আরিফ আহমেদ,
বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে দেখালেন তাদের দুর্ভোগের চিত্র। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথের ঠিক পাশেই অবিভাবকদের বসার স্থান ও বিদ্যালয় ভবনের মাঝখান দিয়ে তৈরি একটি সড়ক দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে জমানো ময়লার স্তুপ চোখে পড়ে। স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনের পেছনের ফাঁকা জায়গাটি যেন দেয়ালের ওপাশের বাসিন্দাদের ময়লা, আবর্জনা ফেলার ভাগাড়।
বৃহস্পতিবার সকালে কালেক্টর স্কুল এন্ড কলেজ এর পাশের পরশ সাগর মাঠের অবস্থা যাচাই করতে এলে শিক্ষার্থীরা তাদের এই সমস্যা তুলে ধরেন। বলেন, আমরা যারা রূপাতলী, সাগরদি, টিয়াখালী দরগাবাড়ি এলাকা থেকে আসাযাওয়া করি তারা আগে এই পথটি ব্যবহার করতাম। পুলিশ লাইনে নেমে এটুকু হেঁটে আসার জন্য খুবই সহজ পথ ছিলো এই সড়কটি। ও প্রান্তে এটিকে এম হোসেন গলি বলা হয়। হঠাৎ করেই এই চলাচলের পথ দেয়াল তুলে বন্ধ করে দিয়েছে বাসিন্দারা। তারা নিজেদের চলাচলের জন্য বাড়ির ভিতর দিয়ে পকেট গেট তৈরি করে নিয়েছে। এখন সব শিক্ষার্থীদের বিকল্প পথে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে আসাযাওয়া করতে হয় বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
গত ১৪ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুল ভবনের পিছনে দেয়াল এর মাঝের ফাঁকা জায়গায় প্লাস্টিক, কাগজ, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও ময়লার স্তূপ, কোথাও আবার চলাচলের পথজুড়ে আবর্জনা পড়ে আছে। পাশের ভবনগুলোর দেয়ালের নিচের অংশেও স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্নতার চিহ্ন দৃশ্যমান। ওপাশে এম হোসেন গলিটি দুপাশের তিনটি ভবনের মাঝ দিয়ে চলাচলের পথ। যেখানে রীতিমতো যানবাহন চলাচলের জায়গা রয়েছে এবং দুটো মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে একদম দেয়াল ঘেঁষে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাঁদের ব্যবহারের সহজ পথটি এই দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
দশম ও একাদশ শ্রেণির দুজন শিক্ষার্থী জানালেন, এম হোসেন গলির একজন বিএনপি নেতা ও কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক তাদের চলাচলের সহজ পথটি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে তাদের প্রতিদিন ঘুরপথে চলতে হচ্ছে। নগরীর বটতলা মোড় হয়ে অথবা জিলা স্কুলের সামনে নেমে ব্রাউন কম্পাউন্ডের ভেতর দিয়ে ঘুরে আসতে হয়। এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ১০ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। শুধু বাড়তি ভাড়াই নয়, অপ্রয়োজনীয় ঘুরপথের কারণে সময়ও নষ্ট হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সহজ পথ বন্ধ করে দেওয়ার ফলে কেন তাদেরই বাড়তি অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হবে? পথটি কার মালিকানাধীন, কীভাবে সেখানে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না, সেসব প্রশ্নেরও সুরাহা চান তারা।
অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। কালেক্টর স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক কর্মচারী ও শিক্ষার্থী সবাই দাবী করেন, ওপাশের ভবনের ছাদে উঠে তারপর ময়লা এপাশে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি স্কুল ভবনের ছাদেও ময়লা ফেলছে তারা। এভাবে ময়লা জমে থাকলে দুর্গন্ধ, পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং পরিচ্ছন্নতাজনিত সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
এ বিষয়ে কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি জেলা প্রশাসক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। সমস্যাটি সমাধানে তিনি বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ খন্দকার অলিউল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে আগেও সংবাদ হয়েছে এবং তিনি নিজেও এর আগে বিষয়টি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শিরীনকে জানিয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার।
এদিকে, বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের বক্তব্য এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি। অথচ তিনি ব্রাউন কম্পাউন্ডে বসবাস করেন, আর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজও তার ঘরের সামনে বলা যায়। ফলে তার বাসা সংলগ্ন এলাকার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এমন ভোগান্তি এবং ভবনের পেছনে ময়লা জমে থাকার অভিযোগে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-পরিবেশ ও ব্যবহারযোগ্য পরিসর নিয়ে এর আগেও বিরোধ দেখা দিয়েছিল নগরীর পরশ সাগর মাঠকে কেন্দ্র করে। বাণিজ্য মেলার আয়োজন এবং মাঠের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সে সময় মেলার জন্য স্থাপিত অস্থায়ী শৌচাগার থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে শৌচাগারের টিনের ঘেরা ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।
পরশ সাগর মাঠকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সেই প্রতিবাদ এবং এবার চলাচলের পথ বন্ধ ও ময়লার স্তূপ নিয়ে অভিযোগ দুটি ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও স্বাভাবিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে।
এদিকে এম হোসেন গলির বাসিন্দারা এ নিয়ে কথা বলতে রাজী হননি। তবে তাদের দাবী, এ শিক্ষার্থীদের চলাচল নয়, এই পথটি বাসিন্দাদের জন্য সমস্যা হয়। কারণ, বিকেল হলেই অনেক বখাটেদের চলাচল শুরু হয়। তাছাড়া সন্ধ্যার পরে পরশ সাগর মাঠ মাদকাসক্তদের হাটে পরিণত হয়। যে কারণে এই পথ বন্ধ করতে হয়েছে বলে জানান তারা।
অধ্যক্ষ প্রফেসর খন্দকার অলিউল ইসলাম বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের তাহলে তাদের পকেট পেট ব্যবহার করতে দেওয়া হোক। আর এখানে ময়লা কেন ফেলছেন তারা?
এখন প্রশ্ন, এই পথটির মালিকানা ও দেয়াল নির্মাণের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কে নেবেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে জমে থাকা ময়লা অপসারণ এবং ভবিষ্যতে সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না?
জেলা প্রশাসকের উদ্বেগ এবং অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানোর পরও যদি সমস্যার সমাধান না হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের মতো মৌলিক একটি সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকার অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না; তাঁরা চাইছেন সহজ ও নিরাপদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সুযোগ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। তাদের এই ন্যায্য দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বরিশাল সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেবে, এমনটাই প্রত্যাশা অভিভাবক ও সচেতন নগরবাসীর।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮