আরিফ আহমেদ,
সরকারি বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়, কিংবা প্রকৃত জেলেরা সরকারের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন- মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি হলেই শুনতে হয় এমন অভিযোগ। অন্যদিকে, সরকারি মৎস্য কর্মকর্তারা দাবি করেন, তালিকা অনুযায়ী সবাইকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যারা তালিকায় নেই, তারাই বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করছেন। আর এখানেই তৈরি হয়েছে জটিলতা। প্রকৃত জেলেদের চিহ্নিত করার দাবিতে আগের সব তালিকা বাতিল করে নতুনভাবে তালিকা তৈরির দাবি জানাচ্ছেন বেশিরভাগ জেলে পরিবার। তাদের যুক্তিও গুরুত্বের দাবি রাখে। জেলে নেতাদের অভিযোগ, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ভিত্তিতে অনেক ভিন্নপেশার লোককে জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি নাপিত, কৃষক ও অটোরিকশা চালকদের নামও তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। আবার অনেক প্রকৃত জেলে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের নামে বরাদ্দ হওয়া সরকারি সহায়তা কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষভাবে নতুন জেলেসুমারি করার দাবি তুলছেন জেলে পরিবার ও নেতারা। তারা বলেন, মাছ ধরাই যাদের জীবিকা, সরকারি তালিকায় অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা তাদেরই। অথচ তালিকায় নাম না থাকায় অনেক প্রকৃত জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে, মাছ ধরার সঙ্গে নিয়মিতভাবে যুক্ত নন, এমন কেউ কেউ জেলে কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তা বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে জেলেদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় সরকার থেকে ভিজিএফের চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু সহায়তার তালিকায় প্রকৃত জেলেদের নাম না থাকলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের পরিবারকে খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে হয়। অন্যদিকে, তালিকায় অপেশাদার জেলের নাম থাকলে সীমিত বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। সরেজমিনে উপকূলীয় এলাকার বামনা, পাথরঘাটা, বাউফল, ভোলার চরফ্যাশন, বরিশালের বাবুগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ ও চাঁদপুরা ইউনিয়নের লাহারহাট ঘুরে জেলেদের এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বক্তব্যের সুত্র ধরে বেশ কয়েকজন অটোরিকশা চালক ও কৃষক, যারা শুধু মাত্র হাতজাল দিয়ে কখনো কখনো মাছ ধরেন এমন লোকদের কাছে জেলে কার্ড পাওয়া গেছে। তারা অবশ্যই নিজেদের জেলে বলে দাবী করেন এবং বলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কৃষক ও জেলে।
বরিশাল জেলার মৎস্য দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৮৫ হাজার ২৯৫ জন জেলে রয়েছেন। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবরে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভিজিএফের চাল সহায়তার আওতায় আসে ৭৯ হাজার ৮৯০ জন। অর্থাৎ নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ও সহায়তার আওতায় থাকা জেলের সংখ্যার মধ্যে ৫ হাজার ৪০৫ জনের ব্যবধান রয়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাদিউজ্জামান জানিয়েছেন, নিবন্ধিত জেলেদের তালিকা ও সরকারি বরাদ্দের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হয়। তালিকায় নাম না থাকলে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। এ কারণে প্রকৃত জেলেদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা এবং নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকেই।
এদিকে, বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. কামরুল হাসান ইতিপূর্বে এক সাক্ষাৎকারে জেলে নন, এমন ব্যক্তিদের কার্ড পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে কামরুল হাসানকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, জেলে না হয়েও যারা কার্ড পেয়েছেন, তাদের বিষয়ে তালিকা হালনাগাদের কার্যক্রম চলছে এবং তাদের নাম বাদ দেওয়া হবে। অর্থাৎ অপ্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্তির বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পর্যায়েও হালনাগাদের উদ্যোগের কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
আবার মৎস্য অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালের ৬ জুলাই জেলে নিবন্ধন তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম জোরদার করার বিষয়ে নির্দেশনা প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ইউনিয়ন পর্যায়ে সভা করে নিবন্ধিত জেলেদের তালিকা যাচাই-বাছাই ও হালনাগাদ করার নির্দেশনার তথ্যও পাওয়া যায়। এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা কতটা, কোন এলাকায় কতজনের তথ্য যাচাই হয়েছে এবং অপ্রকৃত জেলে শনাক্ত করে কতজনের কার্ড বাতিল করা হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন জেলেরা।
জেলেদের নেতারা বলছেন, শুধু তালিকা হালনাগাদের ঘোষণা দিলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে প্রকৃত যাচাই করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, মৎস্য দপ্তর ও স্থানীয় জেলে সংগঠনের প্রতিনিধিদের যুক্ত করে নদী ও সমুদ্রে নিয়মিত মাছ ধরেন- এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মৃত, নিখোঁজ কিংবা স্থায়ীভাবে মাছ ধরা ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই করে নিবন্ধন সংশোধন করতে হবে। তালিকা তৈরির সময় রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা স্থানীয় প্রভাব যেন কোনোভাবেই বিবেচনায় না আসে, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
জেলেরা বলেন, জেলে পরিবার শনাক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। জেলেদের নৌকা, জাল, মাছ ধরার এলাকা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও স্থানীয়ভাবে তাদের পরিচিতির মতো বিষয় যাচাই করা যেতে পারে। তবে যাদের নিজস্ব নৌকা নেই, যারা অন্যের নৌকায় শ্রমিক বা মাঝি হিসেবে কাজ করেন, তাদের যেন বাদ দেওয়া না হয়। কারণ, মাছ ধরার পেশায় যুক্ত সবাই নৌকার মালিক নন এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে বলে জানান তারা।
নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তার পরিমাণ নিয়েও জেলেদের অসন্তোষ রয়েছে। তাদের মতে, মাছ ধরতে না পারার কারণে আয় বন্ধ থাকলেও পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা এবং ঋণ পরিশোধের খরচ বন্ধ থাকে না। ফলে সহায়তার তালিকায় নাম না থাকা পরিবারগুলো দ্বিগুণ সংকটে পড়ে। আর তালিকায় অপ্রকৃত সুবিধাভোগী থাকলে সীমিত সহায়তার সুষ্ঠু বণ্টন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
জেলেদের দাবি, আগের তালিকা ধরে সামান্য সংশোধনের বদলে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন করে জেলেসুমারি করা হোক। ইউনিয়নভিত্তিক প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে আপত্তি জানানোর সুযোগ, সরেজমিন যাচাই এবং চূড়ান্ত তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে অনিয়মের অভিযোগ কমতে পারে। পাশাপাশি মৃত ও নিখোঁজ জেলেদের নামের বিপরীতে বরাদ্দ এবং সহায়তা বিতরণের হিসাবও যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত জেলে শনাক্ত করা শুধু সরকারি চাল বিতরণের প্রশ্ন নয়; এটি মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জেলে পরিবারের সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গেও জড়িত। সঠিক তালিকা থাকলে নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে অপ্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে সীমিত সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জেলেদের অভিযোগ ও সরকারি তালিকার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ যাচাই, তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহি। নতুন জেলেসুমারির দাবি পূরণ হলে প্রকৃত জেলেরা সরকারি সহায়তার আওতায় আসবেন- এমন প্রত্যাশা তাদের। তবে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হালনাগাদ তালিকার বাস্তব চিত্র প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কারা প্রকৃত জেলে আর কারা অযোগ্য সুবিধাভোগী, সে প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮