আরিফ আহমেদ,
ফলাফল প্রকাশের দিন কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের সেই চিরচেনা ভিড় নেই। নেই ফল জানার জন্য উৎকণ্ঠিত শিক্ষার্থীদের জটলা, উচ্ছ্বাস কিংবা হতাশার প্রকাশ। বরিশাল নগরীর অমৃতলাল দে কলেজ, সরকারি বরিশাল কলেজ, মহিলা কলেজ ও স্যার সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে প্রায় ফাঁকা ক্যাম্পাস। অথচ এদিনই প্রকাশ হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফল। শিক্ষার্থীদের এমন অনাগ্রহের কারণ হিসেবে মোবাইলকেন্দ্রিক হয়ে পড়া এবং আগের মতো ফলাফল নিয়ে আগ্রহ না থাকার কথা জানিয়েছেন অমৃত লাল দে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাহবুবুল হক। অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি ও মোবাইল আসক্তিকে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দুজনেই। তাদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে না পারলে আগামীতে আরও ভয়াবহ ফল বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বরিশাল বোর্ড। ৩১ অক্টোবর
শনিবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এ হার। এবার বোর্ডের ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরগুনা জেলায়। শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ নিজেই এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিপরীতে বোর্ডের অধীন মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাশ করেছে।
বোর্ডের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার বিভাগের ছয় জেলার ৩৫০টি কলেজ থেকে মোট ৬০ হাজার ৬৫২ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫৭ হাজার ৯১২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ২৫ হাজার ৯৭০ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৫০ জন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩১ হাজার ৯৪২ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
গত বছর বরিশাল বোর্ডে পাশের হার ছিল ৬২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সে বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ হাজার ৬৭৪ জন। এক বছরের ব্যবধানে পাশের হার কমেছে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ পয়েন্ট। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৭২৪ জন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজ্ঞান ও হোম ইকোনমিক্স বিভাগে ১১ হাজার ৯৩৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ৬ হাজার ৭৭৫ জন। পাশের হার ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মানবিক ও ইসলাম শিক্ষা বিভাগে ৪০ হাজার ৪৮৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ হাজার ৯৮৩ জন। পাশের হার ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫ হাজার ৪৯১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ২ হাজার ২১২ জন। এ বিভাগে পাশের হার ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ।
ছাত্রদের ফলাফল ছাত্রীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৬ হাজার ৭৫৫ জন ছাত্রের মধ্যে পাশ করেছে ৯ হাজার ৪৬৫ জন। তাদের পাশের হার ৩৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩১ হাজার ১৫৭ জন ছাত্রীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ হাজার ৫০৫ জন। ছাত্রীদের পাশের হার ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
এবারের ফলাফলে ইংরেজি বিষয়ে সবচেয়ে খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে এ বিষয়ে বরিশাল বোর্ডের অবস্থানও উদ্বেগজনক। ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবং নিয়মিত পাঠ গ্রহণের ঘাটতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ফলাফল প্রকাশের দিন সরেজমিনে বরিশালের চারটি কলেজ প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের মতো এবার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফলাফল জানার কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা নেই। অমৃতলাল দে কলেজ, সরকারি বরিশাল কলেজ, মহিলা কলেজ ও সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের প্রাঙ্গণ ছিল প্রায় ফাঁকা। ফলাফল জানার জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো ভিড়ও দেখা যায়নি। অথচ একসময় ফল প্রকাশের দিন কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপচেপড়া ভিড় থাকত। ভালো ফলের আনন্দ, কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার হতাশা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ফলাফল নিয়ে আলোচনা ছিল চিরচেনা দৃশ্য।
এ প্রসঙ্গে হাতিম আলী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আখতারুজ্জামান খান জানান, এখন আর আগের মতো ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ দেখা যায় না। শিক্ষার্থীরা ক্রমেই মোবাইল কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। পড়াশোনা ও শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পরিবর্তে মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষে ফিরতে হবে এবং কোচিং নির্ভরতা কমাতে হবে বলে মতামত দেন অধ্যক্ষ ছাড়াও একাধিক শিক্ষক।
এসময় কয়েকজন অবিভাবক দাবী করেন, শুধু কোচিং নির্ভরতা নয়, শিক্ষকদের হাতে সাবজেক্ট সিট তুলে দিয়ে পড়ানোর পদ্ধতিও বাতিল করতে হবে। শ্রেণীকক্ষ থেকেই পুরো পাঠ্যবই পড়ার প্রাকটিস শুরু না হলে মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি হবেনা বলে জানান তারা।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. জসিম উদ্দিন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর শরীফ মোর্শেদ রেজাও ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকা, পাঠ গ্রহণে অনীহা এবং মোবাইল আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে আগামীতে ফলাফলের আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং মোবাইল আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ কিংবা শূন্য পাশের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, ইংরেজি বিষয়ে বিশেষ পাঠদান এবং মোবাইল ব্যবহারে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানে পাশের হার শূন্য কিংবা অত্যন্ত কম, সেসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বরিশাল বোর্ডের এবারের ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পরিসংখ্যান নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও অভিভাবকদের সচেতনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী বছরগুলোতে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮