
তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল,
কলামিস্ট,মানবসম্পদ–শ্রম ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ:
একটি রাষ্ট্র যখন দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক জঞ্জাল ও স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করে, তখন সেই যাত্রা কখনোই মসৃণ হয় না। । বিশেষ করে একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ চলে, তখন প্রতিটি নাগরিকের প্রাথমিক দায়িত্ব হওয়া উচিত ধৈর্য ও গঠনমূলক মনোভাব প্রদর্শন করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে নতুন সরকারের এক মাস পার হতে না হতেই শুরু হয়ে গেছে 'শেমিং', 'ব্লেমিং' আর 'ট্যাগিং'-এর নোংরা খেলা। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কাজ করার ন্যূনতম সুযোগ না দিয়ে চারপাশ থেকে যে বিতর্কের জাল বোনা হচ্ছে, তা দেশ গড়ার পথে বড় বাধা।
গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা ও ‘দেওয়ালের কান’- রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মূলধারার কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকা আমাদের শঙ্কিত করছে। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি যেখানে বস্তুনিষ্ঠতা এবং অকাট্য তথ্যপ্রমাণ, সেখানে এখন জায়গা করে নিয়েছে সচিবালয়ের ফিসফিসানি, অস্পষ্ট কানাঘুষা আর লোকমুখে শোনা ভিত্তিহীন কথা। যখন দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো কেবল অনুমানের ভিত্তিতে বা ‘সূত্র বলছে’ টাইপ সংবাদের ওপর ভিত্তি করে সরকারের নেয়া ‘১৮০ দিনের প্ল্যান’ নিয়ে ভিত্তিহীন নিউজ করে, তখন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আর কী-ই বা বাকি থাকে? মনে হচ্ছে, তথাকথিত খবরের খোঁজে তাদের এখন মানুষের চেয়ে দেওয়ালের সাথে গভীর যোগাযোগ! তারা যেন এখন দেওয়ালের কান দিয়েই সব রহস্যময় ফিসফিসানি শুনছেন। এই ধরনের অপসাংবাদিকতা কেবল জনমনে বিভ্রান্তিই ছড়ায় না, বরং একটি অস্থির পরিবেশ তৈরি করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তোলে। মিডিয়ার উচিত কানকথা না ছড়িয়ে দায়িত্বশীলতার সাথে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা।
ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দায় সরকারের নয়- রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক সময় বিভিন্ন গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে। অনেক সময় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে যা হয়তো সরকারের মূল নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপকর্মের দায় সরাসরি সরকারের ওপর চাপানো সমীচীন নয়। সরকার একটি বিশাল কাঠামো; সেখানে কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধ বা বাড়াবাড়ি করে, তবে তাকে ব্যক্তিগতভাবেই বিচারের আওতায় আনা উচিত। ঢালাওভাবে পুরো সরকারকে দোষারোপ করা মূলত সরকারের সংস্কার কাজকে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল। আমাদের উচিত ব্যক্তি অপরাধীকে চিহ্নিত করা, কিন্তু সেই অজুহাতে পুরো সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো থেকে বিরত থাকা।
ম্যান্ডেট ও সময় পাওয়ার অধিকার- একটি বিষয় আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এই সরকারটি জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে গঠিত হয়েছে। দেশের অর্ধেকের বেশি ভোটারের ম্যান্ডেট ও সমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই এই পরিবর্তন এসেছে। জনমানুষের রায়ে বা সমর্থনে আসা একটি সরকারের যেমন গঠনমূলক সমালোচনা পাওয়ার অধিকার আছে, তেমনি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রযন্ত্রকে মেরামতের জন্য কিছুটা সময় পাওয়ার অধিকারও তাদের প্রাপ্য। এক কিংবা দুই মাস বা তার চেয়ে সামান্য বেশি সময় একটি ১৬-১৭ বছরের ধ্বংসস্তূপ সংস্কারের জন্য যথেষ্ট নয়। সরকারকে কোনো সুযোগ না দিয়েই যারা ব্যর্থতার তকমা দিতে ব্যস্ত, তারা কি সত্যিই দেশের মঙ্গল চান? নাকি তাদের এই তাড়াহুড়োর পেছনে ক্ষমতার মসনদে বসার অদৃশ্য আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে?
গুজবের রাজনীতি বনাম দেশ গড়া- রাজনীতিতে হার-জিত থাকবেই, মতের ভিন্নতা থাকবেই—এটিই গণতন্ত্র। কিন্তু পরাজয় মেনে নিতে না পেরে যাদের সমর্থকরা অনবরত গুজব ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তারা আসলে দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন না। একটি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতি আর হাজারো প্রশাসনিক জটিলতার মাঝে দেশ গড়ার জন্য এখন ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। অথচ আমরা দেখছি উল্টো চিত্র। পরাজয়ের গ্লানি থেকে একদল মানুষ ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে বিতর্ক ছড়াচ্ছে। তাদের এই কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার জন্য তারা দেশের স্থিতিশীলতাকে বাজি ধরতে দ্বিধাবোধ করছেন না। দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার এই নোংরা খেলা এখন বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার ও দায়বদ্ধতা- আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় ত্রুটি হলো—দলের কেউ অন্যায় করলে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা। আমরা দেখতে চাই, যারা রাজনীতি করছেন তারা কতটুকু শুদ্ধ। যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সাধারণ সমর্থক বা এমনকি বড় কোনো নেতাও কোনো অন্যায়ের সাথে যুক্ত হন, তবে সংশ্লিষ্ট দলের উচিত হবে তৎক্ষণাৎ তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার পরিচয় সে অপরাধী। কোনো দল যদি তাদের অপরাধী সদস্যদের বাঁচানোর চেষ্টা না করে বরং আইনের হাতে সোপর্দ করে, তবেই দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই সদিচ্ছা এখন দেখার বিষয়।
মানবিক অধিকার ও প্রতিহিংসার অবসান- বিগত ১৬-১৭ বছরে যারা কোনো ধরনের দুর্নীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না, যারা কোনো সরাসরি অপরাধ বা অন্যায়ের সাথে জড়িত ছিলেন না, তারা কেবল ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের হওয়ার কারণে কেন আজ পরিবার নিয়ে আতঙ্কে থাকবেন? সাধারণ কর্মী বা নেতা, যারা কোনো অন্যায় করেননি, তাদের পরিবার নিয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে আমরা গত কয়েক দশকে কিছু অর্জন করতে পারিনি, উল্টো সমাজকে বিভক্ত করেছি। এখন সময় এসেছে সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার। যারা নির্দোষ, তাদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে হবে।
আসুন, আমরা প্রতিহিংসা আর ক্ষমতার মোহ ভুলে গিয়ে দেশ গড়ার কাজে মন দিই। গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা কোনো সমাধান নয়। দেশকে যদি আমরা সত্যিই ভালোবাসি, তবে এই মুহূর্তে আমাদের ভাষা হতে হবে ইতিবাচক। আসুন, সরকারকে সময় দেই, তাদের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করি এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ি। নতুবা ইতিহাসের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে যে, আমরা দেশের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছিলাম।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮