রাশেদ আহমেদ, রাজনগর (মৌলভীবাজার),
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে পাঁচগাঁও ইউনিয়ন। সবুজে ঘেরা এই জনপদের একটি দীঘির পাড় আজও ১৯৭১ সালের ভয়াবহ গণহত্যার স্মৃতি বহন করে চলেছে। স্থানীয়ভাবে জায়গাটি পরিচিত পাঁচগাঁও বধ্যভূমি ও গণকবর হিসেবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় পাঁচগাঁওয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ৭ মে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা ওই এলাকায় অভিযান চালায়। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজনকে ধরে নিয়ে হিরন্ময় দাসের দীঘির পাড়ে জড়ো করা হয়।
সেখানে নির্যাতনের পর তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অনেককে হাত-পা বেঁধে দীঘিতে ফেলে দেওয়ার কথাও জানা যায়।
জাল ফেলে মরদেহ উদ্ধার
পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে স্থানীয় বাসিন্দারা দীঘিতে জাল ফেলে মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা করেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে, এভাবে বহু মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে দীঘির পশ্চিম পাড়ে সেগুলোর একটি অংশ গণকবর দেওয়া হয়।
একটি ঐতিহাসিক বিবরণে ওই দীঘি থেকে ৫৯টি মরদেহ উদ্ধারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে পাঁচগাঁওয়ের গণহত্যায় মোট কতজন নিহত হয়েছিলেন, সে সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। একটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সূত্রে নিহতের সংখ্যা ৮৩ জন উল্লেখ করা হয়েছে। আবার আওয়ামী লীগের একটি প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণে ৬৯ জন নিহতের নাম পাওয়া যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্বজনদের অনেকেই শেষকৃত্য করতে পারেননি,
নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন পরিবারের সদস্য ছিলেন। ঐতিহাসিক বিবরণে নিত্যবালা শব্দকরসহ কয়েকজনের নামও পাওয়া যায়।
সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর আতঙ্কে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের অনেকেই মরদেহের কাছে যেতে পারেননি। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা মরদেহ উদ্ধার করে গণকবর দেওয়ার উদ্যোগ নেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
৫৫ বছর পরও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন,
১৯৭১ সালের সেই ঘটনার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও পাঁচগাঁওয়ের এই বধ্যভূমি ও গণকবর কতটা যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে হিরনারায়ণ দাসের দীঘির পাড়ের এই গণকবরকে মৌলভীবাজার জেলার চিহ্নিত বধ্যভূমি ও গণকবরের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেও রাজনগরের ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় ‘৭১ ও ৬৯ শহীদের গণকবর’-এর উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, গণহত্যার স্থানটির সীমানা নির্ধারণ, একটি তথ্যসমৃদ্ধ স্মৃতিফলক স্থাপন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের এই স্থানীয় ইতিহাসের প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
পাঁচগাঁওয়ের সেই দিনের অনেক কিছুই আজ বদলে গেছে। বদলে গেছে গ্রামের পরিবেশ, মানুষ ও সময়। তবে দীঘির পাড়ের গণকবরটি এখনো নীরবে সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে একাত্তরের সেই ভয়াবহতার।
স্থানীয় ইতিহাসের এই অধ্যায় যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম শুধু জাতীয় ইতিহাস নয়, নিজেদের এলাকার মানুষের আত্মত্যাগের কথাও জানতে পারবে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮