আরিফ আহমেদ,
বরিশাল অঞ্চলে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগ একের পর এক সামনে আসছে। অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক সংগঠন থেকে বহিষ্কার, পদ স্থগিত কিংবা পুলিশি গ্রেপ্তার, কোনোটিই যেন থামাতে পারছে না এ প্রবণতা। বাজার, পরিবহন, মাছবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে পর্যটনকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কেবল সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তার দিয়ে কি চাঁদাবাজির বিস্তার ঠেকানো সম্ভব?
যদিও জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, কিছু বখাটে ৫ আগস্টের পর দলের ভিতর প্রবেশ করে দলীয় শৃঙ্খলা নষ্ট করছে, এরা রাতারাতি ধনী হতে দলের নাম ভাঙিয়ে এসব করছে। প্রমাণ পাওয়া গেলেই দল থেকে তাদের বহিষ্কারও করা হচ্ছে। তারপরও অভিযোগ থামছে না, বরং বিএনপিকে দূর্নাম করতেই এরা কোমড় বেধে নেমেছে বলে দাবী নেতাদের।
সর্বশেষ বরিশালে আলোচনায় এসেছে নগরীর বহুমুখী সিটি মার্কেটের পাইকারি কাঁচাবাজার। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে চাঁদা দাবি ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনা চলছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এর প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বাজারের ব্যবসায়ীরা বেচাকেনা বন্ধ করে দেন। এতে বরিশাল নগরীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সবজি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
এ ঘটনায় বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানায় মামুন বেপারী ওরফে রইয়া মামুনসহ সাতজনকে আসামি করা হয়। মামুন বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক এবং মামলার প্রধান আসামি। মামলার পাঁচ নম্বর আসামি বাবুল আকনকে ঘটনার পরপরই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে ২২ সেপ্টেম্বর রাতে কাশিপুর ফিশারি রোড এলাকা থেকে রইয়া মামুনকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারীদের ট্রাক আটকে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হতো। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের মারধর এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট শুরু করলে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।
তবে কাঁচাবাজারের ঘটনাটি একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। গত কয়েক মাসে বরিশাল নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন কিংবা সাংগঠনিক শাস্তির মুখে পড়েছেন।
গত ৩০ আগস্ট চাঁদাবাজির মামলায় বরিশাল সদর উপজেলা যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা মেহেদী হাসান রাসেলকে বন্দর থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এর আগে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
আবার গত জুলাই মাসে কীর্তনখোলা নদীর তীরের ত্রিশ গোডাউন পর্যটন এলাকায় ট্রলার ও ভাড়ায় চালিত নৌকা থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগও আদালতের নজরে আসে। এ ঘটনায় স্বপ্রণোদিত হয়ে পুলিশকে মামলা করার নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
অন্যদিকে বানারীপাড়ায় চাঁদাবাজির মামলার এক আসামি জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে বাদীপক্ষের ওপর হামলা চালানোর অভিযোগও সামনে আসে। এতে মামলা, গ্রেপ্তার ও জামিনের পরও অভিযোগকারী পক্ষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগের ঘটনাও নতুন নয়। বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর দলীয়ভাবে বহিষ্কার, পদ স্থগিত কিংবা অব্যাহতির ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করলেও এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
পরিবহন খাতেও চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। রূপাতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় মহাসড়কে বাস থামিয়ে সিটি টোলের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগে হাসান ও সোহাগ নামে দুজনকে পুলিশ আটক করেছিল। পরে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাদের বৈধ টোল আদায়কারী হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হলে তারা ছাড়া পান। এতে বৈধ টোল আদায় ও অবৈধ চাঁদাবাজির পার্থক্য নিয়ে পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহন খাতেও মালিক-শ্রমিক বিরোধ, রুট নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থ আদায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কখনো ধর্মঘট, কখনো পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, এ সব মিলিয়ে পরিবহন খাতেও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
এর মধ্যেই গত ২৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে বাকেরগঞ্জের একটি পেট্রোল পাম্পে মাছবাহী ট্রাক আটকে চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রে এ ঘটনায় উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকও সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।
আগৈলঝাড়াতেও সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক ঘটনা ঘটেছে। চাঁদাবাজি ও স্থানীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি থানায় হামলার ঘটনায়ও বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। তবে এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রত্যেককে চাঁদাবাজির আসামি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই; অপরাধের ধরন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা রয়েছে।
সব মিলিয়ে গত তিন মাসে বরিশাল অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা, গ্রেপ্তার ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঘটনার কোনো সমন্বিত পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে পুরো অঞ্চলে চাঁদাবাজির প্রকৃত চিত্র কতটা বিস্তৃত, তা নির্দিষ্ট সংখ্যায় বলা কঠিন। যদিও পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রতিদিনই বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ৪২টি উপজেলা থেকে কোনো না কোনো চাঁদাবাজি ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের ঘটনাগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, চাঁদাবাজির অভিযোগ এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট বাজার বা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কোথাও বাজারকেন্দ্রিক, কোথাও পরিবহনকেন্দ্রিক, কোথাও মাছবাহী ট্রাক, আবার কোথাও পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে আসছে।ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বললে অনেক সময় তাদের ওপর হামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকে লিখিত অভিযোগ করতেও সাহস পান না। আবার কোথাও অভিযোগ করার পরও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বা কার্যকর প্রতিকার নিয়ে সংশয় থাকে। আবার কোথাও কোথাও ঐক্যবদ্ধ রুখে দাঁড়ানোর চিত্রও দেখা গেছে। যেমন বরিশালের কাশিপুর ও পাইকারি কাঁচাবাজার হতে পারে উদাহরণ এখন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ পাওয়ার পর বহিষ্কার বা পদ স্থগিতের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু একটি সংগঠন থেকে কাউকে বহিষ্কার করলেই তার বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় না। একইভাবে গ্রেপ্তারও তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক। তিনি বলেন, বিএনপি অনেক বড় একটি দল। এই দলের ভিতর কিছু বাজেলোকও ঢুকে পরতে পারে, এটা অস্বাভাবিক নয়। আমরা কিন্তু অভিযোগ পাওয়া মাত্র তাৎক্ষণিক তা কেন্দ্রে জানিয়ে দিচ্ছি। কেন্দ্র থেকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া, একটু সময় লাগলেও এভাবেই আগাছা মুক্ত করে দলকে সুশৃঙ্খল করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রায় একই কথা বলেন জেলা দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহিন। তিনি বলেন, কোনো সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজ বিএনপি ও তারেক রহমান এর বন্ধু হতে পারেনা। তারা বিএনপির দূর্নাম করতেই এসব করছে। এরা বিএনপি বা বিএনপির কোনো অংগসংগঠনের হলেও তাদের ছাড় দেওয়া যাবেনা। আমাদের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বরিশাল ও বরগুনার ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, শুধু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার নয়, চাঁদাবাজির পেছনে থাকা পুরো চক্রকে শনাক্ত করতে হবে। কে অর্থ আদায় করছে, কারা সহযোগিতা করছে, কোথায় সেই অর্থ যাচ্ছে এবং কোনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া রয়েছে কি না, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও জোরদারের দাবি উঠেছে। বাজার, মাছঘাট, ফেরীঘাট, বাস টার্মিনাল, মহাসড়ক ও পর্যটনকেন্দ্রে বৈধ টোল বা ফি আদায়ের নামে কেউ যাতে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বরিশাল রেঞ্জের নবনিযুক্ত ডিআইজি মোঃ জুলফিকার আলী হায়দার সাম্প্রতিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বরিশাল রেঞ্জের আওতাধীন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও জনবান্ধব রাখতে চলমান সব ধরনের অপরাধ ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যেকোনো মূল্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে বরিশাল রেঞ্জের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মহাসড়ক কিংবা কোনো সেক্টরেই চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না।
তারপরও উপজেলা পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশের নিরবতা বা নিষ্ক্রিয়তাই চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেওয়া বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞজনেরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মিজানুর রহমান বলেন, একজনকে বহিষ্কার কিংবা গ্রেপ্তার করা তাৎক্ষণিকভাবে একটি ঘটনার নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ যদি অন্য এলাকায় আবার দেখা দেয়, তাহলে সমস্যার গভীরে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আসে। বরিশালের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয় নয়; বরং বাজার, পরিবহন ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা ও জবাবদিহি কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। এর একটাই সমাধান জিরো টলারেন্স শুধু মুখে নয়, কাজে দেখাতে হবে বলে জানান তিনি।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮