আরিফ আহমেদ,
বরিশাল নগরীর চাঁদমারির বাঁধ রোড ও মাদ্রাসা রোডের সৌন্দর্যবর্ধন এবং সংস্কারকাজ চলছে। বাঁধ রোডের কাজ শেষ হলেও মাদ্রাসা রোডের কাজ চলছে ঢিমেতালে। এর পাশেই কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামের সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকায়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এই স্টেডিয়ামকে। অথচ স্টেডিয়ামের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে আশপাশের পরিবেশের দিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। সড়ক ও ফুটপাত দখল করে চলছে কাঠের ব্যবসা, পড়ে আছে কাঠের বিশাল স্তূপ, গেটসংলগ্ন খালটি প্রায় মৃত অবস্থায় জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে রয়েছে। আর স্টেডিয়ামে প্রবেশের পর হাতের বাম পাশে থাকা প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সুইমিংপুলটি পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে। সন্ধ্যা নামলেই সেখানে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত লোকজনের আনাগোনা। ফলে প্রতিদিনই দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী, ক্রীড়াবিদ ও আশপাশের বাসিন্দারা। একই সঙ্গে বিষাক্ত হচ্ছে নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রীড়া স্থাপনার আশপাশের পরিবেশ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেডিয়ামের বাম পাশের ফুটপাত ধরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে যেতে চাইলেই বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে পথচারীদের। ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে কাঠের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। রাস্তার ওপর ও ফুটপাতজুড়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ কাঠ। এতে পথচারীদের চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেককে বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যানবাহনের চাপ বাড়লে এ পথে চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে স্টেডিয়ামের প্রবেশপথের পাশেই রয়েছে একটি খাল। একসময় পানি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এই খালটি বর্তমানে প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। দুই পাশের ঝোপঝাড় ও আগাছায় ঢেকে গেছে খালের অংশবিশেষ। আশপাশের পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন। স্টেডিয়ামের সৌন্দর্যবর্ধনে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও প্রবেশপথের এই অবস্থা নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকা সুইমিংপুল ঘিরে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় বরিশালের একমাত্র সরকারি সুইমিংপুলটি। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পরীক্ষামূলকভাবে পানি তুলতে গিয়ে পুলের কূপে ফাটল দেখা দেয়। পানি ধরে রাখতে না পারায় সেটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘ ২৬ বছরেও সেখানে সাঁতার প্রতিযোগিতা কিংবা প্রশিক্ষণের কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও সুইমিংপুলটির নির্মাণগত ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত অবস্থার বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, ভেতরের টাইলস ভেঙে গেছে, বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। পানির পাম্পসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে পড়েছে। চারপাশের স্থাপনাগুলোও অযত্ন-অবহেলায় ক্ষয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ভাঙা বেড়া দিয়ে কোনোমতে ঘিরে রাখা হয়েছে পুরো স্থাপনাটি। অথচ এই সুইমিংপুল ঘিরে বরিশালের শিশু-কিশোর ও তরুণদের সাঁতার শেখার পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাঁতারু তৈরির বড় সম্ভাবনা ছিল। নদীমাতৃক বরিশালের ছেলেমেয়েদের জন্য এটি হতে পারত সাঁতার প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় সরকারি এই সম্পদ এখন নগরবাসীর কোনো কাজে আসছে না। উল্টো সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা ও আড্ডার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় স্থাপনাটি কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। ফলে ক্রীড়া প্রশিক্ষণের সম্ভাবনাময় জায়গাটি সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হচ্ছে।
এদিকে সুইমিংপুল ও স্টেডিয়াম আধুনিকায়নে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান কতটা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সংশোধিত প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কোটি টাকার আধুনিকায়ন প্রকল্পে স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি বিদ্যমান জেলা সুইমিংপুলের উন্নয়নের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের উপযোগী মাঠ, ড্রেসিংরুম, মিডিয়া সেন্টার, গ্যালারি, ডরমিটরি ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত সংবাদেও স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে বলা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান শাহনিয়ান তানিম নাভীন কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামের কাজ পরিদর্শন করে বলেছেন, ডিসেম্বরে বরিশালের কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামে বসবে ঘরোয়া ক্রিকেটের বড় আসর। বিসিবির নতুন তিন ফরম্যাটের ‘ডমেস্টিক থ্রি’ বা ‘ডি-থ্রি’ টুর্নামেন্টের টি২০ পর্ব শুরু হবে বরিশাল থেকে।
এসময় সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা কনফিডেন্ট, ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মাঠ উপহার দিতে পারব। যাতে দ্রুত কাজ শেষ হয়, সেজন্য বিসিবি থেকে সাধ্যমতো সব সহযোগিতা করা হবে। কোনো কম্প্রোমাইজ করা হবে না। সামনে দুই মাস সময় আছে। এর মধ্যে আমরা আরও ভালো করব।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটি নতুন মাঠ, তাই ভুলত্রুটি হতে পারে। সেগুলো ধীরে ধীরে ঠিক করা হবে। ভুলকে আমাদের দুর্বলতা ভাববেন না। এখন আউটফিল্ড, উইকেট ও ঘাস কাটার অল্প কিছু কাজ বাকি আছে।’
কিন্তু স্টেডিয়ামের বাইরের পরিবেশ, ফুটপাত দখল, খাল ও সুইমিংপুলের ব্যবহার নিশ্চিত না হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন নগর চিন্তাবিদরা।
বরিশালের এই স্টেডিয়ামটির ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৬৬ সালে নগরীর বান্দ রোডে কীর্তনখোলা নদীর তীরঘেঁষে প্রায় ২৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বরিশাল স্টেডিয়াম। পরবর্তী সময়ে শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাতের নামে এর নামকরণ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে নাম পরিবর্তন করে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এটিকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ভেন্যুতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এর প্রবেশপথ, চারপাশের সড়ক, ফুটপাত, খাল ও পরিবেশের উন্নয়নও সমান জরুরি।
নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকা দিয়ে হাঁটার সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বরিশাল স্টেডিয়ামসংলগ্ন বাঁধ রোডের ফুটপাত দখল করে কাঠের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। গেটসংলগ্ন প্রায় মৃত খাল ও সড়কের অবস্থা জঙ্গলাকীর্ণ। স্টেডিয়াম ঘিরে কত আয়োজন হলো, কিন্তু এসব সমস্যা কারও চোখে পড়ল না! তিনি বলেন, কোনো একদিন বরিশালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন হতে পারে। সে লক্ষ্য সামনে রেখে স্টেডিয়াম ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।
কাজী মিজানুর রহমান আরও বলেন, বিষয়টি শুধু পরিবেশ কিংবা বরিশাল নগরীর সৌন্দর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এর সঙ্গে নগরবাসীর সম্মানও জড়িত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এই এলাকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ভবিষ্যতে সড়কটির নাম ‘কবি নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ’ করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
নগরবাসীর প্রশ্ন, একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ, অন্যদিকে সেই স্টেডিয়ামের সামনের ফুটপাত দখল, কাঠের ব্যবসার বিস্তার, খাল ভরাট ও জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশ এবং ভেতরে পরিত্যক্ত সুইমিংপুলে মাদকসেবীদের আড্ডা এই দুই বিপরীত চিত্র আর কতদিন চলবে? ক্রীড়া স্থাপনার আধুনিকায়নের পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশ রক্ষা, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, খালটি পুনরুদ্ধার এবং সুইমিংপুলটি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া না হলে বিপুল সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন বরিশালবাসী।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব মশিউর রহমান মঞ্জু বলেন, গতকালই এই সমস্যা নিয়ে আমাদের বৈঠক হয়েছে। সুইমিংপুলটি এই ডিসেম্বরেই ভেঙে নতুন করে তৈরির প্রস্তাবনা হয়েছে। স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা জোরদার করে সাতজন নিরাপত্তা রক্ষী নিয়োগ হয়েছে এবং অফটাইমে বা সন্ধ্যার পরে ভিতরে অবস্থানরত খেলোয়াড় ছাড়া আর কারো প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়ামের ভিতরের পরিবেশ এখন চমৎকার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে তবে বাহিরের খাল ও ফুটপাত সিটি করপোরেশনের আওতাধীন। আমরা এজন্য বিসিসি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন এর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তাকে অনুরোধ জানাবো স্টেডিয়ামের আশেপাশের এলাকা ও খালগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮