চঞ্চল,
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়-এর মাননীয় মন্ত্রী ও আসাদুল হাবিব দুলু এমপি বলেছেন, “বাংলাদেশে একটি অবাধ, প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে ম্যান্ডেট দিয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশ্যে ৩১ দফা সম্বলিত নির্বাচনী ইশতেহার দেওয়া হয়েছিল এবং তার বাইরে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচির পাশাপাশি লালমনিরহাট জেলার জন্যও পৃথক ১৮০ দিনের উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে”।
রবিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হাসান রাজীব প্রধান এমপি, লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) ও রোকন উদ্দীন বাবুল এমপি, লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ)। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক এইচএম রকিব হায়দার। উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মোঃ আসাদুজ্জামানসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।
ফ্যামিলি কার্ড ও দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি-
মন্ত্রী জানান, ঈদের আগেই পাইলট স্কিমে অন্তত আটটি জেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর চেষ্টা চলছে। পর্যায়ক্রমে হতদরিদ্রদের তালিকা চিহ্নিত করে সারাদেশের প্রত্যেক পরিবারের মা অথবা নারী প্রধান অভিভাবকের হাতে এ কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।
খাল খনন ও ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ-
ক্যাবিনেটে খাল খনন কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “লালমনিরহাট জেলায় কোন কোন খাল পুনঃখনন বা সংস্কার জরুরি তা চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে”।
তিনি আরও জানান, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর পাঁচ কোটি করে গাছ লাগাতে হবে। এ কর্মসূচিতে স্থানীয় সরকার, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করবে। বন বিভাগের কাছে জেলার বিদ্যমান গাছের সংখ্যা ও সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে তিনি সমন্বিত পরিকল্পনার নির্দেশ দেন।
রমজানে তিন অগ্রাধিকার-
রমজান মাস উপলক্ষে তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী—
১. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা
২. সেহরি, ইফতার ও তারাবির সময় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ
৩. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা
তিনি জেলা প্রশাসককে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সেল সক্রিয় রাখা ও নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেন।
‘আলোকিত লালমনিরহাট’ ও সামাজিক অপরাধ দমন-
‘আলোকিত লালমনিরহাট’ সামাজিক আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মাদক, জুয়া, যৌতুক, বাল্যবিবাহসহ ১৩টি সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে”।
লালমনিরহাট সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মাদক প্রবেশের ঝুঁকি বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মহল্লাভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করতে হবে—কারা মাদক বিক্রি করছে এবং কারা মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তদের কাউন্সেলিং করা হবে, প্রয়োজনে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হবে, এরপরও সংশোধন না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিন স্তরের পরিকল্পনায় মাদক নির্মূল কার্যক্রম চলবে”।
মোবাইলভিত্তিক ক্যাসিনো ও জুয়ায় জড়িতদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন তিনি। পুলিশ সুপারের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে বলেন, সীমান্ত এলাকায় মোটরসাইকেলে সন্দেহজনক যাতায়াত মনিটরিং ও প্রয়োজনে চেকপোস্ট বসাতে হবে।
পোস্টার-ফেস্টুন অপসারণ ও পরিচ্ছন্ন শহর-
যত্রতত্র পোস্টার, বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো বন্ধ করতে কঠোর নির্দেশ দেন মন্ত্রী। নির্বাচন-পরবর্তী অপসারণ না হওয়া ব্যানার দ্রুত সরানোর নির্দেশ দেন। শহরকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য পরামর্শ দেন তিনি।
মিশন মোড়ে অবস্থিত আলোকিত স্তম্ভের পানির ফোয়ারা পুনঃস্থাপন, সড়কে আলোকসজ্জা বৃদ্ধি এবং যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগের সক্রিয়তা বাড়ানোর নির্দেশ দেন।
স্বাস্থ্যখাতে কঠোর নজরদারি-
সদর হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে সেবার মান নিয়ে অভিযোগের কথা তুলে ধরে তিনি ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে জনবল সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সাথে আলোচনার আশ্বাস দেন। হাসপাতালে সার্বক্ষণিক হেল্পডেস্ক চালুর পরামর্শ দেন এবং দালালচক্রের আধিপত্য বরদাস্ত না করার ঘোষণা দেন।
শিক্ষার মানোন্নয়ন-
শিক্ষার মান অত্যন্ত খারাপ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দুর্বল হলে জেলার অগ্রগতি সম্ভব নয়। এক শিক্ষার্থীর সাত বিষয়ে ফেল করার উদাহরণ দিয়ে তিনি শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা তুলে ধরেন।
টোল, অবৈধ বালু উত্তোলন ও অবকাঠামো-
হাটবাজারে নির্ধারিত টোলের অতিরিক্ত আদায় বন্ধ, প্রয়োজনে ইজারা বাতিলের নির্দেশ দেন। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ও সার-কীটনাশকের দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন।
অবকাঠামো নির্মাণে শতভাগ এস্টিমেট অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে তিনি বলেন, গুণগত মানে কোনো আপস হবে না। রাজনৈতিক চাপ এলে তা জানাতে নির্দেশ দেন।
প্রশাসনিক সেবা ও নাগরিক সুবিধা-
সরকারি অফিস-আদালতে সাধারণ মানুষের হয়রানি কমানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফুলগাছ রোপণ ও শিক্ষার্থীর নামে ট্যাগ সংযোজনের পরামর্শ দেন। আদালত প্রাঙ্গণে বসার জায়গা ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, শহরের প্রবেশমুখে দৃষ্টিনন্দন তোরণ নির্মাণ, চাঁদাবাজি দমন এবং দলীয় কর্মী জড়িত থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও শিল্পায়ন-
লোকজ সংগীতসহ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চা চালু রাখা, ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া বিসিককে সচল করা এবং তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনসহ রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়েও বক্তব্য রাখেন তিনি।
সভা শেষে জেলা প্রশাসক আগামী ২৮ তারিখের মধ্যে প্রতিটি বিভাগকে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা লিখিতভাবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, মাননীয় মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থানকালে শহরের মিশন মোড় এলাকায় একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী সময়ে স্থাপিত বিলবোর্ড নিজ উদ্যোগে অপসারণ করতে দেখা যায়। শহরের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় তাঁর এ উদ্যোগকে কঠোর অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ সময় সচেতন নাগরিকরা এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানান।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ মোল্লা ব্রিজ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪। মোবাইলঃ ০১৯১৮-৪০৪৭৬০, বিজ্ঞাপনঃ ০১৭৩৩-৩৬১১৪৮