আরিফ আহমেদ,
বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২৬ অক্টোবর সোমবার মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রধান কার্যালয়ে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে বর্ণাঢ্য এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ, ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান, পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মোঃ সালেহ এবং জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্যরা। উপস্থিত ছিলেন বরিশাল প্রেসক্লাবের বর্তমান ও সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় সব সাংবাদিক।
এ সময় বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা সবখানেই খুব কম। তারপরও জনগণের সেবা দিতে পুলিশ সদস্যরা সবসময় কাজ করে চলছেন। যারা কাজ করেন না, তাদের কোনো দুর্নামও হয় না। কিন্তু যারা সবসময় কাজ করেন, তাদের দোষত্রুটি হতেই পারে। পুলিশ কাজ করে বলেই তাদের দুর্নামও বেশি। আমাদের বুঝতে হবে, বিপদের সময় সবার আগে যে এগিয়ে আসে, সেই হচ্ছে প্রকৃত বন্ধু। সাধারণ মানুষের প্রকৃত বন্ধু পুলিশ।
উৎসব র্যালি শুরুর আগমুহূর্তে শুভেচ্ছা বক্তব্যে পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মোঃ সালেহ বলেন, বরিশালের পাঁচ লাখ মানুষের জন্য মাত্র দুই হাজার পুলিশ কাজ করছেন। এই সীমিত লোকবল নিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।
তিনি আরও জানান, বিএমপির জনবল পাঁচ হাজার বাড়ানো এবং চারটি থানা ও তিনটি ফাঁড়ি মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের পুলিশি সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি)। প্রতিষ্ঠাকালে একটি থানা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই পুলিশ ইউনিটের আওতাধীন এলাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার। তখন আয়তন ছিল ৪০ দশমিক ৩৩ বর্গকিলোমিটার। সময়ের সঙ্গে নগরীর বিস্তৃতি, জনবসতি ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব।
বর্তমানে বিএমপির আওতায় রয়েছে কোতোয়ালি মডেল থানা, কাউনিয়া থানা, বিমানবন্দর থানা ও বন্দর থানা। ২০০৯ সালে কোতোয়ালি থানার বাইরে আরও তিনটি থানা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মহানগর পুলিশের থানা কাঠামো সম্প্রসারিত হয়। তবে জনসংখ্যা ও নগরীর বিস্তৃতি বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে থানা, জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিএমপির অনুমোদিত জনবল দুই হাজার ১৩৫ জন। এর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় এক হাজার ৮৫০ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের বিপরীতে প্রায় ২৮৫ জনের ঘাটতি রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ের পদ শূন্য থাকায় নিয়মিত পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
জনবল সংকটের কারণে থানা পর্যায়ে নিয়মিত পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণ, রাতের টহল, অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। এর বাইরে পাবলিক পরীক্ষা, বিভিন্ন দপ্তরের নিরাপত্তা এবং দরপত্র আহ্বান-সংক্রান্ত কার্যক্রমেও পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে সব ধরনের দায়িত্ব সামাল দিতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশি সেবায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিএমপির বর্তমান জনসংখ্যা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, এ বিষয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যে পাঁচ লাখ মানুষের জন্য দুই হাজার পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিএমপির জনসংযোগ বিভাগও মহানগর পুলিশের আওতাধীন এলাকার বর্তমান জনসংখ্যা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার জনসংখ্যা ৪ লাখ ১৯ হাজার ৪৮৪ জন। একই জনশুমারিতে বরিশাল সদর উপজেলার জনসংখ্যা ২ লাখ ৩৭ হাজার ২১১ জন উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএমপির আওতাধীন এলাকার জনসংখ্যা ৪ লাখ ৪৮ হাজার ১৫২ জন বলে একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারির সীমানা ও হিসাবের পদ্ধতি পুরোপুরি মেলে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে বিএমপির বর্তমান আওতাধীন এলাকার জনসংখ্যা হিসেবে কোনো একটি সংখ্যাকে চূড়ান্তভাবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই জরুরী জনসংখ্যা সুমারী তৈরির দাবীও উঠেছে।
বিএমপির কর্মরত জনবল প্রায় এক হাজার ৮৫০ ধরে এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৪ লাখ ৪৮ হাজার ১৫২ জনকে জনসংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করলে প্রতি পুলিশ সদস্যের বিপরীতে আনুমানিক ২৪২ জন বাসিন্দা পড়েন। জনসংখ্যার হালনাগাদ হিসাব এবং মহানগর এলাকায় প্রকৃতপক্ষে কতজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিশ্চিত করা গেলে সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
বরিশাল সদর উপজেলা ও বরিশাল-৫ সংসদীয় আসনের জনসংখ্যার সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। সদর উপজেলার জনসংখ্যা ও সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা আলাদা প্রশাসনিক হিসাব। একইভাবে, সংসদীয় আসনের সীমানা ও পুলিশের কার্যকরী এলাকার সীমানা এক নয়। তাই সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা যোগ করে পাওয়া সংখ্যাকে বরিশাল-৫ আসনের নিশ্চিত জনসংখ্যা কিংবা বিএমপির আওতাধীন এলাকার জনসংখ্যা হিসেবেও উল্লেখ করা যাবে না।
এদিকে, বরিশাল জেলা পুলিশের অধীনেও জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জেলা পুলিশের অধীনে রয়েছে ১০টি থানা, চারটি তদন্তকেন্দ্র ও দুটি পুলিশ ফাঁড়ি। অনুমোদিত জনবল এক হাজার ৯০০-এর বেশি হলেও কর্মরত সদস্যের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৭০০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জেলা পুলিশ ও বিএমপি আলাদা ইউনিট হওয়ায় উভয়ের জনবল, কর্মপরিধি ও দায়িত্বের পরিসংখ্যান পৃথক।
পুলিশ কমিশনারের ঘোষিত প্রস্তাব অনুযায়ী, বিএমপির জনবল পাঁচ হাজার বাড়ানো এবং চারটি থানা ও তিনটি ফাঁড়ি যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মহানগর পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে থানার সংখ্যা চার থেকে আটটি এবং ফাঁড়ির সংখ্যা চার থেকে সাতটি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে নতুন থানা ও ফাঁড়ির অনুমোদন, অবকাঠামো নির্মাণ, জনবল নিয়োগ এবং যানবাহন সরবরাহের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
নগরীতে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, যানজট এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জও পুলিশের দায়িত্ব বাড়াচ্ছে। জনবল ও যানবাহনের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী টহল, অপরাধ দমন ও যানজট নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে থানাভিত্তিক জনবল বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় যানবাহন সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান এবং নগর চিন্তাবিদদের বক্তব্যে।
বিএমপির ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুই দশকের পথচলার স্মারক নয়, নগরবাসীর নিরাপত্তা ও পুলিশি সেবার সক্ষমতা পর্যালোচনারও উপলক্ষ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনবল নিয়োগ, যানবাহন সরবরাহ, থানা ও ফাঁড়ির অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়গুলো নিয়ে আলোকপাত করেন বক্তারা। পুলিশ কমিশনার এর নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য আয়োজন ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর রেলীটি শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শেবাচিম সড়ক ও প্রধান কার্যালয়ের আশেপাশের এলাকা প্রদক্ষিণ করে যেন নতুন এই প্রত্যাশারই জানান দিয়েছে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮