করে উচ্চ আদালতকে অবহিত করতে দেওয়া হয় নির্দেশ। তারপর সালিশী ট্রাইব্যুনাল শুনানি শেষে মামলাটির বিষয়ে দেওয়া হয় এই পর্যবেক্ষণ। বেলালের সঙ্গে অন্য দুজন আবেদনকারী হলেন-চেম্বার নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী একটি গ্রুপের প্যানেল লিডার এস এম নুরুল হক ও একই গ্রুপের সদস্য আজিজুল হক।
মূলত ট্রেড গ্রুপ থেকে নির্বাচনে লড়তে চেয়েছিলেন বেলাল। কিন্তু চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনী বোর্ড খারিজ করে দেয় তার আবেদনটি। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে একের পর এক আইনি লড়াই শুরু করেছেন তিনি। তার অভিযোগ, চেম্বারের ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী তফসিল নিয়ে। দাবি, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুসরণ না করেই প্রণয়ন করা হয়েছে ভোটার তালিকা। এ অভিযোগের সূত্র ধরেই বারবার থমকে যায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর চেম্বারের নির্বাচন আপিল বোর্ড টাউন-ট্রেডের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন আপিল বোর্ডের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য চেম্বারের এই তিন সদস্য আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তাদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে তা খারিজ করে দিয়েছে। ফলে নির্বাচনে চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ছয়টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।
আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালে অভিযোগকারী চিটাগাং চেম্বারের তিন সদস্যের কেউ টাউন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য নয় বিধায় তাদের অভিযোগ দায়েরের আইনগত কোনো অধিকার নেই। তারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি।
এক মামলার বাদী মোহাম্মদ বেলাল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রাইব্যুনাল। তার ভূমিকা নিয়ে রায়ের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বেলাল হোসেন একই সাথে হাইকোর্ট ও ট্রাইব্যুনালে একের পর এক মামলা, আবেদন, অভিযোগ ও আপিল দায়ের করেছেন। তিনি ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করার পর হাইকোর্টে রিট পিটিশনের বিরুদ্ধে আপিল করেন। এরপর ট্রাইব্যুনালের মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু আবার সেই মামলা প্রত্যাহারের আবেদন বাতিলের জন্য তিনি আবেদন করেন।
চিটাগাং চেম্বারের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয় আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী। বাণিজ্য বিধিমালায়ও জেলা চেম্বারগুলোর কার্যক্রম আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
চিটাগাং চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, অর্ডিনারি গ্রুপের ১২ জন পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েট গ্রুপের ৬ জন পরিচালক সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়। আর টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ৬ জন পরিচালক সমঝোতার ভিত্তিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। এরপর নির্বাচিত ২৪ জন পরিচালকের ভোটাভুটিতে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি নির্বাচিত হয়।
চেম্বার নির্বাচন বোর্ডের প্রধান মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছি। কারণ চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন সংশোধন করা ছাড়া সরাসরি ভোটে নির্বাচন করা যাবে না। কিন্তু নির্বাচিত বোর্ড ছাড়া এখন আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন সংশোধনের সুযোগ নেই। এখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’
চট্টগ্রাম চেম্বারে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুটি প্যানেল। একটি এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্ব ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম। আরেকটি হচ্ছে, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বে সমমনা পরিষদ।
সর্বশেষ ঘোষিত শিডিউল অনুযায়ী চট্টগ্রাম চেম্বারে চার ক্যাটাগরিতে ২৪ পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল ৪ এপ্রিল। আর সেই পরিচালকদের ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়। কিন্তু এফবিসিসিআই সালিশী ট্রাইব্যুনাল সর্বশেষ ২২ এপ্রিলের রায়ে সেই তফসিল বাতিল করে দিয়েছে নতুন তফসিলে সরাসরি নির্বাচনের নির্দেশনা। এখন সেই রায়ের ভিত্তিতে উচচ আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয় তা জানার অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা।
উল্লেখ্য, চিটাগাং চেম্বারের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮