মোঃ আবুল কালাম, ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি,
শিক্ষার্থীর গায়ের জামাটি ছেঁড়া। বিষয়টি নজরে আসতেই আর দেরি করলেন না প্রধান শিক্ষক। হাতে তুলে নিলেন সুঁই-সুতো আর কাঁচি। নিজেই বসে পড়লেন শিশুটির ছেঁড়া জামা সেলাই করতে। সুঁই-সুতোর প্রতিটি ফোঁড়ে যেন ফুটে উঠল শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর গভীর মমতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যে শুধু পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারই এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি।
বলছি, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বেরীকান্দী বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মাৎ নাইলা বেগমের কথা।
গত বুধবার তাঁর এমন মানবিক মুহূর্তের তিনটি স্থিরচিত্র ধারণ করেন বিদ্যালয়ের এক সহকর্মী। পরে ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত হলে তা নজর কাড়ে নেটিজেনদের। ছবিতে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের এক কোমলমতি শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা নিজ হাতে সেলাই করে দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক নাইলা বেগম। তাঁর এই ছোট্ট উদ্যোগে প্রকাশ পেয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রতি একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা, স্নেহ ও মাতৃসুলভ মমত্ববোধ।
তবে নাইলা বেগমের কাছে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের দায়িত্ববোধ ও স্বভাবের অংশ হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে এমন কাজ করে আসছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের বই-খাতা সেলাই করে দেওয়া, ছোট শিশুদের ছেঁড়া জামা সেলাই করে দেওয়াসহ নানা মানবিক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক নাইলা বেগম বলেন, “আমি এগুলো সবসময়ই করি। কাউকে দেখানোর জন্য কিংবা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে এসব করি না। এগুলো আমার স্বভাবের অংশ। আমার এক সহকর্মী ছবিটি তুলে ফেসবুকে দিয়েছেন। কখনো চাইনি এসব কাজ গণমাধ্যমে প্রকাশ হোক। শিক্ষকতা একটি নৈতিকতার পেশা। দোয়া করবেন, যেন চাকরিজীবনের বাকি সময়টুকুও শিক্ষার্থীদের মায়ের মমতায় এভাবেই পাশে থেকে শিক্ষা দিতে পারি।”
তাঁর এমন মানবিক উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। ছবিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন শিক্ষক নেত্রী খাইরুন্নাহার লিপি। এ বিষয়ে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে যখন চারদিকে নানা সমালোচনা দেখি, ঠিক তখনই একজন প্রধান শিক্ষককে নিজের শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা সেলাই করে দিতে দেখে মনে হলো, এমন মানবিক দৃশ্য সবার হৃদয় ছুঁয়ে যাক।”
তিনি আরও লেখেন, মানুষের ইতিবাচক গুণগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় উদারতা দেখাতে পারি না। অথচ সমালোচনা করতে বেশ পটু। মানুষের ভালো গুণগুলো আড়াল করে রাখি, যাতে কেউ জানতে না পারে। অন্যদিকে কারও খারাপ দিক প্রচার করার ক্ষেত্রে বেশ পারদর্শী।
থানুরা পাছাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, “একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা নিজের হাতে সেলাই করে দেন, তখন তিনি শুধু একটি জামাই সেলাই করেন না; বরং শিশুটির হৃদয়ে আত্মবিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করেন। শিক্ষকতা কেবল পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের প্রতি মমতা ও মানবিক আচরণের মধ্য দিয়েও প্রকৃত শিক্ষার প্রকাশ ঘটানো সম্ভব। কোনো বক্তৃতা না দিয়েই নাইলা ম্যাডাম তাঁর কাজের মাধ্যমে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।”
উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “একটি জামা সেলাই করে দেওয়া হয়তো খুব বড় কোনো কাজ নয়। কিন্তু একটি শিশুর কাছে এই ছোট্ট উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে ভালোবাসা ও আপনত্বের গভীর অনুভূতি।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের পাতায় লেখা পাঠ থেকেই নয়, শিক্ষকদের এমন আচরণ থেকেও সহমর্মিতা, মানবিকতা ও অন্যের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা গ্রহণ করে।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন নাইলা বেগম। কর্মজীবনের শুরুতে বাদশাগঞ্জ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে চার বছর শিক্ষকতা করেন। এরপর ভাটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই বছর এবং নিজের শৈশবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫ বছর শিক্ষকতা করেন। পরে বালিজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বেরীকান্দী বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিন সন্তানের জননী নাইলা বেগম। তাঁর স্বামী খয়েরদিরচর আলীম মাদ্রাসার সহকারী সুপার হিসেবে কর্মরত। বড় ছেলে অনার্সে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। সে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল। তাঁদের একমাত্র মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) অধ্যয়নরত।
একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার্থী নয়, বরং নিজের সন্তানের মতোই আপন—নাইলা বেগমের এই মানবিক উদ্যোগ যেন সেই চিরন্তন সত্যকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮