নিউজ ডেস্ক,
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক খাতে রূপান্তরের বড় সম্ভাবনা দেখছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো। এ জন্য কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবার, ফাংশনাল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্বয়ংক্রিয় সেলাই প্রযুক্তি এবং গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী তারা।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি—কোটরা ঢাকার উপ-পরিচালক লি সুং-হুন, যিনি ড্যানিয়েল লি নামেও পরিচিত, এসব কথা জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনো মূলত পরিমাণভিত্তিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। এই খাতকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে রূপান্তরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। জিডিপিতেও এ খাতের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। তবে গড় মূল্য সংযোজন এখনো প্রায় ৩০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
কোটরার এই কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি ফাংশনাল ফ্যাব্রিক, পারফরম্যান্স ওয়্যার এবং পরিবেশবান্ধবভাবে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে প্রযুক্তি ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।
স্বয়ংক্রিয় কাটিং ও সেলাই ব্যবস্থা, আধুনিক পরিদর্শন প্রযুক্তি, গার্মেন্টস ও ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী কারখানা ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানো গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন ধরনের পণ্য তৈরি সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আধুনিকায়নে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে কোটরা—পণ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়করণ এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা।
লি সুং-হুন বলেন, প্রাকৃতিক তন্তুর পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তু ও ফাংশনাল উপকরণভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো বাংলাদেশের পোশাক খাতে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর পথ। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বাংলাদেশের টেক্সটাইল যন্ত্রপাতির বাজার বর্তমানে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগও ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় কাটিং ও সেলাই প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে ইউরোপের নতুন পরিবেশগত ও সরবরাহ শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত নিয়ম বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট, ইকো-ডিজাইন এবং কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত বিধিমালা মেনে চলা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশি পোশাক কারখানাগুলোকে এসব নতুন মানদণ্ডের জন্য প্রস্তুত করতে কোটরা কোরিয়ার আইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।
লি সুং-হুন আরও বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংখ্যক লিড সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা রয়েছে। এখন প্রয়োজন এই পরিবেশগত সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।
এ জন্য জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং বর্জ্যপানি শোধনব্যবস্থা উন্নয়নে সহযোগিতা করছে কোটরা।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ১৯৭৮ সালে ডেইউর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে দক্ষিণ কোরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে সময় বাংলাদেশি কর্মীদের কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা দেশে ফিরে এসে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের ভিত্তি তৈরিতে অবদান রাখেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের প্রায় ৭০ শতাংশই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে এই খাতের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দুই দেশের জন্যই অভিন্ন অগ্রাধিকার বলে মনে করেন লি।
তবে পোশাকশিল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশে ওষুধ ও বায়োটেকনোলজি, ভোগ্যপণ্য, অবকাঠামো, আইসিটি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা দেখছে দক্ষিণ কোরিয়া।
বিশেষ করে এপিআই, ক্যানসারের ওষুধ, ভ্যাকসিন ও বায়োলজিকস উৎপাদনে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কারণে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও কোরিয়ান সৌন্দর্যপণ্যের—কে-বিউটি—বাজারও সম্ভাবনাময় বলে মনে করছে কোরিয়ান কোম্পানিগুলো। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড তৈরিতেও আগ্রহ রয়েছে তাদের।
স্মার্ট অবকাঠামো, বুদ্ধিমান পরিবহণ ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল সরকারি সেবাতেও দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট—সিইপিএ চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে লি বলেন, এই চুক্তি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়াতে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।
তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সিইপিএ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।
তবে কোরিয়ার বিনিয়োগ আরও বাড়াতে নিয়ন্ত্রক নীতির ধারাবাহিকতা, সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা, বিনিয়োগের মুনাফা নিজ দেশে নেওয়ার সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন কোটরার এই কর্মকর্তা।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮