আরিফ আহমেদ,
বরিশাল নগরীতে ফাঁকা জায়গা পেলেই মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার প্রবণতা থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বসিক) প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিকরা। একই সঙ্গে জনসাধারণের চলাচলের পথ, ফুটপাত ও সড়কের জায়গা সংকুচিত করে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে নগরীর দীর্ঘদিনের হকার সমস্যা সমাধান ও প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি উঠেছে।
৩ অক্টোবর
শনিবার সকাল ১১টায় নগরীর বগুড়া রোডে প্রস্তাবিত সিটি মার্কেট নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন বিএনপির একটি অংশসহ সাধারণ নাগরিকরা। এতে নেতৃত্ব দেন বরিশাল মহানগর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নাগরিকদের অভিযোগ, গত ৩০ সেপ্টেম্বর নগরীর বগুড়া রোডে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সামনের সড়কের পাশে বসিকের জায়গায় সিটি মার্কেট নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। এরই মধ্যে সেখানে খননকাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু সড়কের পাশে থাকা ওই জমিতে মার্কেট নির্মাণ করা হলে আশপাশের ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে দাবি তাদের।
সরেজমিনে বগুড়া রোড ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে বসিকের মালিকানাধীন একটি লম্বাটে জায়গা রয়েছে। কোথাও জায়গাটির প্রস্থ প্রায় ৪ ফুট, কোথাও ৬ ফুট, আবার কোথাও ১০ ফুটের মতো। স্থানীয়দের ভাষ্য, জায়গাটি বর্তমানে সড়ক ও বাসাবাড়ির মধ্যবর্তী অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথাও রয়েছে চলাচলের পথ, কোথাও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ও ফুটপাতের প্রয়োজনীয় জায়গা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখানে মার্কেট নির্মাণ হলে অনেক বাড়ির প্রবেশপথ সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বগুড়া রোডের মূল সড়ক আরও সংকুচিত হয়ে যানজট বাড়তে পারে। বর্ষা মৌসুমে ওই এলাকায় পানি জমে থাকার অভিযোগও রয়েছে। ফলে নতুন স্থাপনা নির্মাণ হলে পানি নিষ্কাশন ও পথচারীদের চলাচলের সমস্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল, জাহিদুল ইসলাম, বশীরুল ইসলাম খান, রেজাউল ইসলাম খান ও অহিদুন নবীসহ অন্যরা বলেন, এই জায়গা মার্কেট নির্মাণের উপযোগী নয়। বরং সড়কের পাশে থাকা জায়গাটি ব্যবহার করে সড়ক সম্প্রসারণ, ফুটপাত নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে নগরবাসী বেশি উপকৃত হবে।
এ সময় স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি নিজের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার এমন অসহায়ত্ব মানববন্ধনে উপস্থিত অন্যদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
মানববন্ধনকারীদের প্রশ্ন, নগরীতে যেখানে প্রতিদিন যানজট, ফুটপাত দখল, পানি নিষ্কাশন ও পথচারীদের চলাচল নিয়ে নানা সংকট রয়েছে, সেখানে সড়কের পাশের অবশিষ্ট জায়গাগুলোও যদি একের পর এক বাণিজ্যিক স্থাপনায় পরিণত করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নগরীর মানুষের চলাচলের জায়গা কোথায় থাকবে?
তারা আরও অভিযোগ করেন, এর আগেও নগরীর কালীবাড়ি রোডসংলগ্ন কাঞ্চন পার্ক এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেখানে পার্কের পাশে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ নিয়েও স্থানীয়দের আপত্তি রয়েছে। গণশৌচাগারের জন্য নির্ধারিত জায়গা ও সাধারণ মানুষের চলাচলের স্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনা সামনে এনে মানববন্ধনকারীরা বলছেন, নগরীর যে কোনো খালি বা অব্যবহৃত জায়গাকে বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য ব্যবহার করার আগে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা ও জনস্বার্থ বিবেচনা করা জরুরি।
অন্যদিকে হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও মানববন্ধনে গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখল করে হকারি করার কারণে একদিকে পথচারীদের দুর্ভোগ হচ্ছে, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে ফুটপাতে বসছেন। তাদের উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত হকারদের তালিকা করে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করতে হবে।
তাদের বক্তব্য, হকারদের জন্য মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি প্রকৃত হকারদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া এবং তারা যাতে সেখানে ব্যবসা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মার্কেট নির্মাণ করলেই পুনর্বাসন সম্পন্ন হয় না। বরং নির্মাণের পর সেটি কারা ব্যবহার করবে, কীভাবে বরাদ্দ হবে এবং প্রকৃত হকাররা সেখানে জায়গা পাবেন কি না, এসব বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
মানববন্ধনে আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, ‘দল হচ্ছে জনগণের জন্য, কোনো ব্যক্তির জন্য নয়। জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে কোনো উন্নয়ন হতে পারে না। সিটি করপোরেশন লম্বালম্বিভাবে যে জমি দাবি করছে, তাতে মার্কেট নির্মাণ করা হলে অর্ধশতাধিক পরিবার দুর্ভোগে পড়বে। একই সঙ্গে মূল সড়ক সরু হয়ে যানজট আরও বাড়বে।’
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে ওই এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এমন জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করা হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। পাশেই সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নাসরিন আরও বলেন, ‘প্রশাসকের উচিত সরেজমিনে জায়গাটি পরিদর্শন করে নতুনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তা না হলে এলাকাবাসী আন্দোলন গড়ে তুলবে। জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে কোনো উন্নয়ন হতে পারে না।’
মানববন্ধনে উপস্থিত বক্তারা বলেন, নগরীর প্রতিটি ফাঁকা জায়গাকে মার্কেট বা বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য ব্যবহার করার প্রবণতা থেকে সিটি করপোরেশনকে বেরিয়ে আসতে হবে। নগরীর জায়গা শুধু ভবন নির্মাণের জন্য নয়; মানুষের হাঁটা, পানি নিষ্কাশন, সড়ক সম্প্রসারণ, সবুজায়ন, নাগরিক সুবিধা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তাদের মতে, একটি নগরীর উন্নয়ন মানে শুধু নতুন ভবন বা মার্কেট নির্মাণ নয়। কোথায় মার্কেট হবে, কোথায় ফুটপাত থাকবে, কোথায় সড়ক প্রশস্ত হবে, কোথায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকবে এবং কোথায় সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে হাঁটতে পারবেন, এসব সমন্বয় করেই নগর পরিকল্পনা করতে হয়।
এদিকে মানববন্ধনের অভিযোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন বসিক প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তিনি বলেন, নগরবাসীর সমস্যা সমাধানে তিনি সবসময় সচেতন। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সিটি করপোরেশনে এসে সরাসরি তাকে জানানো উচিত ছিল।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা স্থানীয় বাসিন্দা নন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে স্থানীয়দের দাবি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রশাসকেরই সরেজমিনে বগুড়া রোড পরিদর্শন করা উচিত। যাদের বাড়ির সামনে দিয়ে মানুষ চলাচল করেন, যাদের প্রবেশপথ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং যাদের এলাকায় বর্ষায় পানি জমে, তাদের সঙ্গে কথা বলেই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নগরবাসীর প্রশ্ন তাই এখন শুধু একটি মার্কেট নির্মাণ নিয়ে নয়; বরং বরিশাল নগরীর অবশিষ্ট খোলা জায়গাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও।
তাদের প্রত্যাশা, বসিক প্রশাসক ফাঁকা জায়গা পেলেই সেখানে মার্কেট নির্মাণের চিন্তা না করে প্রথমে নগরীর দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন নির্ধারণ করবেন। পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃত হকারদের সম্মানজনক ও পরিকল্পিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন। আর কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে দেখা হবে, সেটি সত্যিই নগরবাসীর জীবন সহজ করছে, নাকি এক সমস্যার জায়গায় আরও বড় নতুন সমস্যা তৈরি করছে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮