এম. জালাল উদ্দীন, পাইকগাছা (খুলনা),
লবণাক্ততার প্রতিকূলতা জয় করে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নে ঘেরের ভেড়িতে অফ-সিজন বা অসময়ের তরমুজ চাষে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা ঘেরের উঁচু আইল কাজে লাগিয়ে তরমুজসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন স্থানীয় কৃষকেরা। উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় চলতি মৌসুমে ইউনিয়নটিতে প্রায় ১২৫ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোলাদানা ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় বছরের দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির উপস্থিতি থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন কঠিন। এ পরিস্থিতিতে ঘেরের উঁচু ভেড়ি ও আইল ব্যবহার করে অসময়ের তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকেরা। গত বছর ইউনিয়নটিতে প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে এ পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৫ বিঘায়।
ইতোমধ্যে ইউনিয়নের ছালুবুনিয়া, খালিয়াচক, টেংরামারী (মাস্টারপাড়া), নায়েবখালী, পূর্ব দীঘা, দক্ষিণ কাইনমুখী ও বেতবুনিয়া গ্রামের মাঠে মাঠে তরমুজগাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ঘেরের উঁচু আইলে বাঁশের মাচা তৈরি করে তাতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তরমুজের সবুজ লতা। তরমুজের পাশাপাশি চাষ হচ্ছে পুঁইশাক, শসা, মিষ্টিকুমড়া ও উচ্ছে। এতে একই জমি কাজে লাগিয়ে একাধিক ফসল উৎপাদন এবং বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সাফল্য দেখে এ চাষে আগ্রহ বাড়ছে অন্যদেরও। ছালুবুনিয়া গ্রামের কৃষক চিরঞ্জীব ঢালী, হিমাদ্রি ঢালী, অভিজিৎ ও কাকুলী রায়সহ অনেকে এ চাষে যুক্ত হয়েছেন। কৃষক হিমাদ্রি ঢালী জানান, দুই বছর আগে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ শুরু করেন। ওই পরিমাণ জমিতে তাঁর খরচ হয়েছিল ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। পরে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে বিঘাপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। তাঁর এ সাফল্য এলাকার অন্য কৃষকদেরও তরমুজ চাষে উৎসাহিত করেছে।
অপরদিকে খালিয়াচক গ্রামের গোলক মণ্ডল ও দিলীপ কুমার মণ্ডলসহ অনেক কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করছেন। তরমুজের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করে কোনো কোনো কৃষক লাখ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন।
সোলাদানা ইউনিয়নের আমুরকাটা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শেখ তোফায়েল আহমেদ তুহিন বলেন, “সাধারণ মৌসুমের তুলনায় অফ-সিজনে তরমুজ চাষে উৎপাদন খরচ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম। ঘেরের ভেড়ি উঁচু করে এবং মিষ্টি পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এ চাষ করা হচ্ছে। এতে একদিকে অনাবাদি জমির ব্যবহার বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, বিসিআরএল প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে তরমুজের বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. একরামুল হোসেন বলেন, “উপকূলীয় প্রতিকূল আবহাওয়া ও লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঘেরের ভেড়িতে অফ-সিজন তরমুজ চাষ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। স্বাভাবিক মৌসুমের তুলনায় অসময়ের তরমুজের বাজারে চাহিদা ও দাম বেশি পাওয়া যায়। কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সার্বিক সহযোগিতা দিতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘেরের অনাবাদি ভেড়িতে অফ-সিজন তরমুজ ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ উপকূলীয় কৃষিতে বৈচিত্র্য আনছে। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় জমির কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮